ইঁদুরের রক্ত আর মূত্র খেয়ে দশ দিন

0
31

how i drank urine and bat blood to survive_45084_0রকমারি ডেস্ক:
দিনঠেলার নাম বাবাজি। বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এই প্রবাদটি অনেক প্রাচীন। তবে কখন কিভাবে আর কেনইবা এই প্রবাদের উৎপত্তি তা এখনও আমরা জানি না। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে ভাষা বিজ্ঞানীদের কল্যাণে আমরা এই প্রবাদের উৎপত্তি কাহিনী জানতে পারব। কিন্তু বাঙালির আবিস্কৃত এই প্রবাদ বঙ্গ দেশ ছাপিয়ে পৃথিবীর সর্বত্রই তার প্রভাব বজায় রেখেছে। যেমনটা হয়েছে সাবেক ম্যারাথন দৌড়বিদ মাওরো প্রসপেরির ক্ষেত্রে। ধূ ধূ মরুভূমির ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলেন এই দৌড়বিদ। টানা দশদিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সহাবস্থান করে ফিরে এসেছেন তিনি নিজের বাসস্থানে। ঠিক কিভাবে মাওরো এই দুঃসাধ্য কাজটি সাধন করলেন আর তিনি কি খেয়েই বা বেঁচে ছিলেন তা এবারের ফিচারে পাঠকদের জন্য মাওরির জবানিতেই তুলে ধরা হলো। আমি যে জিনিসটা সবচেয়ে পছন্দ করি তা হলো ম্যারাথনে দৌড়ান। কারণ এর ফলে আপনি খুব সহজেই প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পারবেন। সাধারণত এই প্রতিযোগিতাগুলো পাহাড়, মরুভূমি, গিরিখাতের মতো সুন্দর স্থানে হয়ে থাকে। একজন পেশাগত ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমি কখনও এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি না কারণ আমাকে মেডেল জেতার জন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। একদিন আমার এক ভালো বন্ধু আমাকে বলল যে মরুভূমিতে একটা ভালো ম্যারাথন হচ্ছে এবং এটা বেশ কঠিন। আর আমি যেহেতু চ্যালেঞ্জ ভালোবাসি তাই আমিও কসরত শুরু করে দিলাম। প্রতিদিন ৪০ কিলোমিটার দৌড়ানো এবং যতটা সম্ভব পানি কম খেয়ে দৌড় চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার স্ত্রী কিনযিয়া আমাকে পাগল ভাবতে লাগল। আমার শারীরিক কসরত দেখে সে ভাবতে লাগল আমি মারাই যাব কি না। আমাদের তিনজন সন্তান আছে যাদের সবারই বয়স আট বছরের নিচে। আর এটাই ভাবনার ছিল যে, আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে কিনযিয়া তিন সন্তান নিয়ে খুব বিপদে পরবে। তারপরেও, যখন আমি মরক্কোতে পৌছালাম তখন সেই অভাবনীয় সুন্দর মরুভূমি দেখতে পেলাম। আমি এক কথায় বিমোহিত। এখনকার দিনে ম্যারাথন দৌড় অনেক ভিন্ন। কারণ ১৩০০ প্রতিযোগী যখন দৌড়ানো শুরু করে তখন দূর থেকে মনে হবে একটা বিশাল সাপ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। আর আপনি যদি প্রচণ্ড ক্লান্ত না হয়ে যান তাহলে পথ হারানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ১৯৯৪ সালের ঘটনাটা এরকম ছিল না। তখন ম্যারাথন দৌড়ে অংশগ্রহণ করেছিল মাত্র ৮০জন এবং এদের মধ্যে অল্প কিছু মানুষই মূলত দৌড়াতে পারত। আর একারণেই সেই ম্যারাথনের পুরোটা সময় আমাকে একাই চলতে হয়েছে। আমিই ছিলাম প্রথম ইতালীয় নাগরিক যিনি ম্যারাথনের পরবর্তী ধাপ অতিক্রম করে পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। কিন্তু ম্যারাথনের চতুর্থ দিনে গিয়ে সব হিসেব উল্টে গেল। কারণ ততক্ষণে আমি সত্যিই খুব একা এবং ম্যারাথন দৌড়ের চরমতম কষ্টকর মুহূর্তের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এরকমই একটা পরিস্থিতিতে মরুভূমিতে ধূলিঝড় শুরু হলো। মনে হচ্ছিল বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। চোখে-মুখে ধুলো ঢুকে যাওয়ার কারণে না পারছিলাম চোখে কিছু দেখতে, না পারছিলাম নিঃশ্বাস নিতে। আর তখনই আমি জীবনে প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছিলাম যে মরুভূমির ধূলিঝড় কতটা প্রবল হতে পারে। কিছু সময় পার হওয়ার পর হাতের কাছে থাকা কাপড় দিয়ে আমার মুখ ঢেকে হাটার চেষ্টা করছিলাম। কারণ এই দুরাবস্থার মাঝেও আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে হারলে চলবে না। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে একটা বালুর স্তুপের কাছে আমাকে থামতে এবং ঝড় থামার জন্য অপেক্ষা করতে হলো। প্রায় আট ঘণ্টা পর যখন ঝড় থামল তখন চারপাশে অন্ধকার নেমে গেছে। তখন বাধ্য হয়েই আমাকে তপ্ত বালুর উপরই শুয়ে পরতে হলো। আর ভাবতে লাগলাম, আমি হয়তো আর জিততেই পারব না, কারণ প্রথমত আজ চতুর্থ দিন চলছে এবং আমার অবস্থান চতুর্থ। কিন্তু পরে ভাবলাম, আমি জিততে হয়তো পারব না কিন্তু সময়টা উপভোগ করতে তো পারব। তাই পরদিন ভোর হতেই আমি আবারও হাটতে শুরু করলাম। আমি ভাবতেও পারিনি যে একটা ঝড় কিভাবে আমার জীবনের উদ্দেশ্যকেই পরিবর্তিত করে দেবে। সকাল হওয়ার অনেকটা সময় পার হয়ে গেলেও আমি বুঝতে পারিনি যে আসলে আমি পথ হারিয়েছি। আমার কাছে একটা মানচিত্র আর ক¤পাস ছিল যা আমাকে সাহস জোগাচ্ছিল সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়ার কিন্তু দিক নির্দেশনা ছাড়া এটা প্রায় অসম্ভব। তারপরেও বেশি উদ্বিগ্ন হচ্ছিলাম না কারণ আমি নিশ্চিত চিলাম যে আগে হোক আর পরে হোক আমার সঙ্গে কারও দেখা হবেই। কে জানে আমার মতো আরও কতজন এরকম পরিস্থিতির মধ্যে আছে। যখনই কাউকে দেখব তখনই একজোট হয়ে পথ চলতে হবে। কিন্তু আমার এই পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। টানা চারঘণ্টা হাটার পর যখন একটা উঁচু ঢিপির উপর উঠে দেখার চেষ্টা করলাম তখন চারপাশে কিছুই দেখতে পেলাম না। ঠিক তখনই আমি চূড়ান্তভাবে বুঝতে পারলাম যে আমি মরুভূমির এই শূন্যতার মাঝে হারিয়ে গেছি। সেসময় আমার মাথায় অতিরিক্ত পানি খরচ না করার চিন্তা আসে এবং একটি খালি বোতলে আমার মূত্র জমাতে থাকি। কারণ পানির অভাবের চরমসীমায় হাতের কাছে থাকা আমাদের মূত্রই সবচেয়ে পরিস্কার এবং পানযোগ্য। মনে আছে, আমার দাদা আমাকে কিভাবে তার যুদ্ধকালীন সময়কার মূত্র পান করার অভিজ্ঞতা বলেছিলেন। দাদার সেই গল্প আমাকে সাহস জুগিয়েছিল মরক্কোর সেই বিশাল মরুভূমিতে। আমার কাছে একটা ছুরি, ক¤পাস, ¯ি¬পিং ব্যাগ এবং শুকনো খাবার ছিল। একমাত্র সমস্যা ছিল পানি। কারণ ঝড়ের সময় আমি না বুঝেই অনেকটা পানি খেয়ে ফেলেছিলাম। এই সমস্যা সমাধানে আমাকে সাবধানী হতে হয়। অনেকটা সময় অপক্ষো করে এরপর ঠান্ডা বালু দিয়ে হেঁটে চলছিলাম। প্রত্যেকদিন ভোরবেলা এবং সন্ধ্যেবেলা আমি হাটতে লাগলাম। আর গোটা দিন কোনো একটা বালুর স্তুপের কাছে আশ্রয় খুঁজে থাকতাম। ভাগ্যিস আমার চামড়া কালো তাই সূর্যের তাপ আমাকে তেমন কাবু করতে পারেনি। এভাবে চলতে চলতে একদিন সুর্যাস্তের সময় হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পেলাম আমি। প্রথমে মনে করেছিলাম যে আমাকেই খুঁজতে বুঝি হেলিকপ্টার এসেছে, এবং আমার কাছে থাকা ফ্লেয়ার আমি আকাশে ছুড়ে দিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানচালক সেই ফ্লেয়ারটি দেখতে পায়নি, অথচ আমি পাইলটের মাথার হেলমেটটি পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। এসময় আমি বেদুইনদের ব্যবহৃত মারাবত নামের একটি মুসলিম প্রার্থনালয় দেখতে পেলাম। এখানে বেদুইনরা মরুভূমি পার করার সময় থামে। ভেবেছিলাম অনেক কিছু বা কাউকে পাবো সেখানে। কিন্তু স্রেফ একটি কফিন ভর্তি লাশ ছাড়া আর কিছুই ছিল না সেখানে। তারপরেও মনে মনে বললাম যে, মাথার উপরে একটা ছাদতো পাওয়া গেলো অন্তত। মারাবতে আমি তিনদিন ছিলাম। চেতন আর অচেতন অবস্থার এই তিনদিনে বেশ কয়েকবার হেলিকপ্টারের শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি। তৃতীয় দিনের মাথায় আমি একটি বিমানের শব্দ শুনতে পেয়ে হাতের কাছে যা কিছু ছিল তা দিয়ে আগুন ধরাই কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। একটা সময় আসলো যখন আমি প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পরলাম। ভাবছিলাম যে মৃত্যু আসন্ন, মনে মনে মৃত্যুকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। তবে আমার মৃত্যুর খবরটা যেন কিনযিয়া পায় তাই মারাবাতেই থেকে মারা যেতে চেয়েছিলাম। কারণ আমার মৃত্যুর খবর পেলে ইতালির সরকার আমার স্ত্রীকে পেনশনের টাকা দেবে। ইতালির নিয়ম অনুযায়ী কেউ নিখোঁজ হলে তাকে দশবছর পর মৃত ঘোষণা করা হয়। যদি আমি মরুভূমিতে মারা যাই তাহলে আমার স্ত্রীর পেনশনের টাকা পেতে দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। পরের দিন সকালে আমি আÍহত্যার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যেভাবেই হোক আমি সফল হলাম না। এটা আমার কাছে একটা অর্থবহ মানে দাঁড়ালো। আবারও আমি মনকে শক্ত করার চেষ্টা করলাম সামনের দিনগুলোর জন্য। ক্রীড়াবিদ মাওরো আবার ফিরে এসেছে। নিজের কাছে নিজের পরীক্ষা যেন। মারাবাত থেকে বের হয়ে পরিকল্পনামাফিক হাঁটতে শুরু করলাম আবারো। কিন্তু কোন দিকে যাবো তা জানতাম না। শুধু মনে ছিল একজন আমাকে বলেছিল, মরুভূমিতে মেঘ যেদিকে যায় সেদিকে গেলে প্রাণের দেখা মিলবে। সেই কথাটিকে ধরেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। এই দীর্ঘপথে খাবার হিসেবে সাপ, টিকটিকি ও ইঁদুর মেরে তাদের কাঁচা খেতে হয়েছে আমাকে। রক্ত জমিয়ে রাখতাম পানির বিকল্প হিসেবে। যতদিন যাচ্ছিল ততই আমার শরীরের ওজন কমতে লাগলো। কিন্তু স্ত্রী-সন্তানদের দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। এভাবে একদিন আমি বালুর উপর পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম কিন্তু আমার তখন প্রচণ্ড ঘুমে ধরেছে। এ যে মরার ঘুম তাও আমি টের পাচ্ছিলাম। পরের দিন কিছু দূরে অনেক ভেড়া দেখতে পেলাম, যা আমাকে আশার আলো দেখায়। কিছুক্ষন পর একটি মেষচালক মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। টানা নয়দিন পর আমি মরুভূমিতে চূড়ান্ত অর্থেই কোনো মানুষ দেখতে পেলাম। এই মেষচালক পরিবারের আতিথেয়তায় আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম অনেকটাই। তারাই পুলিশকে খরব দিয়ে আমাকে আমার দেশে ফিরতে সাহায্য করে। ইঁদুরের রক্ত আর মূত্র খেয়ে দশ দিন
রকমারি ডেস্ক:
দিনঠেলার নাম বাবাজি। বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এই প্রবাদটি অনেক প্রাচীন। তবে কখন কিভাবে আর কেনইবা এই প্রবাদের উৎপত্তি তা এখনও আমরা জানি না। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে ভাষা বিজ্ঞানীদের কল্যাণে আমরা এই প্রবাদের উৎপত্তি কাহিনী জানতে পারব। কিন্তু বাঙালির আবিস্কৃত এই প্রবাদ বঙ্গ দেশ ছাপিয়ে পৃথিবীর সর্বত্রই তার প্রভাব বজায় রেখেছে। যেমনটা হয়েছে সাবেক ম্যারাথন দৌড়বিদ মাওরো প্রসপেরির ক্ষেত্রে। ধূ ধূ মরুভূমির ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলেন এই দৌড়বিদ। টানা দশদিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সহাবস্থান করে ফিরে এসেছেন তিনি নিজের বাসস্থানে। ঠিক কিভাবে মাওরো এই দুঃসাধ্য কাজটি সাধন করলেন আর তিনি কি খেয়েই বা বেঁচে ছিলেন তা এবারের ফিচারে পাঠকদের জন্য মাওরির জবানিতেই তুলে ধরা হলো। আমি যে জিনিসটা সবচেয়ে পছন্দ করি তা হলো ম্যারাথনে দৌড়ান। কারণ এর ফলে আপনি খুব সহজেই প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পারবেন। সাধারণত এই প্রতিযোগিতাগুলো পাহাড়, মরুভূমি, গিরিখাতের মতো সুন্দর স্থানে হয়ে থাকে। একজন পেশাগত ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমি কখনও এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি না কারণ আমাকে মেডেল জেতার জন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। একদিন আমার এক ভালো বন্ধু আমাকে বলল যে মরুভূমিতে একটা ভালো ম্যারাথন হচ্ছে এবং এটা বেশ কঠিন। আর আমি যেহেতু চ্যালেঞ্জ ভালোবাসি তাই আমিও কসরত শুরু করে দিলাম। প্রতিদিন ৪০ কিলোমিটার দৌড়ানো এবং যতটা সম্ভব পানি কম খেয়ে দৌড় চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার স্ত্রী কিনযিয়া আমাকে পাগল ভাবতে লাগল। আমার শারীরিক কসরত দেখে সে ভাবতে লাগল আমি মারাই যাব কি না। আমাদের তিনজন সন্তান আছে যাদের সবারই বয়স আট বছরের নিচে। আর এটাই ভাবনার ছিল যে, আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে কিনযিয়া তিন সন্তান নিয়ে খুব বিপদে পরবে। তারপরেও, যখন আমি মরক্কোতে পৌছালাম তখন সেই অভাবনীয় সুন্দর মরুভূমি দেখতে পেলাম। আমি এক কথায় বিমোহিত। এখনকার দিনে ম্যারাথন দৌড় অনেক ভিন্ন। কারণ ১৩০০ প্রতিযোগী যখন দৌড়ানো শুরু করে তখন দূর থেকে মনে হবে একটা বিশাল সাপ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। আর আপনি যদি প্রচণ্ড ক্লান্ত না হয়ে যান তাহলে পথ হারানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ১৯৯৪ সালের ঘটনাটা এরকম ছিল না। তখন ম্যারাথন দৌড়ে অংশগ্রহণ করেছিল মাত্র ৮০জন এবং এদের মধ্যে অল্প কিছু মানুষই মূলত দৌড়াতে পারত। আর একারণেই সেই ম্যারাথনের পুরোটা সময় আমাকে একাই চলতে হয়েছে। আমিই ছিলাম প্রথম ইতালীয় নাগরিক যিনি ম্যারাথনের পরবর্তী ধাপ অতিক্রম করে পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। কিন্তু ম্যারাথনের চতুর্থ দিনে গিয়ে সব হিসেব উল্টে গেল। কারণ ততক্ষণে আমি সত্যিই খুব একা এবং ম্যারাথন দৌড়ের চরমতম কষ্টকর মুহূর্তের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এরকমই একটা পরিস্থিতিতে মরুভূমিতে ধূলিঝড় শুরু হলো। মনে হচ্ছিল বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। চোখে-মুখে ধুলো ঢুকে যাওয়ার কারণে না পারছিলাম চোখে কিছু দেখতে, না পারছিলাম নিঃশ্বাস নিতে। আর তখনই আমি জীবনে প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছিলাম যে মরুভূমির ধূলিঝড় কতটা প্রবল হতে পারে। কিছু সময় পার হওয়ার পর হাতের কাছে থাকা কাপড় দিয়ে আমার মুখ ঢেকে হাটার চেষ্টা করছিলাম। কারণ এই দুরাবস্থার মাঝেও আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে হারলে চলবে না। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে একটা বালুর স্তুপের কাছে আমাকে থামতে এবং ঝড় থামার জন্য অপেক্ষা করতে হলো। প্রায় আট ঘণ্টা পর যখন ঝড় থামল তখন চারপাশে অন্ধকার নেমে গেছে। তখন বাধ্য হয়েই আমাকে তপ্ত বালুর উপরই শুয়ে পরতে হলো। আর ভাবতে লাগলাম, আমি হয়তো আর জিততেই পারব না, কারণ প্রথমত আজ চতুর্থ দিন চলছে এবং আমার অবস্থান চতুর্থ। কিন্তু পরে ভাবলাম, আমি জিততে হয়তো পারব না কিন্তু সময়টা উপভোগ করতে তো পারব। তাই পরদিন ভোর হতেই আমি আবারও হাটতে শুরু করলাম। আমি ভাবতেও পারিনি যে একটা ঝড় কিভাবে আমার জীবনের উদ্দেশ্যকেই পরিবর্তিত করে দেবে। সকাল হওয়ার অনেকটা সময় পার হয়ে গেলেও আমি বুঝতে পারিনি যে আসলে আমি পথ হারিয়েছি। আমার কাছে একটা মানচিত্র আর ক¤পাস ছিল যা আমাকে সাহস জোগাচ্ছিল সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়ার কিন্তু দিক নির্দেশনা ছাড়া এটা প্রায় অসম্ভব। তারপরেও বেশি উদ্বিগ্ন হচ্ছিলাম না কারণ আমি নিশ্চিত চিলাম যে আগে হোক আর পরে হোক আমার সঙ্গে কারও দেখা হবেই। কে জানে আমার মতো আরও কতজন এরকম পরিস্থিতির মধ্যে আছে। যখনই কাউকে দেখব তখনই একজোট হয়ে পথ চলতে হবে। কিন্তু আমার এই পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। টানা চারঘণ্টা হাটার পর যখন একটা উঁচু ঢিপির উপর উঠে দেখার চেষ্টা করলাম তখন চারপাশে কিছুই দেখতে পেলাম না। ঠিক তখনই আমি চূড়ান্তভাবে বুঝতে পারলাম যে আমি মরুভূমির এই শূন্যতার মাঝে হারিয়ে গেছি। সেসময় আমার মাথায় অতিরিক্ত পানি খরচ না করার চিন্তা আসে এবং একটি খালি বোতলে আমার মূত্র জমাতে থাকি। কারণ পানির অভাবের চরমসীমায় হাতের কাছে থাকা আমাদের মূত্রই সবচেয়ে পরিস্কার এবং পানযোগ্য। মনে আছে, আমার দাদা আমাকে কিভাবে তার যুদ্ধকালীন সময়কার মূত্র পান করার অভিজ্ঞতা বলেছিলেন। দাদার সেই গল্প আমাকে সাহস জুগিয়েছিল মরক্কোর সেই বিশাল মরুভূমিতে। আমার কাছে একটা ছুরি, ক¤পাস, ¯ি¬পিং ব্যাগ এবং শুকনো খাবার ছিল। একমাত্র সমস্যা ছিল পানি। কারণ ঝড়ের সময় আমি না বুঝেই অনেকটা পানি খেয়ে ফেলেছিলাম। এই সমস্যা সমাধানে আমাকে সাবধানী হতে হয়। অনেকটা সময় অপক্ষো করে এরপর ঠান্ডা বালু দিয়ে হেঁটে চলছিলাম। প্রত্যেকদিন ভোরবেলা এবং সন্ধ্যেবেলা আমি হাটতে লাগলাম। আর গোটা দিন কোনো একটা বালুর স্তুপের কাছে আশ্রয় খুঁজে থাকতাম। ভাগ্যিস আমার চামড়া কালো তাই সূর্যের তাপ আমাকে তেমন কাবু করতে পারেনি। এভাবে চলতে চলতে একদিন সুর্যাস্তের সময় হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পেলাম আমি। প্রথমে মনে করেছিলাম যে আমাকেই খুঁজতে বুঝি হেলিকপ্টার এসেছে, এবং আমার কাছে থাকা ফ্লেয়ার আমি আকাশে ছুড়ে দিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানচালক সেই ফ্লেয়ারটি দেখতে পায়নি, অথচ আমি পাইলটের মাথার হেলমেটটি পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। এসময় আমি বেদুইনদের ব্যবহৃত মারাবত নামের একটি মুসলিম প্রার্থনালয় দেখতে পেলাম। এখানে বেদুইনরা মরুভূমি পার করার সময় থামে। ভেবেছিলাম অনেক কিছু বা কাউকে পাবো সেখানে। কিন্তু স্রেফ একটি কফিন ভর্তি লাশ ছাড়া আর কিছুই ছিল না সেখানে। তারপরেও মনে মনে বললাম যে, মাথার উপরে একটা ছাদতো পাওয়া গেলো অন্তত। মারাবতে আমি তিনদিন ছিলাম। চেতন আর অচেতন অবস্থার এই তিনদিনে বেশ কয়েকবার হেলিকপ্টারের শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি। তৃতীয় দিনের মাথায় আমি একটি বিমানের শব্দ শুনতে পেয়ে হাতের কাছে যা কিছু ছিল তা দিয়ে আগুন ধরাই কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। একটা সময় আসলো যখন আমি প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পরলাম। ভাবছিলাম যে মৃত্যু আসন্ন, মনে মনে মৃত্যুকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। তবে আমার মৃত্যুর খবরটা যেন কিনযিয়া পায় তাই মারাবাতেই থেকে মারা যেতে চেয়েছিলাম। কারণ আমার মৃত্যুর খবর পেলে ইতালির সরকার আমার স্ত্রীকে পেনশনের টাকা দেবে। ইতালির নিয়ম অনুযায়ী কেউ নিখোঁজ হলে তাকে দশবছর পর মৃত ঘোষণা করা হয়। যদি আমি মরুভূমিতে মারা যাই তাহলে আমার স্ত্রীর পেনশনের টাকা পেতে দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। পরের দিন সকালে আমি আÍহত্যার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যেভাবেই হোক আমি সফল হলাম না। এটা আমার কাছে একটা অর্থবহ মানে দাঁড়ালো। আবারও আমি মনকে শক্ত করার চেষ্টা করলাম সামনের দিনগুলোর জন্য। ক্রীড়াবিদ মাওরো আবার ফিরে এসেছে। নিজের কাছে নিজের পরীক্ষা যেন। মারাবাত থেকে বের হয়ে পরিকল্পনামাফিক হাঁটতে শুরু করলাম আবারো। কিন্তু কোন দিকে যাবো তা জানতাম না। শুধু মনে ছিল একজন আমাকে বলেছিল, মরুভূমিতে মেঘ যেদিকে যায় সেদিকে গেলে প্রাণের দেখা মিলবে। সেই কথাটিকে ধরেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। এই দীর্ঘপথে খাবার হিসেবে সাপ, টিকটিকি ও ইঁদুর মেরে তাদের কাঁচা খেতে হয়েছে আমাকে। রক্ত জমিয়ে রাখতাম পানির বিকল্প হিসেবে। যতদিন যাচ্ছিল ততই আমার শরীরের ওজন কমতে লাগলো। কিন্তু স্ত্রী-সন্তানদের দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। এভাবে একদিন আমি বালুর উপর পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম কিন্তু আমার তখন প্রচণ্ড ঘুমে ধরেছে। এ যে মরার ঘুম তাও আমি টের পাচ্ছিলাম। পরের দিন কিছু দূরে অনেক ভেড়া দেখতে পেলাম, যা আমাকে আশার আলো দেখায়। কিছুক্ষন পর একটি মেষচালক মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। টানা নয়দিন পর আমি মরুভূমিতে চূড়ান্ত অর্থেই কোনো মানুষ দেখতে পেলাম। এই মেষচালক পরিবারের আতিথেয়তায় আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম অনেকটাই। তারাই পুলিশকে খরব দিয়ে আমাকে আমার দেশে ফিরতে সাহায্য করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here