সামাজিক অবক্ষয়ের শেষ কোথায়, কীভাবে?

0

শামসুজ্জামান মিলন, পাবনা: গত ২২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার পাবনা জেনারেল হাসপাতাল থেকে নবজাতক এক কন্যা সন্তান চুরি হয়ে যাবার ঘটনায় যারপরনাই বিস্মিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। এমন ঘটনা একবার দুইবার নয়, একের পর এক ঘটে যাচ্ছে সারা দেশে। মানুষের নৈতিক অধঃপতন কোন মাত্রায় পৌঁছেছে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এসব ঘটনায়। যে সমাজে ন্যূনতম মানবতাবোধ জাগ্রত থাকে সে সমাজে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। বনের পশুরা বনে যতটা নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে মানুষ সেই ন্যূনতম নিরাপত্তাও হারিয়েছে। মানুষের এই চরম মানবিক পদস্খলনের কারণ কী?

কারণটা খুবই সোজা। মানবজাতির অতীত ধর্ম ও ধর্মের সংঘর্ষে ভরা। সেই সংঘর্ষে কখনও ধর্ম অধর্মের উপর প্রাধান্য লাভ করেছে, কখনও অধর্ম ধর্মের উপর প্রাধান্য লাভ করেছে। কিন্তু কখনই সমাজ থেকে ধর্ম একেবারেই হারিয়ে যায় নি। ধর্মকে বাদ দিয়ে সমাজ চালানের চেষ্টা চলে নি। ফলে বিকৃত হলেও, আংশিক হলেও মানুষের মধ্যে একটি ধর্মবোধ সবসময় কাজ করেছে, যার কারণে কখনই তারা পশুর মতো আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগী জীবে পরিণত হতে পারে নি। মানবতা, মনুষ্যত্ব, বিবেকবোধ সীমিত পরিসরে হলেও সমাজে অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ভেঙ্গে আজ মানবজাতি ধর্মকে জাতীয় জীবন থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করায় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকেও ধর্মপ্রসূত নৈতিক শিক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে, মানবতা হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ছে ভোগবাদী, আত্মকেন্দ্রিক জন্তু-জানোয়ার।

ধর্মহীন বস্তুবাদী সমাজ আমাদেরকে এমন বাস্তবতার মুখোমুখী দাঁড় করিয়েছে যেখান থেকে অসহায়ভাবে দেখতে হচ্ছে একটি নিষ্পাপ শিশু জন্মগ্রহণ করছে, তারপর পৃথিবীর আলো-বাতাস ভালোমতো অনুভব করার আগেই, জননীর দুধের স্বাদ গ্রহণ করার আগেই নৃশংসতার বলি হচ্ছে। কিছুদিন আগে মাগুরায় মায়ের পেটে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছিল যে খবর আমরা সকলেই পেয়েছি। সে শিশুটি মায়ের গর্ভে থাকতেই অনাগত পৃথিবীর বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছে। তাছাড়া লাখ লাখ শিশুভ্রুণকে মায়ের গর্ভেই হত্যা করা হচ্ছে। এত অভিশাপ বহন করার ক্ষমতা মানবজাতির আছে তো?

চারদিকে ঘটতে থাকা এসব বর্বরতা ও নৃশংসতার আসল কারণ উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে আমরা এসবের দায়ভার সরকার, বিরোধী দল বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর চাপিয়েই দায় সারতে চাই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসবের জন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষকে দায়ী করা চলে না। মানুষের নৈতিক অধঃপতনের জন্য দায়ী পশ্চিমা বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থা। বস্তুবাদ মানুষের আত্মাকে কুরে কুরে ধ্বংস করছে। আত্মার শক্তিকে বিনষ্ট করছে। ফলে মানুষ আর পশুর মধ্যে কার্যত কোনো প্রভেদ থাকছে না। তাই এ থেকে পরিত্রাণের জন্য মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করতে হবে। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। মনে রাখতে হবে ধর্মকে বাদ দিয়ে মানুষের আত্মার উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। আর আত্মিক উন্নতি ছাড়া এই নৈতিক অধঃপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। বস্তুবাদ ও ভোগবাদ মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক হতে শেখায়, অন্যদিকে ধর্ম মানুষকে ত্যাগী ও পরপোকারী হতে শেখায়। একটা সমাজ টিকে থাকার জন্য যে সকল উপাদান প্রয়োজন যেমন ঐক্য, ভাতৃত্ব, সহমর্মিতা, পরষ্পরের সহযোগিতা ইত্যাদি সব গুণাবলিই মানুষ ধর্ম থেকে লাভ করে। অথচ সেই ধর্মকেই এখন অবাঞ্ছিত করে রাখা হয়েছে।

একটি কথা চালু আছে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’। মানবজাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক সর্বক্ষেত্র আজ রোগাক্রান্ত। কেউ বুঝতে পারছে না আসল সংক্রমণ কোথায়। রোগের উৎপত্তিস্থল যাদের অলক্ষে, তারা চিকিৎসা চালাবে কীভাবে? সেই ঘাতক ব্যাধি, যার সংক্রমণে সমস্ত মানবগোষ্ঠী দিশাহারা, তার কার্যকরী ওষুধ নিয়ে হাজির হয়েছে হেযবুত তওহীদ। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা একমাত্র আমাদের কাছেই আছে। এর সঠিক প্রয়োগ ঘটানো গেলে সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায় ও অসত্য দূরীভূত হবে। মানবতা ফিরে আসবে। ক্রমাগত এগিয়ে আসা নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে মানবজাতি। সমাজ হবে সুন্দর-সাবলিল, যেখানে আর কোনো শিশুকে জন্মের পরই পৃথিবীর প্রতি ঘৃণা ও অপশাপ বর্ষণ করে চলে যেতে হবে না। লেখক: ব্যুরো প্রধান, দৈনিক বজ্রশক্তি, পাবনা।

Leave A Reply

Pinterest
Print