Connect with us

জাতীয়

যে অভিযোগে মীর কাসেমের মৃত্যুদন্ড

Avatar photo

Published

on

kasemডেস্ক রিপোর্ট: মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামে আলবদর আল বদর বাহিনীর সংগঠক মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১৪ টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ আপিলের চুড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত হয়। ১১ ও ১২ নস্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
আপিলে একটি অভিযোগে তার মৃত্যুদন্ড বহাল এবং অপর ছয় অভিযোগে মোট ৫৮ বছরের কারাদন্ডের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এ রায় পুনর্বিবেচার জন্য (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
জামায়াতের শুরা সদস্য ও দলটির অন্যতম প্রধান অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত মীর কাসেমের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিনগুলোতে তিনি ছিলেন জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের চট্রগ্রাম শহর শাখার সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতায় ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের সমন্বয়ে সশস্ত্র আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়। আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম আলী স্বাধীনতাবিরোধী মূল ধারার সঙ্গে একাত্ম হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন বলে অভিযোগে প্রমাণিত হয়।
তার বিরুদ্ধে আনা ১৪টি অভিযোগের সবগুলোতেই অপহরণ করে নির্যাতনের বর্ণনা রয়েছে। ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ১: ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী চাক্তাই সাম্পান ঘাট থেকে মো. ওমর-উল-ইসলাম চৌধুরীকে অপহরণ করে। তাকে কোতোয়ালি থানাধীন পাঞ্জাবি বিল্ডিংয়ে চামড়ার গুদামে টর্চার সেলে এবং পরে পাঁচলাইশ থানাধীন আসাদগঞ্জের সালমা মঞ্জিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ ২: মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯ নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও আলবদর বাহিনী লুৎফর রহমান ফারুক ও সিরাজকে চাক্তাই এলাকার বকশিরহাটে জনৈক সৈয়দের বাড়ি থেকে অপহরণ করে। এরপর তাদের আন্দরকিল্লার মহামায়া হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা সে সময় তা ডালিম হোটেল টর্চার সেল নামে পরিচিত ছিল এবং মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে ওই হোটেল পরিচালিত হতো। পরে লুৎফর রহমান ফারুককে বাইরে নিয়ে গিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের কর্মীদের বাড়িগুলো চিহ্নিত করিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ফারুককে আরো দুই-তিনদিন ডালিম হোটেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে সার্কিট হাউজে নিয়ে দখলদার পাকিন্তানী বাহিনীর হাতে তুলে দেয় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। সেখানেও তার উপর নির্যাতন চালানো হয়।
অভিযোগ ৩: ওই বছর ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ডবলমুরিং থানাধীন কদমতলীতে তার বাসা থেকে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে অপহরণ করে আলবদর বাহিনী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তাকে ডালিম হোটেলের নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে মীর কাসেমের উপস্থিতিতে নির্যাতন চালানো হয়।
অভিযোগ ৪: ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর গভীর রাতে মীর কাসেম আলীর উপস্থিতিতে ডবলমুরিং থানাধীন আজিজ কলোনি থেকে সাইফুদ্দিন খানকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। সেখানে অন্যদের সঙ্গে তাকেও নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ ৫: ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে মীর কাসেম আলীর নির্দেশে রাজাকার কমান্ডার জালাল চৌধুরী ওরফে জালাল প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে থেকে আব্দুল জব্বার মেম্বারকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ১৭/১৮ দিন আটকে রেখে হাত ও চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের সময় পানি খেতে চাইলে তাকে প্র¯্রাব খেতে দেয়া হয়।
অভিযোগ ৬: মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বরের ২৮ তরিখ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মীর কাসেমের নির্দেশে পাক সেনাদের সহায়তায় আলবদর সদস্যরা হারুন-অর-রশিদকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে চোখ ও হাত বেঁধে তাকে নির্যাতন করা হয়। পরে মীর কাসেমের নির্দেশে তাকে চোখ-হাত বাঁধা অবস্থাতেই পাঁচলাইশের সালমা মঞ্জিলে আরেকটি নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগ ৭: ১৯৭১ এর ২৭ নভেম্বর মাগরিবের নামাজের পরে মীর কাসেমের নির্দেশে ডবলমুরিং থানাধীন ১১১ উত্তর নলাপাড়া থেকে মো. সানাউল্লাহ চৌধুরী, হাবিবুর রহমান ও ইলিয়াসকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। সেখানে তাদের আটকে রেখে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। মীর কাসেমের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ নির্যাতন কেন্দ্রে আটক থাকার সময় তারা আরো অনেককে আটক অবস্থায় দেখতে পান। এদের অনেককে আবার ডালিম হোটেল থেকে নিয়ে যেতে দেখেন তারা, এবং পরে শুনতে পান যে বদর বাহিনীর সদস্যরা তাদের মেরে ফেলেছে।
অভিযোগ ৮: ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর রাত আড়াইটার দিকে মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে পাক সেনাদের সঙ্গে নিয়ে আলবদর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা চাঁদগাঁও থানাধীন সাবহানঘাটা মহল্লা ঘেরাও করে নুরুল কুদ্দুস, মো নাসির, নুরুল হাসেমসহ আরো কয়েকজনকে অপহরণ করে এনএমসি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নিয়ে যায়। পরে ভোর বেলায় ওই তিনজনসহ আরো অনেককে ডালিম হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনজনকে দশদিন আটক রেখে নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ ৯: মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ২৯ নভেম্বর ভোরে মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে চাঁদগাঁও থানাধীন নাজিরবাড়ি এলাকা থেকে পাঁচ চাচাতো ভাইসহ নুরুজ্জামানকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। সেখানে তাদের আটকে রেখে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ ১০: মুক্তিযুদ্ধকালীন ২৯ নভেম্বর ভোর ৫টার দিকে মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা নাজিরবাড়ি এলাকা ঘেরাও করে মো. জাকারিয়া, সালাউদ্দিন ওরফে ছুট্টু মিয়া, ইস্কান্দর আলম চৌধুরী, নাজিম উদ্দিনসহ আরো অনেককে অপহরণ করে এবং এনএমসি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নিয়ে যায়। পরে তাদের সবাইকে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ ১১: ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্রগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরো পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশসহ তার মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
অভিযোগ ১২: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের কোনো একদিন মীর কাসেম আলীর পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা হিন্দু অধ্যুষিত হাজারি লেনের ১৩৯ নম্বর বাড়ি থেকে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং ১১৪ নম্বর বাড়ি থেকে রঞ্জিত দাস ওরফে লাঠুকে ও টুনটু সেন ওরফে রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরদিন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ছেড়ে দেয়া হলেও লাঠু ও রাজুকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়। এই তিনজনকে অপহরণের সময় আলবদর বাহিনী এবং পাক সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনেক দোকানপাট লুট করে এবং অন্তত আড়াইশ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়।
অভিযোগ ১৩: মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বর মাসের কোনো একদিন চট্রগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার গোলাম মোস্তফা কাঞ্চনের বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরছিলেন সুনীল কান্তি বর্ধন ওরফে দুলাল ও তার স্ত্রী, ছেলে ও একজন কিশোর গৃহকর্মী। পথে চাক্তাই সাম্পানঘাটে পৌঁছালে মীর কাসেমের নির্দেশে দুলালকে অপহরণ করে চাক্তাইয়ের দোস্ত মোহম্মদ পাঞ্জাবি বিল্ডিংয়ের নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরো অনেক সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় দুলালকে।
অভিযোগ ১৪: ১৯৭১ এর নভেম্বর মাসের শেষ দিকে চট্রগ্রামের কোতোয়ালি থানাধীন নাজির আহমেদ চৌধুরী রোডে একটি বাড়ীতে আশ্রয় নেন নাসিরুদ্দিন চৌধুরী। একদিন গভীর রাতে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন আলবদর সদস্য ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা নাসিরুদ্দীন চৌধুরীকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় এবং সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়।
২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের এ ১৪টি ঘটনায় অভিযুক্ত করে মীর কাসেম আলীর বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।
আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মীর কাশেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশন আনীত উল্লেখিত ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলী দোষী প্রমাণিত হয়েছে। তবে ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে এসব অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাকে খালাস (অব্যাহতি) দেয়া হয়। প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে ২ নম্বর অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদন্ড দেয়া। ৩, ৪, ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তাকে ৭ বছর করে মোট ৪২ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৪ নম্বর অভিযোগ ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। এই ৮টি অভিযোগে তাকে সর্বমোট ৭২ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের এ রায়ের বিরুদ্ধে আনা অপিলে ২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে দেয়া দন্ড চুড়ান্ত রায়ে বহাল রাখা হয়। আপিলের রায়ে ১১ নং অভিযোগে তার মৃত্যুদন্ড বহাল এবং অপর ছয় অভিযোগে মোট ৫৮ বছরের কারাদন্ডের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Highlights

রাজধানীতে ‘বাংলা ভাষার মান রক্ষায় আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা

Avatar photo

Published

on

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ‘বাংলা ভাষার মান রক্ষায় আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সাড়ে পাঁচটায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কচি-কাচার মেলা হলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হৃদয়ে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ।

সংগঠনটির উপদেষ্টা শাহ মুহাম্মদ সেলিম রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘বাংলা ভাষা বিকৃত করার প্রবণতা তরুণদের মধ্যে বেশ লক্ষণীয়। অফিস-আদালত, চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপনসহ প্রায় জায়গাতেই চলছে বিদেশি ভাষার ব্যবহার। বিদেশি ভাষার আগ্রাসনে খাঁটি বাংলা ভাষার চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে কিছু সুশীল ব্যক্তিবর্গ আছেন যারা বেশি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন। যার প্রভাব পড়ে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে। তারাও মিশ্র ভাষায় কথা বলতে শেখে। বেসরকারি বেতারগুলোর উপস্থাপকরা তো বাংলা বলেন না বললেই চলে। পৃথিবীর প্রায় ২৮ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলা ভাষার স্থান সপ্তম। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য এবং সাহিত্যসম্ভারও বিপুল। অথচ নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষার প্রতি উৎসাহী ও মনোযোগী নয়। আরেকদিকে ইংলিশ মিডিয়ামের দৌরাত্বে অনেক ছেলেমেয়ে যদিও বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে কিন্তু লিখতে পারে না। একটু শিক্ষিতরা বাংলার সাথে ইংলিশ শব্দ মিশ্র করে ককটেল বানিয়ে ব্যবহার করে গৌরব করে। অন্যদিকে একজন অশিক্ষিত কৃষক শ্রমিকের কথায় যদি আঞ্চলিকতা প্রকাশ পায় তাকে আমরা ক্ষেত বলে পরিহাস করতে ছাড়ি না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্য রাখছেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

বক্তব্য রাখছেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আমরা কি বাংলা ভাষাকে সঠিক মর্যাদা দিতে পারছি? আমরা কি বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারি? আমরা কি বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধ করতে পেরেছি? ১৯৪৮ সালে করাচিতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়াসে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেছিল। আমরা কিন্তু তাদের অযৌক্তিক প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। হয়েছে প্রতিবাদ, আন্দোলন। কিন্তু এখন তরুণ প্রজন্মের বড় অংশই ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু কোনো মহল থেকেই এর কোনো প্রতিবাদ উঠছে না -বলেন এই বক্তা।

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও সঠিক ব্যবহারের প্রতি অনেকের আগ্রহ কমছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে আমাদের শিশু ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষার প্রতি মমত্ব ও আগ্রহ নিয়ে উদাসীনতা মোটেও ভালো কিছু নয়। শিশু ও তরুণদের একাংশ বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে বেশি আগ্রহী। এর জন্য আমাদের বিদ্যমান পরিস্থিতিও অনেকাংশে দায়ী। ইংরেজি ভাষা শিক্ষা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু নিজের ভাষাকে অবহেলা করার পক্ষেও আমি নইÑ বলেন হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম।

তিনি বলেন, ‘বিমা-ব্যাংকে গেলে বাংলার ব্যবহার প্রায় অদৃশ্য। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানেও ইংরেজিতে প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা হয়; এমনকি কর্মরতদের নাম, পদবিও থাকে ইংরেজিতে। ব্রিটিশরা আমাদের মনে পরনির্ভরতা ও বিদেশি ভাষার প্রতি যে অনুরাগ তৈরি করে গেছে, সেটি বদলাতে হবে। বিদেশি শব্দ ও ভাবধারার প্রতি আমাদের দুর্বলতা দূর করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ সরকারিভাবে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারে সাফল্য দেখিয়েছে; তাহলে আমরা কেন পারব না?”

সবশেষে তিনি বলেন, মানবজাতি এক জাতি। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ইসলামের নিষিদ্ধ। সব ভাষাই আল্লাহর দেওয়া। প্রকৃতির বৈচিত্র্য যেমন স্বাভাবিক তেমনি ভাষার বৈচিত্র্যও স্বাভাবিক। ইসলাম ভূপ্রকৃতির কারণে জাতীয়তাবাদ এবং ভাষার কারণে বিভিন্নতার কারণে জাতীয়তাবাদ কোনটাকেই স্বীকার করে না। ইসলামের বিধানে সমস্ত মানুষ এক জাতি ভাষার কারণে কোনো জাতি অন্য জাতির উপরে শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন দৈনিক দেশেরপত্রের সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী, লায়ন কেফায়েত উল্লাহ, বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি সৈয়দ হুমায়ুন কবির, অতিথি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও লায়ন সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ নারী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রূপা আহমেদ, দৈনিক বজ্রশক্তির সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা, মাটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সহ-সভাপতি রিয়াদুল হাসান প্রমুখ।

বিশেষ অতিথি মাটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সহ-সভাপতি রিয়াদুল হাসান তার বক্তব্যে বর্তমানের বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভাষা ইংরেজি ভাষার বিভিন্ন দুর্বলতা তুলে ধরে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ সুশৃঙ্খল রূপ তুলে ধরেন।

বিশেষ অতিথি দৈনিক বজ্রশক্তির সম্পাদক এস এম সামসুল হুদা তার বক্তব্যের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ আদালতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহারের নিন্দা জানিয়ে অনতিবিলম্বে এসব দপ্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানান।

সবশেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের বিশিষ্ট শিল্পীদের পরিবেশিত ভাষার গানে দেশের গানে মুখরিত হয় মিলনায়তন।

Continue Reading

Highlights

বই মেলায় আইয়ুব রানার ‘রকমারী ছড়া’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

Avatar photo

Published

on

অর্ধ সাপ্তাহিক সুবাণী সম্পাদক আইয়ুব রানা রচিত ‘রকমারী ছড়া’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। গত সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪) বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চলমান অমর একুশে বইমেলার মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন দৈনিক দেশেরপত্রের সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী। আরও উপস্থিত ছিলেন দৈনিক বজ্রশক্তির সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা, দানবীর সেখ সইদুল ইসলাম (কলকাতা), বইয়ের রচয়িতা আইয়ুব রানা প্রমুখ।

বইয়ের রচয়িতা আইয়ুব রানা জানান, বইটি একুশে বইমেলার ৩৮৪নং উচ্ছ্বাস প্রকাশনীর স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। এ সময় তিনি ছড়া প্রেমিদের বইটি সংগ্রহ করার অনুরোধ জানান।

Continue Reading

জাতীয়

ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ডিএসসিসির অভিযান

Avatar photo

Published

on

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে দক্ষিণ বনশ্রী ও পশ্চিম নন্দীপাড়া সংযোগ সড়ক এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ডিএসসিসি। মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

অভিযানকালে দক্ষিণ বনশ্রী কে ব্লক ও পশ্চিম নন্দি পাড়া সংযোগ সড়কে অবৈধভাবে দখল করে নির্মিত একটি বাড়ির দেয়াল ও গেট ভেঙে দেয়া হয়। ইফতেখার মাহমুদ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি রাস্তা দখল করে এই দেয়াল ও গেট নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়।

স্থানীয়রা জানায়, দফায় দফায় এই বাড়ির মালিক রাস্তাটি দখল করে দেয়াল ও গেট নির্মাণ করেন। ফলে স্থানীয়দের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই সড়কটি দখলমুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিনের।

অভিযান প্রসঙ্গে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, ইতিপূর্বে এখানে অভিযান চালিয়ে দুই বার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেন তা পুনরায় দখল করে দেয়াল ও গেট নির্মাণ করা হয়। তাই স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দেয়ালটি জায়গাটি সম্পূর্ণরূপে দখলমুক্ত করতে আজকের এই অভিযান চালানো হয় বলে জানান তিনি।

Continue Reading