জনস্বার্থ উপেক্ষা করে ফরিদগঞ্জ মৎস্য অফিসের পুকুর ৯৯ বছর ইজারা নেওয়ার পাঁয়তারা চলছে

0

upojela fish office all

ফরিদগঞ্জ(চাঁদপুর) প্রতিনিধি : সরকার জনস্বার্থের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে চলতি বছর প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে ফরিদগঞ্জ মৎস্য অফিসের ১.১৫ শতক জায়গায় চারপাশে নতুন সীমানা প্রাচীর ও একটি নতুন ভবন নির্মান করেছে। যার মধ্যে তিনটি পুকুর রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েক দিনের মধ্যে নতুন ভবনটি কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় আছে বলে জানা যায়। নতুন ভবন নির্মানের মধ্যে দিয়ে ফরিদগঞ্জের মৎস্য চাষীদের বহু দিনের চাওয়া পাওয়া এবং অপেক্ষার অবসান হলো।

ফরিদগঞ্জ মৎস্য অফিসের পুকুর তিনটিতে মাছ চাষ ও উন্নয়ন নিয়ে গত জানুয়ারি মাসে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় আলোচনা করা হয়। এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয় ওই সভায়। যার প্রেক্ষিতে ফরিদগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিস এ নিয়ে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সারা বছর কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন, মৎস্য চাষী ও বেকার যুবকদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে মাছ চাষে উদ্বোধ্যকরন, প্রদর্শনী পুকুর হিসেবে পুকুর তিনটি ব্যবহার, বছরে উন্নত জাতের কয়েক লাখ কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন ও মাছ চাষীদের কাছে স্বল্প সময়ে উন্নত জাতের মাছের পোনা সরবরাহ করা। এবং মাছ নিয়ে গবেষনা করা।

কিন্তু মৎস্য অফিসের তিনটি পুকুরের উপর আবারো কু-দৃষ্টি পড়েছে। পুকুর তিনিট ৯৯ বছর ইজারা নেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেছে সেই জোবেদা মজুমদার খুশি। যিনি জনস্বার্থ বিঘœ করে মৎস্য অফিসের সংলগ্ন রাস্তার পাশের জায়গা জেলা পরিষদ থেকে লিজ এনে দোকান নির্মান করেছে। ওই দোকান নির্মানের ফলে সড়কের ওই স্থানে যানবাহনের যানজট সৃষ্টি হয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। তৎকালে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও জোবেদা মজুমদার খুশি এ নিয়ে কর্নপাত করেন নি।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক মাস্টারের মেয়ে জোবেদা মজুমদার খুশি তিনটি পুকুর ৯৯ বছর ইজারা পাওয়ার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরে আবেদন করেছে। এবং সরকার দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে ইজারা পাওয়ার জন্য উচ্চ মহলে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি পুকুর তিনটিকে অব্যবহৃত দেখিয়ে ২০১১ সালে ৭৫‘হাজার টাকায় ৫ বছরের জন্য ইজারা নেয় জোবেদা মজুমদার খুশি। কিন্তু চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে জৈনিক শাহআলম নামে এক ব্যক্তির নিকট সাব-ইজারা দেয়। সেই ইজারার মেয়াদ ২০১৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে শেষ হবে বলে মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়।

এদিকে জোবেদা মজুমদার খুশির ৯৯ বছরের পুকুর ইজারার আবেদনের প্রেক্ষিতে মৎস্য অধিদপ্তর ফরিদগঞ্জে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের মতামত দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠায়। চিঠির জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মৎস্য অফিস ইজারার বিপক্ষে মতামত দেয়। কারও একক স্বার্থে নয়, জনস্বার্থে মৎস্য উন্নয়নে পুকুর তিনটি ব্যবহারের পক্ষে মত দেয়া হয়। কিন্তু তার পরও ইজারা পাওয়ার জন্য মন্ত্রনালয়ে খুশির তদবির ও দৌড়ঝাপ থেমে নেই। সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরাই মাছ চাষ করতে সক্ষম, সেখানে সরকারি এই পুকুর ইজারা দেওয়ার প্রয়োজন কি?

ফরিদগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৯-২০১০ সালে সরকারি অর্থায়নে মৎস্য অফিসের এই তিনটি পুকুরে কার্প জাতীয় পোনা উৎপাদন করা হয়। এবং তাতে বেশ লাভবান হয় সরকার। আরো জানা যায়, মৎস্য অফিসের উদ্যোগে সরকার বিভিন্ন সময় মাছ চাষের জন্য বেকার যুবক ও মৎস্য চাষীদের প্রশিক্ষন দেয়। তখন পুকুর তিনটির বিকল্প থাকে না এবং এই তিনটি পুকুর প্রর্দশনী হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। মাছ সর্ম্পকিত গবেষণার জন্যও এই তিনটি পুকুর বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া ওই পুকুর তিনটিতে কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনের ফলে চাষীরা অল্প সময়ে, স্বল্প দামে মাছের পোনা পেতে পারে। আর মৎস্য অফিসের প্রশিক্ষিত লোকজনের মাধ্যমে মাছের পোনার চাষ হয় বলে এই পোনা উন্নত ও মানসম্মত হয়ে থাকে। যার কারনে মৎস্য অফিসের পুকুর তিনটিতে উৎপাদিত পোনার চাহিদা অনেক বেশি থাকে। যার মাধ্যমে অথনীতির পাশা পাশি সরকারের সুনাম ও বৃদ্ধি পাবে।

তবে জোবেদা মজুমদার খুশি তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল ষড়যন্ত করছে বলে উল্টো অভিযোগ করেন। তিনি বলেন পুকুরের সীমানা প্রাচীর তৈরির সময় আমার মাছ চাষ বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই আমি ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবারো লিজের জন্য আবেদন করেছি। তবে পুকুর সাব-লিজ দেওয়ার বিষয়টি অস্বিকার করেন তিনি।

এসর্ম্পকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদ মোস্তফা চাঁদপুর প্রবাহকে বলেন, ২০১১ সালে জোবেদা মজুমদার খুশি পুকুর তিনটিকে অব্যবহৃত দেখিয়ে তা ৯৯ বছর লিজের জন্য কতৃপক্ষের কাছে অবেদন করেন। কতৃপক্ষ তাকে ৫ বছরের জন্য পুকুর তিনটি ইজারা দেয়। অপর এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে ওই তিনটি পুকুর সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সেখানে চাষীদের প্রশিক্ষন দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া সীমানা প্রাচীরের ভেতরে একক কোন ব্যক্তিকে মাছ চাষ করতে না দিয়ে অধিদপ্তরের মাধ্যমে মাছ চাষ ও রক্ষনাবেক্ষন করলে সর্বদিকে মঙ্গল। যাতে সরকার ও জনগনের স্বার্থ রক্ষা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: জয়নাল আবেদীন এ প্রতিনিধিকে বলেন, চাঁদপুর জেলা তথা ফরিদগঞ্জ উপজেলাটি মাছ উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। এই এলাকাটি মাছ উৎপদানে বেশ সংয়সম্পূন্ন। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য অফিসের উন্নয়ন করা হচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে বর্তমানে ফরিদগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসের পুকুরগুলো সীমানা প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে। আমরা প্রস্তাব করেছি পুকুর গুলোকে মৎস্য প্রদর্শনী খামার হিসেবে ব্যবহার করতে। সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি। অপর এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রনালয় ইজারা নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েছে। আমরা ইজারার বিপক্ষে মতামত পাঠিয়েছি।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাহেদ সরকার এ প্রতিনিধিকে বলেন, উপজেলা মৎস্য অফিসের জায়গাতে সীমানা প্রাচীর ও নতুন ভবন নির্মান করা হয়েছে। এখানে প্রদশর্নী মৎস্য খামার করার জন্য ইতোমধ্যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। জনস্বার্থ বাদ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে ওই পুকুর কোন ভাবেই ইজারা দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।

Leave A Reply