যথাযোগ্য মর্যাদায় রামগড়ে হানাদার মুক্ত দিবস পালিত

0

ram

রামগড় (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি: যথাযোগ্য মর্যদায় আজ মঙ্গলবার রামগড়ে পালিত হয়েছে হানাদারমুক্ত দিবস। দীর্ঘ ৭ মাস ৬দিন শ ত্রুর দখলে থাকার পর ৭১’র ৮ ডিসেম্বর বীরমুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী পাকহানাদারবাহিনীকে পরাস্ত করে রামগড়ের মাটিতে উড়ায় স্বাধীন বাংলার পতাকা।দিবসটি পালন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। সকালে লেকপার্কে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য ‘বিজয়’ প্রাঙ্গন হতে বনার্ঢ্য বিজয় র‌্যালী বের হয়। খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নেতৃত্বে বিজয় র‌্যালীটি পৌর শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিশাল এ বিজয় র‌্যালীতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরিসহ মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, ছাত্র, শিক্ষক সকল পেশাজীবি অংশগ্রহণ করেন। র‌্যালী শেষে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য ‘বিজয়’ প্রাঙ্গনে হানাদারমুক্ত দিবসের আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। রামগড় উপজেলা নির্বাহি অফিসার মো: ইকবাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনাসভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নুর নবী চৌধুরি, খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য জাহেদুল আলম, জেলা পরিষদের সদস্য মংক্যচিং মারমা, জুয়েল চাকমা, মংশেপ্রু চৌধুরি অপু, নিগার সুলতানা, খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহসভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা রণ বিক্রম ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ির সাবেক সাংসদ একেএম আলীম উল্লাহ, রামগড় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোস্তফা হোসেন প্রমূখ। উল্লেখ্য, ৭১’র আজ এ দিনে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে দীর্ঘ ৭ মাস ৬ দিন পর রামগড়ের মাটিতে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। শত্রুমুক্ত হয় বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ ঘাঁটি। মহান মুক্তিযুদ্ধে রামগড়ের ভুমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেসময় খাগড়াছড়ি ছিল রামগড় মহকুমার মহালছড়ি থানাধীন একটি ইউনিয়ন মাত্র। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পর ১৬ মার্চ আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মাধ্যমে মহকুমা শহর রামগড়ে ব্যাপকভাবে শুরু অসহযোগ আন্দোলন। ২৫মার্চের পর চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, অভিনেত্রীসহ সামাজিক নেতৃবৃন্দ রামগড় আসতে শুরু করেন। আসেন মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম(পরবর্তীতে মেজর ও সাবেক স্বরাস্ট্রমন্ত্রী), ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ বেশ কয়েকজন সামরিক অফিসার। মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে রামগড় হাই স্কুল মাঠে খোলা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মুক্তিফৌজের সর্বপ্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ রামগড়েই খোলা হয়। আওয়ামীলীগ নেতা সুলতান আহমেদের(মরহুম) নেতৃত্বে শত শত মুক্তিকামী তরুণ, যুবক সকলেই দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয়ে এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। একদিকে পাক সরকার বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন চলে। অন্যদিকে রামগড়কে শত্রুমুক্ত রাখতে বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি বসিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। রাঙ্গামাটি পতনের পর ১৩ এপ্রিল পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জেলা সদর সেখান থেকে স্থানান্তরিত করে নিয়ে আসা হয় রামগড়ে। রামগড়ে এসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক(বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা) এইচ টি ইমাম স্বাধীন বাংলা সরকারের অধীনে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম,পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালি প্রভৃতি এলাকা থেকে হাজার হাজার বাস্তুহারা মানুষ ভারতে পারি জমাতে রামগড়ে আসতে শুরু করেন। জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম এসব বাস্তুহারা মানুষের খাবার দাবারের জন্য লঙগর খানা খোলেন। ফেনী নদীর উপর কাঠের সেতু নির্মাণ করে ভারতে আনা হয় অস্ত্র গোলাবারুদসহ বিভিন্ন সমরাস্ত্র। এসব অস্ত্রশস্ত্র রামগড় থেকে চাঁদের গাড়ি করে পাঠানো হয় চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে। ২৭ এপ্রিল মহালছড়িতে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর মিজো ও চাকমা রাজাকারদের সাথে এক প্রচন্ড যুদ্ধে শহীদ হন অকুতভয় তরুণ সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তম। রামগড়ের মাটিতে সমাহিত করা হয় এ বীর শহীদকে। ২ মে ভোর বেলায় ভারী কামান ও শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চারিদিক থেকে রামগড় ঘাঁটির উপর হামলা চালায় পাকবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুদের প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেস্টা করে। কিন্তু শত্রু পক্ষের বিপুল সৈন্য সংখ্যা ও ভারী অস্ত্রশস্ত্রের মুখে বেশীক্ষণ টিকতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধারা। বিকেল ৫ টার দিকে পাকবাহিনী পুরো রামগড় দখল করে নেয়। পতন হয় চট্টগ্রাম , কুমিল্লা খন্ডের মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে শক্তঘাঁটির। রামগড় পতনের পর সেক্টর-১ এর হেডকোয়ার্টার পুন:স্থাপন করা হয় সীমান্তের ওপারের ভারতের ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমার হরিনায়। এর আওতায় সাবরুমের অম্পি নগর, বগাফা, পালাটনা,হরিনা প্রভৃতি স্থানে স্থাপিত ট্রেনিং সেন্টারে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়। সেক্টর-১ এর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম(সাবেক স্বরাস্ট্র মন্ত্রী) তত্ত্বাবধান করেন এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের। শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করে রামগড়ের মাটিতে আবার স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানোর দৃপ্ত শপথ নিয়ে সাবরুমের ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নেয় ১২ বছরের বালক থেকে ৫০ বছরের প্রৌঢ় সবাই। প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীদের নিয়ে গঠন করা হয় পৃথক পৃথক যোদ্ধা গ্রæপ। রামগড়ের এসব অগ্নিতরুণ যুবকযোদ্ধারা প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করতে শুরু করেন মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ। রামগড়ের শত্রুঘাঁটির উপর তাঁরা প্রায়ই গেরিলা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করে পাক বাহিনীর। ৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ে দখলদারবাহিনীর অবস্থান গুলোর উপর প্রবল বোমা বর্ষণ করে। প্রায় সাত মিনিট বোমা হামলা শেষে বিমান তিনটি ফিরে যাওয়ার সাথে সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সন্মিলিতভাবে কঠোর আক্রমন চালায় পাকহানাদারদের উপর। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় শত্রুরা। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত পাকবাহিনীর সৈন্যরা ৭ ডিসে¤\^র সন্ধ্যা থেকে পিছু হটতে শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে আরো দুটি ভারতীয় বিমান পাকঘাঁটির উপর পাঁচ মিনিট বোমা বর্ষণ করে। বিমান থেকে বোমা হামলা আর স্থলে অকুতোভয় বীরযোদ্ধাদের মরণপণ গেরিলা আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে পাক সেনারা। শেষ পর্যন্ত শত্রুরা নিজের প্রাণ বাঁচাতে সদলবলে রামগড় থেকে পালাতে শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর বিকেলের আগেই পাক সৈন্যরা সবাই রামগড়ের মাটি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। বিকেল ৪ টার দিকে ভারতের সাবরুমের আশ্রয় শিবির থেকে বিজয় উল্লাসে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশের মাটিতে ছুটে আসে রামগড়ের মানুষ। রামগড় বাজারে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।

Leave A Reply

Pinterest
Print