আজ ২৬ জুন দহগ্রাম আঙ্গোরপোতা করিডর মুক্ত দিবস
নিজস্ব প্রতিনিধি : আজ ২৬ জুন বহুল আলোচিত দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা তিনবিঘা করিডোর মুক্ত দিবস। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করতে দিনভর ব্যাপক কর্মসুচি গ্রহন করেছে ছিটমহলবাসী।
দহগ্রাম বাংলাদেশের একটি ছিট মহল, যা ভারতের মূল ভূখন্ডে অবস্থিত। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভাগের সময় তদানিন্তন বাংলা প্রদেশটি ব্রিটিশ শাসকেরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে দহগ্রাম, যা ভারতীয় ভূখন্ড দ্বারা চারিদিকে ঘেরা, পাকিস্তানের ভাগে পড়ে। এটি ছিল ভারতে অবস্থিত পাকিস্তানের বৃহত্তম ছিট মহল।
১৯৫৩ সালের পূর্বে পাকিস্তান দাবি করেছিল যে, দহগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডের সাথে সরাসরি ভাবে যুক্ত। কিন্তু মানচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এটি পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত হতে প্রায় ৮৫ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত। তখন থেকে এটি দুই দেশের মধ্যকার বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ছিট মহল সংক্রান্ত বিরোধ নিরসনের জন্য চুক্তি হয়। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয় নাই, এবং দহগ্রাম সংক্রান্ত বিবাদ এখন পর্যন্ত বিরাজমান রয়েছে। ১৯৮২ সালে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ১৯৯২ সালে বাস্তবায়িত হয়। এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও দহগ্রামের মধ্যে যাতায়াতের জন্য ৩০ মিটার প্রশস্ত একটি করিডোরের ব্যবস্থা করা হয়। তিন বিঘা করিডোর নামে পরিচিত এই যাতায়াতের পথটি প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা থাকে।
১৯৯২ সালে এ দহগ্রাম আঙ্গোরপোতাকে ৯৯ বছরের জন্য বাংলাদেশকে লিজ দেয় ভারত। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯২ সালের ২৬ জুন রেশনিং পদ্ধতিতে ‘তিনবিঘা করিডর’ এক ঘণ্টা পর পর দিনে ৬ ঘণ্টা খোলা রাখা শুরু করে। তখন কিছুটা হলেও মুক্তির স্বাদ পায় দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা দুটি ছিটমহলের ১৭ হাজার মানুষ।
২০০১ সালের ২১ এপ্রিল আরো ৬ ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত করিডর গেট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে এলে গেটটি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সালের ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা’ সফরের মধ্য দিয়ে এ গেট ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
ওই দিন থেকে বন্ধ হয়নি তিনবিঘা করিডোরের গেট। সেই থেকে উন্নয়নের ছোয়া লাগে অবহেলিত দহগ্রাম আঙ্গোরপোতায়। তৈরী হয় নতুন নতুন ভবন, সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রািতষ্ঠান। ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রামবাসীর ছেলে মেয়েদের জন্য দহগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১০ শয্যা বিষিষ্ট হাসপাতাল, দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স বিভিন্ন স্থাপনার উদ্বোধন করেন।
দীর্ঘ বন্দি জিবনের মুক্তির আনন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের সুদৃষ্টি পেয়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে অবহেলিত দহগ্রাম আঙ্গোরপোতা। বর্তমানে যাতায়ত থেকে শুরু করে সকল নাগরিক সুবিধা পেয়ে বেশ আনন্দিত এখানকার সাধারন মানুষ।
দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের জরিপ মতে, বর্তমানে ১৮৬৮ হেক্টর জমির দহগ্রাম আঙ্গোরপোয় ৩ হাজার পরিবারে বসবাস করে ২০ হাজার মানুষ। ফারি থানা ১টি, বিওপি ক্যাম্প ২টি, ইউনিয়ন পরিষদ ১টি, সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ১টি, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬টি, দাখিল মাদরাসা ১টি, ফোরকানিয়া মাদরাসা ১টি, এবতেদায়ী মাদরাসা ১টি, ১০ শয্যার হাসপাতাল ১টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ২টি, মসজিদ ৩৫টি, মন্দির ১টি, রাস্তা পাকা ১৫ কিঃমিঃ ও কাচা ১০কিঃমিঃ, তিস্তা ও সাঁকোয়া নামে ২টি নদী ও একটি জলমহলসহ অনেক কিছুর সমাবেশ ঘটেছে দহগ্রাম আঙ্গোরপোতায়। বর্তমানে দহগ্রাম আঙ্গোরপোতায় শিক্ষিতের হার ৪০%।
এত কিছুতে এগিয়ে গেলেও লিজ দেয়া ৯৯ বছর অতিক্রম হলে ভারত সরকার পুনরায় তাদের করিডোর গেট বন্ধ করে পুনরায় অবরুদ্ধ করবে কি না এ শ্বংসয়ে দিন কাটছে দহগ্রাম আঙ্গোরপোতা করিডোরবাসীর।
দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহামান রেজা বলেন, এখনো হতাশায় ভুগছেন দহগ্রামের মানুষ। দৈর্ঘ্যে ১৭৮ ও প্রস্থে ৮৫ মিটার তিনবিঘার জমিটুকু জন্য ভারতের কাছ থেকে আমরা করিডরটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়েছি। এর মধ্যে ২৩ বছর চলে গেছে। লিজের সময় শেষ হলে কি হবে? আমরা কি আবার যাতায়াতের সুযোগ হারাব? এমন নানান প্রশ্ন তাদেরকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, ১৯৯২ সাল থেকে ২৬ জুনকে করিডোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করছে এখানকার মানুষ। প্রতি বছরের মতই এ বছরর ব্যাপক কর্মসুচি পালন করবে করিডোরবাসী।