ছিটমহলগুলো মুলভুখন্ড যুক্ত হওয়ার আনন্দে ছিটবাসীরা
শাহ্ আলম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : বাংলাদেশ-ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহল ৩১ জুলাই রাত ১২ টা ১ মিনিটে দু’দেশের মুল ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হবে। এই দিনটিকে স্মরনীয় করে রাখতে ছিটমহল গুলোতে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি।
শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে কুড়িগ্রামের দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলে ভারতীয় পতাকা নামিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হবে। এই মাহেন্দ্রক্ষনে ৬৮ টি মোমবাতী জ্বালিয়ে ৬৮ বছরের অন্ধকার জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে আলোর পথে যাত্রা করবেন ছিটবাসীরা। পোড়ানো হবে আতশবাজী, উড়ানো হবে ফানুস। উৎসব উপলক্ষে শুক্রবার দুপুরে বিশেষ মুনাজাত, প্রার্থনার মধ্যদিয়ে ছিটমহল গুলোতে শুরু হবে আনুষ্ঠানিকতা। দিনভর চলবে নৌকা বাইচ, ঘোড়-দৌড়, লাঠি খেলা, সাংস্কৃকি অনুষ্ঠানসহ নানান গ্রামীন খেলা। আর এসব আনুষ্ঠানিকতার জন্য মঞ্চ তৈরিসহ ব্যস্ত সময় কাটছে ছিটবাসীদের।
ইতিমধ্যে ছিটমহল গুলোতে পৌছেছে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমকর্মী, আর্ন্তজাতিক সংস্থার প্রতিনিধি দলসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মানুষজন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ছিটমহলের ৪১ হাজার ৪শ ৪৯ জন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় আনন্দের জোয়ারে ভাসলেও ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া ৯শ ৭৯ জন মানুষের মাঝে বিরাজ করছে বিষাদের ছায়া। ভারত সরকারের ঘোষনা দেয়া রেশনকার্ড, ফ্লাটবাড়ী ও লাখ লাখ টাকাসহ পুর্ণবাসনের খবরে শুনে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছেন অনেকে।
ছিটমহলের একদিকে উৎসব পালনে মঞ্চ তৈরির কাজ চললেও অন্যদিকে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষেরা গাছ, বাঁশসহ মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কুড়িগ্রামের ৩টি উপজেলার ১২ টি ছিটমহলের শুধুমাত্র দাসিয়ার ছড়া থেকে ভারতে যাবেন ২শ ৮৪ জন এবং ভুরুঙ্গামারীর ১০টি ছিটমহল থেকে ভারতে যাবেন মাত্র ৩৩ জন। এদের মধ্যে মুসলমান রয়েছে ১শ ৫৯ জন এবং হিন্দু রয়েছে ১শ ৫৮জন। ভারত গমনেচ্ছুক অধিকাংশের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রধানত ৫টি কারনে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারন গুলো হলো, পরিবার গুলোর ভারতে বসবাস করা আত্মীয় স্বজন, ভারতের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত আর্কষনিয় প্যাকেজে প্রলুদ্ধ হওয়া, কর্মসংস্থন, নিরাপত্তা এবং ভারতীয় নাগরিক হিসেবে তারা ভারতেই থাকতে চায়।
কুড়িগ্রামের অভ্যন্তরে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা লক্ষীবালা মোহন্ত (৬৫) জানান, আমার দুই মেয়েকে ভারতে বিয়ে দিয়েছি। আমার শেষ জীবনটা তাদের কাছেই কাটাতে চাই। তাছাড়া শুনতেছি ভারতে গেলে ফ্লাটবাড়ী দিবে, ৫লাখ টাকা করে দিবে। এজন্য দুই ছেলে, ছেলের বউ, বাচ্চাসহ ভারতে যাবো।
লক্ষীবালার ছেলে হরিচরন মোহন্ত জানান, প্রথমে বাংলাদেশে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত ভারতে যাওয়ার চুরান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভারত সরকারের দেয়া প্যাকেজে নয়, বৃদ্ধা মা ও দুই বোনের আগ্রহে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এজন্য বাড়ীর গাছ, বাঁশসহ যেসব জিনিসপত্র ভারতে নিয়ে যেতে পারবো না তা বিক্রি করে দিচ্ছে।
দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের সময় থেকে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির লোকজনের সাথে বিরোধ চলে আসছিল এজন্য আর এদেশে থাকতে চাচ্ছি না। তাছাড়া ভারতে গেলে বড় দেশে কর্মসংস্থানে সমস্যায় পড়তে হবে না। এজন্য ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
একই ছিটের বাসিন্দা কাশেম আলী ও গণেষ চন্দ্র জানান, আমাদের পরিবারে বেশির ভাগ সদস্য দীর্ঘদিনে ধরে ভারতে কাজ করছে। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাদের কাছেই ফিরে যাবো।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ ইউনিটের সাধারন সম্পাদক, গোলাম মোস্তফা জানান, ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হবো। এ দিনটিকে স্মরনীয় করে রাখতে ভারতীয় পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হবে। আলোক সজ্জা, আতশবাজী, তোপধ্বনী, মোমবাতী প্রজ্জলন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলা-ধুলাসহ উৎসব পালনের ৩ দিনের কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ছিটমহলের মধ্যে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলটি বড় হওয়ায় সেখানে উৎসব পালনের মঞ্চ বানানো হচ্ছে। ৩১ জুলাই জোহরের নামাজ শেষে মসজিদে মসজিদে মিলাদ মহাফি, মন্দিরে প্রার্থনার মাধ্যদিয়ে উৎসব পালনের কর্মসূচী শুরু হবে।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি, মঈনুল হক জানান, দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের ফল আমরা দু’দেশের সরকারের নিকট থেকে পেয়েছি। এ আনন্দের শেষ নেই। অতিকষ্টে মা সন্তান জন্ম দেয়ার পর সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে যে আনন্দ পায় সে আনন্দ আমরা ছিটবাসীরা পেয়েছি। ৩১ জুলাই মধ্যরাতে আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হবো। দিনটিকে স্মরনীয় করে রাখতে এসব আয়োজন করা হয়েছে। আমরা প্রতিবছর এদিনটিকে ছিটবাসীর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করবো।
বাংলাদেশেরপত্র/এডি/এ
