Connect with us

বিশেষ নিবন্ধ

জঙ্গিবাদ, ধর্মবিশ্বাসের অপপ্রয়োগ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

Avatar photo

Published

on

মোহাম্মদ আসাদ আলী
সরকারের হাতে আছে আইন, অস্ত্র, বাহিনী। সেই ক্ষমতাবলে সরকার জিয়া-মারজান গংদের খুঁজে বের করে শাস্তির মুখোমুখী করবে- এমন ভরসা আমরা করতেই পারি। ধর্মের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা করে তারা কেবল মানবতারই ক্ষতি করে নি, সরকারেরও যথেষ্ট ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। সুতরাং সরকার তাদের ছেড়ে কথা বলবে না এটাই স্বাভাবিক। ওদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও জঙ্গিদের প্রতি যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। বেশ ক’জন পুলিশ সদস্য ইতোপূর্বে প্রাণ হারিয়েছে জঙ্গিদের হাতে। কাজেই পুলিশও জঙ্গি দমনে সন্দেহাতীত নিষ্ঠাবান রয়েছে। ইতোমধ্যেই বড় বড় কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, যার ফলে জঙ্গিদেরকে অনেকটাই ছত্রভঙ্গ করা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এত এত ‘সফলতা’ ও ‘সম্ভাবনা’র মধ্যেও কী কারণে যেন একটি ‘কিন্তু’ বসানোর জায়গা রেখে দিচ্ছেন আমাদের নীতি-নির্ধারক মহল।
সরকার জঙ্গিবাদকে যতটা ছোট করে দেখছে বিষয়টা ততটা ছোট নয়। মন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায় সরকার জঙ্গিবাদের গভীরতা বিচার করছে জঙ্গিদের সংখ্যাসাপেক্ষে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে করেই হোক একটি জঙ্গিসুমারি করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের মতে দেশে জঙ্গির সংখ্যা খুব বেশি হলে দেড়শ-দুইশ হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের ফলে জঙ্গিদের এ সংখ্যা নাকি আরও কমেছে। এই মতের ভিত্তিতে খুব সম্ভব সরকারের মধ্যে একটি ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, এই শ’দুয়েক ব্যক্তিকে কোনোভাবে সরিয়ে ফেলতে পারলেই জঙ্গিবাদ খতম। ফলে একটা করে জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, পাঁচটা-দশটা করে জঙ্গি মরে, আর হিসাব কষা হয়- কতজন মরল, কতজন বাকি থাকল। কিন্তু বিষয়টাকে যতটা সহজ ভেবে নেয়া হচ্ছে আসলেই কি তাই?
আমি এ দেশে লাখ লাখ জঙ্গি দেখতে পাই। এই জঙ্গিদের মারা যায় না, ধরা যায় না। এমনকি তাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোও যায় না। সমীহ করে চলতে হয়। সরকার তাদের দেখেও দেখে না, জেনেও জানে না। এটা ঠিক যে, এই লাখ লাখ জঙ্গির হাতে অস্ত্র নেই, গায়ে কালো পোশাক নেই এবং কালো পতাকাও সাথে রাখে না এরা। ‘একে ২২’ নিয়ে শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখী হবার সাহসও এদের নেই। কিন্তু মনে আছে চরম হিংস্রতা, বিদ্বেষ, উন্মাদনা, ধর্মান্ধতা। এরা ‘এই নিরীহ’, ‘এই হিংস্র’। এই আপনার বাসায় দাওয়াত খাচ্ছে, এই আপনাকে কাফের-মুরতাদ ফতোয়া দিয়ে আপনার বাড়ি পোড়াতে আসছে। এই বলছে ইসলাম শান্তির ধর্ম, এই আবার মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মন্দিরে হামলা করছে। হয়ত অনেকেই এদেরকে আক্ষরিক অর্থে জঙ্গি বলতে চাইবেন না, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে জঙ্গিরা যতটা অমানবিক ও ধর্মান্ধ হয়ে থাকে, এরা তার কোনো অংশে কম নয়।
বাহ্যদৃষ্টিতে বারুদও অন্য দশটা পদার্থের মতই নিরাপদ, কিন্তু আগুনের সংঘর্ষে আসলে বোঝা যায় এটার ভয়াবহতা কত, বোঝা যায় সেটা আগুনেরই অন্য পিঠ। বারুদকে তাই বাহ্যদৃষ্টিতে দেখলে চলে না। সরকারের চিহ্নিত দেড়-দুইশ’ জঙ্গির সাথে লাখ লাখ ধর্মান্ধ-ধর্মোন্মাদের পার্থক্য হচ্ছে- ওই জঙ্গিরা আগুনের সংঘর্ষ পেয়েছে বলে জ্বলে উঠেছে, এরা আগুনের সংস্পর্ষ পায় নি। ওদের চেনা যায়, ভেতর-বাহির পড়া যায়। এদের চেনা যায় না। ওরা পরিষ্কার বলে দেয়- তারা রাষ্ট্র মানে না, সংবিধান মানে না, সংসদ মানে না, বিচার মানে না। এরাও বলে, তবে অন্য ভাষায়। প্রতারণার ভাষায়। সে ভাষা যারা পড়তে পারছেন না তারা স্বভাবতই বিপদও টের পাচ্ছেন না। তাদের জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ঘটনাটি চলতি বছরের। প্রায় সবগুলো মিডিয়াতে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। ধর্মান্ধতা ও ধর্মবিশ্বাসের অপব্যবহার কত নির্মম হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই ঘটনাটি।
২০১৬ সালের ১৪ মার্চ। নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে হেযবুত তওহীদের দুইজন সদস্যকে দিনের ঝলমলে আলোয় জবাই করে হত্যা করা হয়। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সেদিন সকাল থেকে ‘জিহাদী সংগ্রহ কার্যক্রম’ আরম্ভ হয়। হেযবুত তওহীদকে প্রচার করা হয় খ্রিস্টান। তারপর স্লোগান তোলা হয়- গীর্জা ভাঙ্গো, খ্রিস্টান মারো। পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা নির্দিষ্ট অভিসন্ধী নিয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটায়।
সেদিন স্থানীয় মসজিদের মাইকেখ্রিস্টান মারার জিহাদের ডাক পেয়ে ছুটে আসা হাজার হাজার ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বাড়িঘর অবরুদ্ধ করে রাখে। যে হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে আসে খ্রিস্টান হত্যা করার জন্য। এমনকি রাস্তায় আটকে পড়া যাত্রীবাহী বাসের যাত্রীদেরকে বলা হয়- এই গ্রাম থেকে খ্রিস্টান উৎখাতের জিহাদ ঘোষণা করা হয়েছে, আপনারাও জিহাদে শামিল হউন। কয়েকজন বাহিরাগত যাত্রীও নাকি হামলায় অংশ নিয়েছিল সেদিন। জিহাদের সুযোগ তারা মিস করতে চায় নি!
চার ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ করে রেখে হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বাড়িতে উপর্যুপরি হামলা চালাতে থাকে তারা। এই দীর্ঘ সময়ে বারবার ডাকাডাকি করেও পুলিশের নাগাল পাওয়া যায় নি, কারণ রাস্তায় গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছিল পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক। পুলিশের গাড়ি সময়মত ঢুকতে পারে নি। যখন পুলিশ এলো, ততক্ষণে আমাদের দুইজন সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করা হয়ে গেছে। তাদের চোখ উপড়ানো হয়, রগ কাটা হয়। তাতেও আক্রোশ না মেটায় লাশের গায়ে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেই সাথে দুইটি বাড়িও আসবাবপত্রসমেত জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেওয়া হয়।
হুজুগে মেতে উঠে হামলায় অংশগ্রহণকারী অনেকেই হেযবুত তওহীদকে নয়, খ্রিস্টানকে মারতে গিয়েছিল। যদি তারা জানত এরা খ্রিস্টান নয়, মুসলমান, তাহলে হয়ত হামলায় অংশ নিত না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- হেযবুত তওহীদ খ্রিস্টান নয় মানেই এই নয় যে, দেশে কোনো খ্রিস্টান নেই। এ দেশে খ্রিস্টান আছে, হিন্দু আছে, বৌদ্ধ আছে, নাস্তিকও আছে। আর আছে বিধর্মী হত্যার জিহাদের ডাক দেওয়ার জন্য হাজার হাজার ধর্মব্যবসায়ী। তাদের একজনের ডাকে লক্ষ জন ছুটে আসবে। যে নৃশংসতা আইএসও কোনোদিন করতে পারে নি, সেটা অবলীলায় করে দেখাবে, যেমনটা সোনাইমুড়িতে করল।
এই যে লক্ষ লক্ষ মানুষের হুজুগপ্রবণতা, চরম সাম্প্রদায়িক ঘৃণা-বিদ্বেষ, ধর্মান্ধতা, জিহাদের কথামাত্র আগপাছ না ভেবে পঙ্গপালের মত ছুটে গিয়ে নিরীহ মানুষের উপর হামলে পড়া, মসজিদকে গুজব ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, যাকে ইচ্ছা তাকে কাফের-মুরতাদ-নাস্তিক ফতোয়া দিয়ে কতল করার ডাক দেওয়া, এক কথায় মানুষের ধর্মবিশ্বাসের অপব্যবহার করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা- এর বিরুদ্ধে আমাদের সরকার শক্তি প্রয়োগ করে আদৌ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম কিনা সেটা ভেবে দেখতে হবে।
নব্য উত্থিত সশস্ত্র জঙ্গিদের প্রতিরোধে সরকার যথেষ্ট সজাগ রয়েছে- এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মদক্ষতাও প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু যদি ভাবা হয় যে, এই দেড়-দুইশ সশস্ত্র ব্যক্তিকে দেশ থেকে সরিয়ে ফেলতে পারলেই বাংলাদেশ নিরাপদ হয়ে যাবে, জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়ে যাবে, তবে সেটা হবে সরকারের অলীক কল্পনা। সর্বক্ষেত্রে ধর্মবিশ্বাসের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা না গেলে, ধর্মভীরু মানুষের ধর্মবিশ্বাস নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেটস্থ থেকে গেলে, মানুষকে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দিতে না পারলে, এ আশঙ্কা করা অমূলক হবে না যে, সেদিন বেশি দূরে নয় যখন মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার জঙ্গি তৈরি হবে, কোথাও গলা কাটা হবে, কোথাও চোখ উপড়ানো হবে, কোথাও রগ কাটা হবে, কোথাও আগুন দিয়ে বাড়িঘর পোড়ানো হবে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আরও বাড়বে। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ মৌলবাদী রাষ্ট্রের খেতাব কুড়োবে। তার জন্য ‘একে-২২’ থাকতেই হবে, কালো কাপড় পরতেই হবে, সাইট ইন্টেলিজেন্সে আইএসের দায় স্বীকার করতেই হবে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Highlights

কাউনিয়ায় অরক্ষিত ১১ রেল ক্রসিং এখন মরন ফাঁদ

Avatar photo

Published

on


কাউনিয়া প্রতিনিধি, রংপুরঃ
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় ব্রিটিশ আমলের কাউনিয়া রেল জংশন ষ্টেশনটি উত্তর জনপদের একটি অন্যতম রেল যোগাযোগের মাধ্যম। জনপ্রিয় এ রেল পথে উত্তরের ২ জেলা কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটসহ রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মানুষ রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের নানা জায়গায় যাতায়াত করে। প্রতিদিন ঐতিহ্যবাহী কাউনিয়া রেল জংশন ষ্টেশন দিয়ে ১২টি আন্তঃনগর ট্রেন মিলে ২৪টি ট্রেন যাতায়াত করছে।

নিরাপদ রেল ভ্রমনের এ ট্রেন যাতায়াতের সড়কে ১১টি রেল ক্রসিং এখন মরন ফাঁদ। রেল ক্রসিং গুলোর রাস্তা দিয়ে দিন-রাত বিভিন্ন যানবাহন, মানুষ ও গবাদী পশু চলাচল করলেও রেল ক্রসিং গুলোতে নেই রেল কর্তৃপক্ষের কোন পাহারাদার বা গেটম্যান তাই হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা আর প্রাণহানী।

ইতোমধ্যে রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে উপজেলার থানা রেল ক্রসিং, তকিপল হাট রেলগেট, গের্দ্দ বালাপাড়া রেল ক্রসিং, খোপাতী তপসীডাঙ্গা রেল ক্রসিং, পাঞ্জরভাঙ্গা রেল ক্রসিং, শহীদবাগ রেল ক্রসিং, বুদ্ধির বাজার বাধের রাস্তা রেল ক্রসিং, মহেশা রেল ঘুন্টি, মৌল রেল ক্রসিং, বল্লভবিষু রেল ক্রসিংয়ে।

এ সব রেল ক্রসিং এখন মানুষ ও গবাদী পশুর মরন ফাঁদে পরিনত হয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নিরব। এ সংক্রান্ত কাউনিয়া উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় অনেক আলোচনা-সিদ্ধান্ত হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সভার সিদ্ধান্তের কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, কিন্তু পাওয়া যায়নি এখনো কোন ভাল ফল।

কাউনিয়া রেল জংশন ষ্টেশন মাস্টার আব্দুর রশীদ জানান, প্রয়োজনীয় ৪২ জন জনবলের বিপরীতে চুক্তিভিত্তিকসহ ২৬ জন দায়িত্ব পালন করছে। এ বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। এলাকাবাসী বলছেন, এক অফিস থেকে আরেক অফিসে জানাজানি চলবে আর কতদিন? তবে কী এভাবেই চলবে একের পর এক দুর্ঘটনা আর প্রানহানী!

Continue Reading

Highlights

বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা

Avatar photo

Published

on

শেখ হাসিনা:

৭ই জুন ৬ দফা দিবস হিসেবে আমরা পালন করি। ২০২০ সাল বাঙালির জীবনে এক অনন্য বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের জন্য এ বছরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালিরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ইউনেস্কো এ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলিও প্রস্তুতি নিয়েছিল। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

যখন এমন ব্যাপক আয়োজন চলছে, তখনই বিশ্বব্যাপী এক মহামারী দেখা দিল। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক এক সংক্রামক ব্যাধি বিশ্ববাসীকে এমনভাবে সংক্রমিত করছে যে, বিশ্বের প্রায় সকল দেশই এর দ্বারা আক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক– সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এ ভাইরাস থেকে মুক্ত নয়। এমতাবস্থায়, আমরা জনস্বার্থে সকল কার্যক্রম বিশেষ করে যেখানে জনসমাগম হতে পারে, সে ধরনের কর্মসূচি বাতিল করে দিয়ে কেবল রেডিও, টেলিভিশন বা ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করছি।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, শ্রদ্ধা জানাই আমার মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে। ৭ই জুনের কর্মসূচি সফল করতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্মরণ করি, ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টে শাহাদাৎবরণকারী আমার পরিবারের সদস্যদের। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতাকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনকে।

ছয় দফা দাবির আত্মপ্রকাশ

১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে বিরোধীদলের সম্মেলন শুরু হয়। সাবজেক্ট কমিটির এই সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাব গৃহীত হয় না। পূর্ব বাংলার ফরিদ আহমদও প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।

৬ই ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটি পত্রিকা এ দাবি সম্পর্কে উল্লেখ করে বলে যে, পাকিস্তানের দুটি অংশ বিচ্ছিন্ন করার জন্যই ৬-দফা দাবি আনা হয়েছে। ১০ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলন করে এর জবাব দেন। ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। বিমান বন্দরেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে ৬-দফা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরেন।

৬-দফা দাবিতে পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ দাবি গ্রহণ বা আলোচনা করতেও রাজি হয়নি। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন ঢাকায়।

আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটিতে ৬-দফা দাবি পাশ করা হয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ দাবি গ্রহণ করা হয়। ব্যাপকভাবে এ দাবি প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় দলের নেতৃবৃন্দ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করে জনগণের কাছে এ দাবি তুলে ধরবেন। ৬-দফা দাবির ওপর বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি পুস্তিকা দলের সাধারণ সম্পাদকের নামে প্রকাশ করা হয়। লিফলেট, প্যাম্ফলেট, পোস্টার ইত্যাদির মাধ্যমেও এ দাবিনামা জনগণের কাছে তুলে ধরা হয়।

কেন ছয় দফা দাবি

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল সে যুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গ বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ অঞ্চলের সুরক্ষার কোন গুরুত্বই ছিল না। ভারতের দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। ভারত সে সময় যদি পূর্ববঙ্গে ব্যাপক আক্রমণ চালাত, তাহলে ১২শ মাইল দূর থেকে পাকিস্তান কোনভাবেই এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে পারত না। অপরদিকে তখনকার যুদ্ধের চিত্র যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে আমরা দেখি পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত ভারত দখল করে নিত যদি না বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকেরা সাহসের সঙ্গে ভারতের সামরিক আক্রমণের মোকাবেলা করত।

পূর্ব পাকিস্তানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কোন শক্তিশালী ঘাঁটি কখনও গড়ে তোলা হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের একটা হেড কোয়ার্টার ছিল খুবই দুর্বল অবস্থায়। আর সামরিক বাহিনীতে বাঙালির অস্তিত্ব ছিল খুবই সীমিত। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বাঙালিদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।

অর্থাৎ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে তা-ও লে. কর্নেল পদে মাত্র ২ জন বাঙালি অফিসার ছিলেন। অথচ যুদ্ধের সময় বাঙালি সৈনিকেরাই সব থেকে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

ঐ যুদ্ধের পর তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা তাসখন্দ চুক্তি নামে পরিচিত। সেখানেও পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বা নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়।

একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি যে, বাঙালির বিরুদ্ধে সব সময় পাকিস্তানের শাসক চক্র বৈমাত্রীয়সুলভ আচরণ করেছে।

প্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষা যা আমাদের মাতৃভাষার ওপর। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত শুরু করে। রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে বাঙালিরা। সে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালে। মূলত তখন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে হবে।

বাঙালিরা সব সময়ই পশ্চিমাদের থেকে শিক্ষা-দীক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চায় সমৃদ্ধ ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের। জনসংখ্যার দিক থেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি। ৫৬ ভাগ মানুষের বসবাস ছিল পূর্ববঙ্গে।

পূর্ববঙ্গের উপার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে গড়ে তোলে পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালিদের উপর অত্যাচার করাই ছিল শাসকদের একমাত্র কাজ। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অন্যান্য দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। মুসলীম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু ৯২ক ধারা অর্থাৎ ইমার্জেন্সি জারি করে নির্বাচিত সরকার বাতিল করে দেয়। পূর্ববঙ্গে চালু করে কেন্দ্রীয় শাসন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে যখন ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনও ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে। এভাবেই বার বার আঘাত আসে বাঙালিদের উপর।

ছয় দফার প্রতি জনসমর্থন

আইয়ুব খানের নির্যাতন-নিপীড়নের পটভূমিতে যখন ৬-দফা পেশ করা হয়, অতি দ্রুত এর প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমার মনে হয় পৃথিবীতে এ এক বিরল ঘটনা। কোন দাবির প্রতি এত দ্রুত জনসমর্থন পাওয়ার ইতিহাস আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সমগ্র পূর্ব বাংলা সফর শুরু করেন। তিনি যে জেলায় জনসভা করতেন সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হত, গ্রেপ্তার করা হত। জামিন পেয়ে আবার অন্য জেলায় সভা করতেন। এভাবে পরপর ৮ বার গ্রেপ্তার হন মাত্র দুই মাসের মধ্যে। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ই মে নারায়ণগঞ্জে জনসভা শেষে ঢাকায় ফিরে আসার পর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ৯ই মে তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। একের পর এক মামলা দিতে থাকে।

একইসঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা শুরু হয়। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতাসহ অগণিত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে মামলা দায়ের করে।

১৯৬৬ সালের ১৩ই মে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ দিবস পালন উপলক্ষে জনসভা করে। জনসভায় জনতা ছয় দফার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৩০-এ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির (ওয়ার্কিং কমিটি) সভা হয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী। ৭ই জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয় এবং হরতাল সফল করার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক সভা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির বাড়িতে অনুষ্ঠিত হত।

৭ই জুনের হরতালকে সফল করতে আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে তিনি দিক-নির্দেশনা দেন। শ্রমিক নেতা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকদের দমনপীড়ন-গ্রেপ্তার সমানতালে বাড়তে থাকে। এর প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ এক্যবদ্ধ হয়। ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব বাংলার সকল স্তরের মানুষ – রিক্সাওয়ালা, স্কুটারওয়ালা, কলকারখানার শ্রমিক, বাস-ট্রাক-বেবিটেক্সি চালক, ভ্যান চালক, দোকানদার, মুটে-মজুর – সকলে এ আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান যে কোন উপায়ে এই আন্দোলন দমন করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেয় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে।

কিন্তু তাদের শত নির্যাতন উপেক্ষা করে বাংলাদেশের মানুষ ৭ই জুনের হরতাল পালন করে ৬ দফার প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়ে দেন। পাকিস্তান সরকার উপযুক্ত জবাব পায়। দুঃখের বিষয় হল বিনা উস্কানিতে জনতার উপর পুলিশ গুলি চালায়। শ্রমিক নেতা মনু মিয়াসহ ১১ জন নিহত হন। আন্দোলন দমন করতে নির্যাতনের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, সাধারণ মানুষ ততবেশি আন্দোলনে সামিল হতে থাকেন।

৭ই জুন হরতাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন: ‘‘১২ টার পরে খবর পাকাপাকি পাওয়া গেল যে হরতাল হয়েছে। জনগণ স্বতস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছেন। তাঁরা ৬-দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়। বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা চায়, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি, কৃষকদের বাঁচার দাবি তাঁরা চায়, এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যে হয়েই গেল” (কারাগারের রোজনামচা পৃ: ৬৯)।

১৯৬৬ সালের ১০ ও ১১ই জুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় হরতাল পালনের মাধ্যমে ছয় দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করায় ছাত্র-শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানানো হয়। পূর্ববঙ্গের মানুষ যে স্বায়ত্বশাসন চায়, তারই প্রমাণ এই হরতালের সফলতা। এ জন্য সভায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। ১৭, ১৮ ও ১৯-এ জুন নির্যাতন- নিপীড়ন প্রতিরোধ দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীর বাড়িতে বাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলন এবং তিন দিন সকলে কালো ব্যাচ পড়বে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। হরতালে নিহতদের পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য একটা তহবিল গঠন এবং মামলা পরিচালনা ও জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনগত সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়। দলের তহবিল থেকে সব ধরনের খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনের সকল কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিল, প্রচারপত্র বিলিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই দাবির প্রতি ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়।

এদিকে সরকারি নির্যাতনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে যত বেশি নির্যাতন আইয়ুব-মোনায়েম গং-রা চালাতে থাকে, জনগণ তত বেশি তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সকল নিপীড়ন উপেক্ষা করে আরও সংগঠিত হতে থাকেন।

১৯৬৬ সালের ২৩ ও ২৪-এ জুলাই আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলন দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ আন্দোলন কেন্দ্র থেকে জেলা, মহকুমা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তীব্রতর হতে থাকে।

সরকারও নির্যাতনের মাত্রা বাড়াতে থাকে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্তদের একের পর এক গ্রেপ্তার করতে থাকে। অবশেষে একমাত্র মহিলা সম্পাদিকা অবশিষ্ট ছিলেন। আমার মা সিদ্ধান্ত দিলেন তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হোক। আওয়ামী লীগ সে পদক্ষেপ নেয়।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

পাকিস্তান সরকার নতুন চক্রান্ত শুরু করল। ১৯৬৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে নিয়ে যায়। অত্যন্ত গোপনে রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর দ্বারা এ কাজ করানো হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে অধিক পরিচিতি পায়।

এই মামলায় ১-নম্বর আসামি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আরও ৩৪ জন সামরিক ও অসামরিক অফিসার ও ব্যক্তিদের আসামি করে।

অপরদিকে ছয় দফা দাবি নস্যাৎ করতে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নেতা দিয়ে ৮-দফা নামে আরেকটি দাবি উত্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এতে তেমন কাজ হয় না। উঁচুস্তরের কিছু নেতা বিভ্রান্ত হলেও ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতিই ঐক্যবদ্ধ থাকেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা অর্থাৎ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান মামলার মূল অভিযোগ ছিল যে, আসামিরা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বক্তব্য ছিল: ‘আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ, সংখ্যাগুরু। আমরা বিচ্ছিন্ন হব কেন? আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই, স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। যারা সংখ্যালগিষ্ঠ, তারা বিচ্ছিন্ন হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠরা নয়।’

এই মামলা দেওয়ার ফলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনা শাণিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। ছাত্ররা ৬-দফাসহ ১১-দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা, মহকুমায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই কোর্ট বসিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা শুরু হয়। অপরদিকে জেল, জুলুম, গুলি, ছাত্র হত্যা, শিক্ষক হত্যাসহ নানা নিপীড়ন ও দমন চালাতে থাকে আইয়ুব সরকার।

পাকিস্তানি সরকারের পুলিশী নির্যাতন, নিপীড়ন ও দমনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। তাঁরা রাস্তায় নেমে আসে। সরকারপন্থী সংবাদপত্র থেকে শুরু করে থানা, ব্যাংক, সরকারের প্রশাসনিক দপ্তরে পর্যন্ত হামলা চালাতে শুরু করে। সমগ্র বাংলাদেশ তখন অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়।

‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করো, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’– এ ধরনের শ্লোগানে শ্লোগানে স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে আসে। এরই এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি এই মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দিখানায় হত্যা করা হয়। মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁদের আশঙ্কা হয় এভাবে শেখ মুজিবকেও হত্যা করবে। সাধারণ মানুষ ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে অগ্রসর হয়। জনতা মামলার বিচারক প্রধান বিচারপতির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে যান।

প্রচণ্ড গণআন্দোলনের মুখে ২১-এ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ২২-এ ফেব্রুয়ারি দুপুরে একটা সামরিক জিপে করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। অন্য বন্দিদেরও মুক্তি দেয়।

ভাষা আন্দোলন-স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতা: ছয় দফার সফলতা

গণআন্দোলনে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতা দখল করে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান। ছয় দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

১৯৭০ সালের ৫ই ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।

কিন্তু বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মানুষ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।

অসহযোগ আন্দোলন থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করে বাঙালি জাতি। ২৫-এ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ৯-মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে বিশ্বে মর্যাদা পায়, পায় জাতিরাষ্ট্র স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

Continue Reading

Highlights

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে হেযবুত তওহীদের নানামুখী উদ্যোগ

Avatar photo

Published

on

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বেকারত্ব একটি অভিশাপ। হেযবুত তওহীদের অন্যতম নীতি হচ্ছে এর কর্মক্ষম সদস্যরা কেউ বেকার থাকতে পারবে না, প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ যোগ্যতা মোতাবেক উপার্জন করবে।
.
আল্লাহর রসুল বলেছেন, “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি, জীবিকা হাসিল করার জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করো এবং তোমাদের প্রচেষ্টার পরিপূর্ণতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, কোনো মো’মেনের সত্তাকে দুনিয়ায় বেকার এবং অনর্থক সৃষ্টি করা হয় নি। বরং তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কর্ম ও কর্তব্যের সঙ্গে সংযুক্ত। কর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অল্পে সন্তুষ্টি এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার অর্থ এ নয় যে, হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা এবং নিজের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া। নিশ্চয়ই আল্লাহর উপর ভরসা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। কিন্তু জীবিকা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা নিতান্তই জরুরি বিষয়। আমি তোমাদেরকে অবহিত করছি যে, দুনিয়ায় যত নবী-রসুল এসেছেন তাদের সবাই রেযেক হাসিলের জন্য চেষ্টা- সাধনা করতেন এবং নিজেদের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতেন না। অতএব তোমরাও রুজি হাসিলের জন্য প্রচেষ্টা করো। শ্রমিক-মজুরের কাজ করা এবং লাকড়ির বোঝা নিজের মাথায় উঠানো অন্যের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম। যার জীবিকা উপার্জনের সামর্থ্য রয়েছে অন্যের কাছে হাত পাতা তার জন্য খুবই অসম্মানজনক। সে দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত এবং শেষ বিচারের দিনও তাকে এমন অবস্থায় হাজির করা হবে যে তার চেহারায় গোশত থাকবে না। আমি পরিষ্কারভাবে তোমাদের বলছি, যার কাছে একদিনের খাদ্যও মজুদ রয়েছে তার জন্য অন্যের কাছে হাত পাতা অবশ্যই হারাম।”
.
এমামুযযামান জমিদার পরিবারের বড় ছেলে হয়েও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার সময় তিনি আন্দোলনের নেতার নির্দেশে কলকাতার রাস্তায় কমলার ব্যবসা করেছেন। তরুণ বয়সে বিভিন্ন প্রকারের ব্যবসা করেছেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক। এন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি নিয়মিত রোগী দেখে গেছেন। হেযবুত তওহীদের সদস্যরা আন্দোলনের কাজে অধিক সময় ব্যয় করা সত্ত্বেও যেন একে অপরের সহযোগিতাক্রমে ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন-জীবিকা চালিয়ে যেতে পারেন, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে পারেন সেজন্য প্রয়োজন পড়ে একটি সুন্দর পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা। এই পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্দোলনের প্রতিটি কমিটিতে একজন কর্মসংস্থান সম্পাদক থাকবেন।

Continue Reading