নোয়াখালী হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে চৌমুহনী পাবলিক হলে; ‘ধর্মবিশ্বাস: এক বৃহৎ সমস্যার সহজ সমাধান’ শীর্ষক আলোচনা সভা

0


Noakhali
নিজস্ব প্রতিনিধি: মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে অকল্যাণের পথে ব্যবহার নয়, অস্বীকার করেও নয়, বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। শনিবার সন্ধ্যায় নোয়াখালী জেলার চৌমুহনী গণমিলনায়তনে (পাবলিক হল) হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে সকল প্রকার ধর্মব্যবসা, সহিংসতা, সন্ত্রাস ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে ‘ধর্মবিশ্বাস: এক বৃহৎ সমস্যার সহজ সমাধান’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. এ.বি.এম জাফর উল্লাহ। হেযবুত তওহীদের নোয়াখালী জেলা আমীর মো. নিজামউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কবি আলহাজ্ব মো. মোশারেফ হোসেন আলমগীর, দৈনিক দেশেরপত্রের সাবেক সম্পাদক ও দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা রুফায়দাহ পন্নী, হেযবুত তওহীদের কেন্দ্রীয় সাহিত্য বিভাগের প্রধান মো. রিয়াদুল হাসান ও চৌমুহনী কাচারী বাড়ী জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল কবির। এবং মাদরাসাতুল মেজবাহ আল ইসলামীয়ার পরিচালক মাওলানা শরীফ উল্লাহসহ অন্যান্যরা।
মাওলানা শরীফ উল্লাহ বলেন, আমি হঠাৎ করে এই মজলিসে উপস্থিত হয়েছি। আমি জানতাম না এই মজলিসের কাজ কি, উদ্দেশ্য কি। আসার পর আমি জানতে পারলাম। এই মজলিসের পুরোপুরি উদ্দেশ্য কি, আদর্শ কি তা সম্পূর্ণ জানতে হবে। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দীন হলো ইসলাম। আত্মীয়-স্বজন ও নিজেকে আগে সংশোধন করতে হবে। আদম (আ.) থেকে শেষ নবী পর্যন্ত নবী-রসুলগণকে আল্লাহ কেন পাঠিয়েছেন? রূহের জগতে প্রশ্ন করেছেন আমি কি তোমাদের রব নই? আমরা উত্তর দিয়েছি, অবশ্যই। আমাদের শিশুকাল, যৌবনকাল, বৃদ্ধকাল সবকিছু প্রভু আপনার উপর।
দুনিয়াটা হলো পরীক্ষার হল। পরীক্ষার হলে খাতা কলম দেওয়া হয়, ভুল-শুদ্ধ লেখার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। যদি শুদ্ধ লিখি তবে আমার জন্য রয়েছে সম্মান, আর যদি ভুল লিখি তবে জাহান্নামের দুঃখ। অর্থাৎ মানুষকে ভালো-মন্দ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। যত ধর্ম দুনিয়াতে আছে তার মধ্যে একটি ধর্মই গৃহিত- সেটা হলো ইসলাম। যদি আমরা ইসলাম ধর্ম হিসেবে জীবন-যাপন করি তাহলে পরকালে মুক্তি। একথাটি স্মরণ করার জন্যই নবী রসুলগণ এসেছেন। তিনি বলেন, এই শতাব্দীতে মানুষ আর জীব-জন্তুর মধ্যে চেহারার পার্থক্য ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই। আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘোরতোর অন্ধকার সময়ে আল্লাহ পাঠালেন শেষ নবীকে। তিনি বললেন, প্রথমে নাজেল হয় ইকরা- পড়! প্রথমে পড়। অন্যখানে আছে নিজে আমল করো এবং অন্যকে আমল করতে বলো। তখন ইউরোপের অন্য লোকেরা এখানে (আরবে) এসে বসবাস করা শুরু করেছে নিরাপত্তার জন্য। সেই ইসলাম অনুকরণ করে আমরা নিজেরাও শান্তিতে থাকতে পারি। অন্য জাতিকেও শান্তি দিতে পারি। তিনি আরো বলেন, পেট্রল বোমা দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না। মহানবী ও আসহাবদের আদর্শের কারণে লক্ষ লক্ষ লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন, আমাদের নবী সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন নাই। আসুন শান্তিকে আলিঙ্গন করে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করি। একাত্তর সালে ধর্মব্যবসায়ীদের দেখেছি, আজকেও তাদের আসফালন দেখতে পাচ্ছি।
বেগমগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল আহমেদ সকলকে স্বাধীনতার মাসে সংগ্রামী লাল সালাম জানান। তিনি বলেন এখানে ধর্ম শিক্ষা দিয়ে পাড়া মহল্লায় ওয়াজ মাহফিল হয়ে থাকে। যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে তাদের জন্য দোয়া করলে আমাদের ইসলাম কি ধ্বংস হয়ে যাবে?
কবি আলহাজ্ব মো. মোশারেফ হোসেন আলমগীর তার বক্তব্যে সময়োপযোগী এই অনুষ্ঠানটির আয়োজকদেরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি এই কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জোরারোপ করেন এবং এই কাজে সকলকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
চৌমুহনী কাচারী বাড়ী জামে মসজিদের খতিব আব্দুল কবির বলেন, আমাদের ধর্মগ্রন্থের নাম আল কোর’আন। ধর্মকে বিশ্বাস করার পাশাপাশি ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান লাভ করা উচিত। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন কিভাবে চলবে, কিভাবে সুখে শান্তিতে থাকবে আল কোর’আনে সে শিক্ষা রয়েছে। আমি পেট ভরে খাব, পাশের লোক ক্ষুধায় থাকবে তা ধর্ম নয়। ধর্মের সঙ্গে কর্মের মিল রেখে জনগণ ও নারীদের যে অধিকার ইসলাম দিয়েছে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ইসলামে নারীদের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে তা অনন্য। যে ইসলামকে অনুসরণ করবে রাষ্ট্রীয় জীবনে সে জাতির সম্পদ তসরুফ করবে না। আমি যদি বিরোধী দলেও থাকি তাহলে জীবন্ত পুড়ে মারা তো দূরের কথা, একটা টোকাও দিতে পারব না। পেট্রোল বোমা মারা আরো দূরের কথা।
অনেকে ধর্মের কথা বলে ক্ষমতায় যেতে চায়। তারা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে খুন করছে, পেট্রোল বোমা মারছে। ধর্মের নাম দিয়ে এসব করাই ধর্মব্যবসা। এরা ক্ষমতায় আসার পর কোর’আনের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য খলিফা ওমর ফারুক এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সে সময় বাঘ আর ছাগল এক ঘাটে পানি খেয়েছে। ধর্ম কখনো ধোঁকাবাজী শেখাতে পারে না।
আমাকে যেভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে সেভাবে আমি সর্বনিকৃষ্টও। অর্থাৎ মানুষকে যেমন মনুষ্যত্ব দেওয়া হয়েছে তেমনি পশুত্বও দেওয়া হয়েছে। যে নিরপরাধ কাউকে খুন করলো সে যেন সারা দুনিয়ার সবাইকে খুন করলো। কেননা সমস্ত মানুষই আল্লাহরই সৃষ্টি। আমরা যদি একজাতি একদেশ হয়ে থাকতে পারি, আমাদের ধর্মকে, কোর’আনকে, আইনকে শ্রদ্ধা করতে পারি তবে অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা সোনার মদিনার মত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. এ.বি.এম. জাফর উল্লাহ বলেন, আজকের সভার আলোচ্য বিষয় অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমাদের ধর্মবিশ্বাস আজ কোন পর্যায়ে এসেছে তা বোঝানোর জন্যই আজকের এ অনুষ্ঠান।
তিনি বলেন, আলোচনা সভায় বক্তারা তাদের বক্তব্যে ইসলামের সত্যিকার রূপটা কি, ইসলাম কেন দুনিয়াতে এসেছে তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। আজ শুধু বাংলাদেশের মানুষ বা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) যে আদর্শ নিয়ে এসেছেন সেটা বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। রসুল (স.) তাঁর ওফাত পর্যন্ত কোর’আনের প্রচারে কাজ করে গেছেন। তিনি ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে নির্যাতিত হয়েছেন, কখনো কখনো কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছেন। আজকে ইহুদি-নাসারাদের এজেন্ট মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে শান্তির ধর্ম ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। ইসলামের নামে দুনিয়াতে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ইসলামের গৌরব বৃদ্ধি হবে না।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরাও মুসলমান, নামাজ পড়ে দোয়া করি, আল্লাহ! আমাদের দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর। এখন দোয়া করতে হয় জামায়াতে ইসলামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য। আজ আমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ইসলাম বাদ দিয়ে অমুক পীর সাহেবের ইসলাম, অমুক নেতার ইসলাম পালন করছি। একদিন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং এর জবাব দিতে হবে। অতীতে আল্লাহ অনেক জাতিকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ধ্বংস করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সেগুলো উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ যেন এই জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন।
তিনি বলেন, শুধু মাওলানা সাহেবদের জন্য ইসলাম নয়। আমাদের জন্যও ইসলাম। তাই আমাদেরকেও ইসলামের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, ঈমান-আকীদা ঠিক করতে হবে। কে রাজনীতি করেন, কে করেন না, তা মুখ্য নয়। আমাদের প্রত্যেককে সঠিক পথে চলতে হবে। সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠে সুরা আর রহমান পড়লাম, কিন্তু অর্থ বুঝলাম না। আল্লাহ তালার কথা না বুঝে পড়ার মধ্যে কোনো ফায়দা নেই। অর্থ বুঝে পড়লে তা সেটা আমাদের মঙ্গলে আসবে।
তিনি বলেন, আজকে হেযবুত তওহীদের আয়োজন অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমাকে এই অনুষ্ঠানে আসার সময় বাধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি তাদেরকে তওহীদের অর্থ বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। আমরা এক সাথে আল্লাহর পথে কাজ করছি। এটা কোনো রাজনীতি না। আলেমরা আমাদের পথ নির্দেশনা দেন, আমরা যেন জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এই জন্যই আজকের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন।
তিনি আরো বলেন, আজকে দেশে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা ধ্বংস হচ্ছে। এটা শুধু রাষ্ট্রেরই ক্ষতি না, আপনার আমার সকলের ক্ষতি। যারা ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত আল্লাহ তাদের হেদায়াত দান করেন। আর যদি হেদায়াত না হয় তাহলে যেন ধ্বংস হয়ে যায়। আজ হেযবুত তওহীদ যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তা যেন স্বার্থক হয়। সকলেই যেন এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয় এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হয়েছিলেন সাধারণ জনতা। তারা সকলেই বক্তাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শ্রবণ করেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আলোচ্য বিষয়ের উপর সকল দর্শক-শ্রোতা ঐক্যমত পোষণ করেন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে ‘ধর্মবিশ্বাস: এক বৃহৎ সমস্যার সহজ সমাধান’, ‘একজাতি একদেশ, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ ও হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা, যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর সংক্ষিপ্ত জীবনীর উপর তিনটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে তওহীদ প্রকাশনার উদ্যোগে একটি প্রকাশনা স্টল খোলা হয়। অনুষ্ঠানে আগত উৎসাহী পাঠকগণ সেখানে ভিড় করেন এবং নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকাশনা সংগ্রহ করেন।

Leave A Reply