আজকের রাত, ছিটমহলের মুক্তির রাত
ভারত ও বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহলের মানুষের জাতীয়তা বদলে যাবে, এই দিনটির অপেক্ষা সেই ১৯৪৯ সাল থেকে, অবসান ঘটবে ৬৮ বছরের অপেক্ষার।
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল আজ মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশের হচ্ছে। এগুলোর আয়তন ১৭১৬০.৬৩ একর। অন্যদিকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল হয়ে যাচ্ছে ভারতের। এগুলোর আয়তন ৭১১০.০২ একর। কাল থেকে দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে অন্য দেশের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে ছিটমহলে অবরুদ্ধ জীবন কাটানো প্রায় ৫২ হাজার বাসিন্দার আজ তাই আনুষ্ঠানিক মুক্তির রাত। এ মুক্তি যেমন বাংলাদেশের ভেতর আজ রাত থেকে বিলুপ্ত হতে যাওয়া ভারতীয় ছিটমহলে, ঠিক তেমনি ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ছিটমহলেও। দুই দেশেরই ছিটমহলগুলোর বাসিন্দারা প্রত্যাশা অনুযায়ী নাগরিকত্ব এবং যে যেখানে বসবাস করছে, সেখানেই থাকার সুযোগ পাচ্ছে। আগামীকাল শনিবার থেকে ভারতের ছিটমহলে বাংলাদেশের পতাকা ও বাংলাদেশের ছিটমহলে ভারতের পতাকা উড়বে। আজ মধ্যরাতেই দুই দেশের মধ্যে অপদখলীয় ভূমি বিনিময়ও কার্যকর হচ্ছে।
সীমান্ত সমস্যার সমাধান নিয়ে গত মাসে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ৬ জুন সন্ধ্যায় ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের স্থল সীমান্ত চুক্তি ও প্রটোকল বাস্তবায়নে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট’ স্বাক্ষর ও পত্র বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ওই সমস্যার সমাধান হয়। এরই অংশ হিসেবে আজ ৩১ জুলাই মধ্যরাতে কার্যকর হচ্ছে দুই দেশের ছিটমহল বিনিময়।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় অর্থাৎ ৩১ জুলাইকে ধরে কে কোন দেশের নাগরিক হবে সেসব বিষয়ে কাজ করা হয়েছে। যারা ভারতীয় নাগরিক হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছে তাদের চলে যেতে হবে ভারতীয় এলাকায়। আগামীকাল শনিবার ১ আগস্ট থেকে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তারা ভারতীয় ও বাংলাদেশের এলাকায় আসা-যাওয়া করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য ভারত সরকার ‘ট্রাভেল পাস’ ইস্যু করবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ছিটমহলে থাকা ৪১ হাজার ৪৪৯ জন বাসিন্দার মধ্য থেকে ৪০ হাজার ৪৭০ জন বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতীয় নাগরিক হতে চেয়েছে ৯৭৯ জন। গত ১৬ জুলাই ছিটমহলে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নিবন্ধন শেষ হওয়ার পর দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
যেভাবে গড়াল ছিটমহলের ইতিহাস : বছরের পর বছর ধরে এক দেশের ভূখণ্ডের ভেতর আরেক দেশের ছিটমহল থাকাকে ‘অদ্ভুত’ বিষয় হিসেবেই দেখা হতো। কোথাও কোথাও আবার ছিটমহলের ভেতর আরেক ছিটমহল। জনশ্রুতি আছে, এই ছিটমহলগুলো কোচবিহারের রাজা ও রংপুরের মহারাজার দাবা বা পাশা খেলার সময় বাজি ধরার ফল। ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে কোচবিহারের রাজা ও মোগল শাসকের মধ্যে চুক্তির ফলে ওই ছিটমহলগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। অনুমান করা হয়, সীমান্ত নির্ধারণ ছাড়াই কোচবিহারের শাসক ও মোগলরা একটি যুদ্ধ শেষ করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর রংপুর পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেয়। অন্যদিকে কোচবিহার জেলা ১৯৪৯ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৫৮ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূনের মধ্যে চুক্তিতে লাভ-ক্ষতি বিবেচনা না করে ছিটমহলগুলোকে মূল ভূখণ্ডে যুক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি ভারতের আদালতে গড়ায় এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ছিটমহল বিনিময়ের জন্য সংবিধান সংশোধনের বাধ্যবাধকতা পূরণের নির্দেশনা দেন। এরপর ছিটমহল বিনিময়ের পথ সুগম করতে ভারতের সংসদে সংবিধানের নবম সংশোধনীর বিল আনা হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ বেরুবাড়ী ছিটমহল হস্তান্তর নিয়ে আপত্তির কারণে ওই বিল গৃহীত হয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ওই দুই দেশের মধ্যে সুরাহা হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ভারতের সঙ্গে ছিটমহল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
অপর্যাপ্ত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রবেশের সুযোগ না থাকায় এবং সম্পত্তির অধিকার দুর্বল হওয়ায় কয়েকটি ছিটমহল অপরাধমূলক কাজের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তা ছাড়া সংসদ সদস্য, ছিটমহলগুলোর বাসিন্দা, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও রাজনৈতিক দলগুলো বছরের পর বছর ধরে দ্রুত ছিটমহল বিনিময় করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সাল থেকে এ বিষয়ে ভারতকে ‘প্রত্যাশার চাপে’ রেখেছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সীমান্ত সমস্যার সমাধানকে বার্লিন দেয়াল পতনের মতো বড় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সাফল্যকে বিশ্ব গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি কিছুটা সমালোচনাও করেছেন।
বাংলাদেশেরপত্র/এডি/এ

