Connecting You with the Truth
প্রিমিয়াম ওয়েব হোস্টিং + ফ্রি ডোমেইন
সাথে পাচ্ছেন ফ্রি SSL এবং আনলিমিটেড ব্যান্ডউইথ!
অফারটি নিন »

- Advertisement -

উগ্রবাদের গোড়া কোথায়?

Atahar Hossain - আতাহার হোসাইন (2)
আতাহার হোসাইন

বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা কী- এ প্রশ্ন করা হলে নির্দ্বিধায় জঙ্গিবাদ তথা বিভিন্ন ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী দলগুলো, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ইসলামী উগ্রবাদী দলগুলোর কার্যক্রমের কথা উঠে আসবে। ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা- কোন মহাদেশ আজ জঙ্গি আতঙ্কের বাইরে নয়। এই শতাব্দীর গোড়া থেকে ধর্মীয় উগ্রপন্থা সর্বত্র রক্ত ঝরাচ্ছে, আতঙ্ক বিস্তার করছে।
সম্প্রতি সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের বুকেও এরা হানা দিয়েছে। পুরো পৃথিবী আজ তাদের ব্যাপারে তটস্থ। প্রায় প্রতিটি দেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে সর্বদা ব্যস্ততার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। কিন্তু এত বড় সমস্যা হওয়ার পরেও পৃথিবীর নিরাপত্তাগত দিক থেকে আমি একে দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে স্থান দেব এবং বলব প্রথম সমস্যা থেকেই দ্বিতীয় সমস্যার জন্ম। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম সমস্যার সমাধান না করে দ্বিতীয় সমস্যা সমাধান করা যাবে না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, প্রথম সমস্যার জনকদের কৌশলী প্রচারণার কারণে বিশ্ববাসীর কাছে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে দ্বিতীয় সমস্যাই প্রধান সমস্যা। প্রথম সমস্যা সমাধান না করে দ্বিতীয় সমস্যায় এত জোর দিয়ে কী লাভ হচ্ছে? না, লাভ হবে না। এটা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মত অবস্থা। বরং দ্বিতীয় সমস্যা থেকে প্রথম সমস্যার জনকেরা সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে।
জঙ্গীবাদের উত্থান:
জঙ্গীবাদের উত্থান মূলত আশির দশকে। এর আগে পর্যন্ত পৃথিবী দুইটি মেরুতে বিভক্ত ছিল। পুঁজিবাদী বিশ্ব বনাম সমাজতান্ত্রিক বলয়। পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সমাজতান্ত্রিক বলয়ের নেতৃত্ব দিত সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়া। ষাটের দশকে এই দুটো শক্তির মধ্যে শুরু হওয়া কোল্ড ওয়ার বা ¯œায়ুযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেকটা কাবু হয়ে যায়। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে রাশিয়া ভেঙ্গে পড়ে। এর আগে রাশিয়া আফগানিস্তানে হানা দেয়। সেখান থেকে রাশিয়ার প্রভাব দমন করতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশক্তি নিয়োগ করে। আফগানিদেরকে অস্ত্র, অর্থ, প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তারা। সারা বিশ্ব থেকে পবিত্র ইসলামের নামে জিহাদী উন্মাদনা ছড়িয়ে ইসলামিক যোদ্ধা তথা মুজাহিদদেরকে জড়ো করা হয় আফগানিস্তানের মাটিতে। উদ্দেশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে কাবু করা।
সেখানে জিহাদ করতে হাজির হয়েছিলেন সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেনও। পরিশেষে দীর্ঘ যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসিদ্ধি হয়। কিন্তু অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও ধর্মীয়ভাবে নৈতিক যুক্তি পাওয়া এসব ইসলামিক যোদ্ধারা কোথায় গেল? তারা কি যুদ্ধ শেষে সবাই বাড়ি ফিরে সংসার ধর্মে মনোযোগ দিয়েছে? না, তাদেরই একটা অংশ তালেবান নামে সংগঠিত হয়ে আফগানিস্তানকে একটা তথাকথিত ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করে। অপরদিকে ওসামা বিন লাদেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন আল-কায়েদা। আল-কায়েদা বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে থাকে। এককালে সিআইএ’র প্রশিক্ষণ পাওয়া লাদেন পরিণত হোন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রুতে। আফগানিস্তানে কথিত ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েম হলে সেখানে অতিথি হিসেবে আশ্রয় পান লাদেন। ঘটনাক্রমে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ এক হামলা হয়। হামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দায়ী করা হয় ওসামা বিন লাদেনকে। লাদেনকে ধরার জন্য দীর্ঘ দশ বছর ধরে হামলা চালানো হয় আফগানিস্তানে। তাতে তালেবানী ইসলামিক সরকার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসেনি। মার্কিন সৈন্যরা এখনো সেখানে অবস্থান করছে। পুতুল সরকার দিয়ে টেনেটুনে দেশটি চালানো হচ্ছে। যার আবার বিরাট অংশ তালেবানরা পুনর্দখল করে রেখেছে। প্রায় প্রতিদিন প্রাণহানী ঘটে চলেছে দেশটিতে।
সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায্য কর্মকান্ড:
ইরাকে বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা হামলা চালায় ২০০৩ সালে। ব্যাপক ধ্বংযজ্ঞ চালানোর পর এখন সাদ্দামহীন দেশটি এক মৃত্যুপুরীর নাম। সেখান থেকে জন্ম হয়েছে ইসলামিক স্টেট বা আইএস নামে আরেক উগ্রগোষ্ঠীর। লিবিয়ায় একইভাবে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে ৪২ বছরের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা করা হলো। সেখানে আজও শান্তি ফিরে আসেনি। জ্বলছে অশান্তির দাবানল। আছে আইএসের উপস্থিতি। আইএস গৃহযুদ্ধ চলা সিরিয়ার বেশ কিছু অংশ দখল করে নিয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করেছে। তারাই মূলত পৃথিবীর এই আপাত প্রধান সমস্যার প্রথম সারিতে অবস্থান নিয়েছে। এদের জন্যই পৃথিবীর প্রভুত সামরিক শক্তির অধিকারী দেশগুলোর এত আয়োজন এবং এত তৎপরতা।
একজন মানুষের জন্য কেন ধ্বংস করা হলো আফগানিস্তানকে? কেন মিথ্যা গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে একটি দেশকে শেষ করে দেওয়া হলো? কেন সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাধানো হলো? কেন বিদ্রোহীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো? কেন গাদ্দাফিকে উৎখ্যাত করা হলো? এসবকিছুর পেছনেই কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূমিকা নিহিত রয়েছে। একটা দেশ দখল করে নেওয়া হবে, শাসককে খুন করা হবে, সম্পদ লুট করা হবে আর সেদেশের মানুষ নীরবে বসে থাকবে এটা কেমন করে হয়? আমাদের দেশে যখন পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে তখন কি আমাদের পূর্বপুরুষগণ বসে ছিলেন? তারা কি হানাদারদের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েননি? ঠিক একইভাবে যদি আক্রান্ত দেশগুলোর মানুষদেরকে হানাদার শত্রুদের মোকাবেলা করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান করা হয় তবে যুদ্ধ না করার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে? যেখানে নিজের স্ত্রী-সন্তান এমনিতেই প্রতিনিয়ত প্রাণ দিতে হচ্ছে, নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে শিশুরা, ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে- সেখানে যুদ্ধ না করে প্রাণ হারানোর কোন অর্থ থাকতে পারে না। অর্থাৎ যুদ্ধের নৈতিক শক্তি এখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যতদিন তাদের আধিপত্য কায়েম করার জন্য অপরাপর দেশগুলোর উপর হামলা, লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা বন্ধ না করবে ততদিন জঙ্গীবাদী কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করতে এর মদতদাতাদের পুঁজিগত কোন সমস্যা হবে না। সমস্যা হবে না ধর্মীয় বিকৃত যুক্তি ও বৈধতা তথা জান্নাতের লোভ দেখিয়ে নিরস্ত্র মানুষদেরকে হত্যা করাতেও। তাই যতদিন সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের লালসায় লাগাম না টানবে ততদিন বিশ্ব নিরাপদ হবে না। নিজেদের শক্তিমত্তা প্রয়োগ করে হুমকি নির্মূল করা সঠিক ও চূড়ান্ত পথ নয়। আজকে শক্তির প্রবল দাপটে আইএস দুর্বল হওয়া শুরু করেছে, অন্তত আপাতদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে, কিন্তু আইএস সন্ত্রাসীরা এবার আহ্বান জানাচ্ছে তাদের যুদ্ধকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। জিহাদী চেতনা থেকে যেসব যুকবরা আইএসের আনুগত্য মেনে নিয়েছে বা নিচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে যার যার দেশেই কথিত জিহাদী কর্মকান্ড চালু করার। অর্থাৎ কেন্দ্রীভূত সমস্যা বহুমুখী সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। এর ভয়াবহতা হবে আরও বেশি।উপরন্তু আইএস যদি আজকে সমূলে উৎপাটিতও হয়, তবু সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায্য কর্মকান্ড বহাল থাকলে কালকে দেখা যাবে নতুন নামে আরেক দল গজিয়ে উঠেছে। শক্তিপ্রয়োগের নীতি গ্রহণ করলে শুধু আক্রান্তরাই মারা যাবে না। তারাও মরিয়া হয়ে প্রতি আক্রমণ চালাবে। সেটা অব্যাহত থাকলে সাম্রাজ্যবাদীদের নিজ দেশের মানুষও নিরাপদ থাকবে না। তাদের দেশেও হামলা চলবে। যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যা করার নৈতিকতা খুঁজে নেবে তারা। এর জন্য ধর্মীয় যুক্তি পেলেও চলবে, না পেলেও চলবে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতি হচ্ছে গাছের গোড়া। এই গোড়া ঠিক করলে উগ্রাবাদের বিস্তার হবে না। অর্থাৎ এই প্রথম সমস্যা সমাধান করা হলে দ্বিতীয় সমস্যার উদ্ভবও হবে না। তাই বিশ্ববাসীর উচিত প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট মূল সমস্যার দিকে, অর্থাৎ গোড়ার দিকে তাকানো।
আমাদের দেশে উগ্রবাদের প্রেক্ষাপট:
আমাদের দেশে যারা উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে তাদেরকে বোঝানো হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম জনসংখ্যা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছে। একে একে তাদের দেশগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা। স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব। তাদের মনে সরকার-প্রশাসন সম্পর্কে তীব্র ক্ষোভ সঞ্চার করা হচ্ছে এই বলে যে, আমাদের দেশের সরকারগুলোও নির্যাতিত, নিপিড়ীত মুসলিমদের পক্ষে না দাড়িয়ে ঐ সাম্রাজ্যবাদীদের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। শাসকরা নিজেরা আভ্যন্তরীণভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করছে, সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ খেয়ে টাকার পাহাড় বানাচ্ছে, বিদেশে পাচার করছে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নেই ইত্যাদি। এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে না জঙ্গীবাদের আদর্শিক গুরুদের। তাছাড়া ধর্মীয় বিকৃত ব্যাখ্যা তো রয়েছেই। এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের আপাত কোন পথ না থাকায় উগ্রবাদী কার্যক্রমের দিকে তারা ঝুকেঁ পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদীদের লালসায় লাগাম টানার মত আমাদের দেশের সরকারও যদি নিজেদেরকে ন্যায়ের দ-ধারী না হয় তবে এখানেও অব্যাহতভাবে উগ্রবাদের জন্ম হবে। শুধু শক্তি দিয়ে সাময়িক উপশম করা যাবে হয়তো। কিন্তু শান্তি স্থায়ী হবে না।আজকে একটা সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলে কালকেই নতুন আরেকটা গজিয়ে উঠবে। উগ্রবাদের জন্ম হয় কীভাবে সকলকে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।
লেখক: কলামিস্ট।

Leave A Reply

Your email address will not be published.