ফমেক হাসপাতালে ওষুধ পাচার, নেপথ্যে চিকিৎসকদের অসাধুতা
হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে বরাদ্দকৃত সরকারী ওষুধ সাধারণ রোগীদের ভাগ্যে মিলছে না। একশ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব ওষুধ পাচার হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে পাচার হওয়ার সময় ফমেক হাসপাতালের প্রায় লক্ষাধিক টাকার মূল্যবান সরকারী ওষুধ ও ইনজকেশান সহ হাতেনাতে আটক করা হয় এ সিন্ডিকেটের এক মাঠকর্মীকে। তার জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে ওষুধ চুরির সাথে জড়িত ফমেক হাসপাতালের কতিপয় নার্স ও ষ্টাফদের নাম।
গত ১৩ মে বিকেলে ফমেক হাসপাতালে ওষুধ ও ইনজেকশান পাচারের সময় হাতেনাতে আটক হয় ইউনিক ক্লিনিকের ওটি বয় সরোয়ারকে। সরোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায় ফমেক হাসপাতালের লেবার ওটি ইনচার্জ মেরিনা, মেডিসিন ওয়ার্ডের ইনচার্জ রেহানা পারভিন ও সিনিয়র ষ্টাফ নার্স ফেরদৌসিসহ আরো কতিপয় ষ্টাফের নাম জানায় যাদের মাধ্যমে সে দীর্ঘদিন এভাবে ওষুধ পাচার করে আসছে। সূত্র জানায়, হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এসব ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখেন না তাই তারা এসব বাইরে পাচার করে দেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।
বৃহত্তর ফরিদপুরের সবচেয়ে বৃহৎ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফমেক হাসপাতাল অত্রাঞ্চলের আপামর মানুষের সবচেয়ে ভরসার চিকিৎসাস্থল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এসব রোগীদের সাধারণ রোগীরা সরকারী ওষুধ ও সরঞ্জামাদি থেকে বঞ্চিত। চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে অসার্মথ্য যেসব রোগী প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন না তারাই অনন্যোপায় হয়ে এসব সরকারী হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তারা কমিশন লোভী চিকিৎসকদের হাতে চিকিৎসা বাণিজ্যের শিকার হন বলে বিক্ষুব্ধ রোগীদের অভিযোগ।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ব্যবস্থাপত্র পর্যবেক্ষণ করে এবং বিভিন্নজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত চিকিৎসকদের অসাধূতার কারণেই সরকারী ওষুধ রোগীদের ভাগ্যে মিলে না। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে সাধারণ রোগীদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় এবং মানহীন একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা (রোগ নির্ণয়ে ল্যাবরেটরী টেষ্ট) ও ভেজাল ওষুধের অন্যায্য মূল্য পরিশোধে। যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হবে সেসব সরকারী হাসপাতাল অথবা ষ্টকে থাকলেও সরকারী চিকিৎসকেরাই তাতে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এসব চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট ক্লিনিক বা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের নামোল্লেখ করে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেন। এবং এসব বেসরকারী কোম্পানীর ওষুধ এবং ক্লিনিক ও সেন্টারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সরকারী হাসপাতালের চাইতেও ভালোমানের বলে মন্তব্য করেন। আর এতেই প্রাইভেট কোম্পানী ও ক্লিনিক-সেন্টারের চিকিৎসা ব্যবসা দিন দিন ফুলে ফেঁপে ওঠে। অন্যদিকে, ওষুধ পাচারের পথ সুগম হতে থাকে।
সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাইরের দোকানে বিক্রি হওয়া কোম্পানীর ওষুরেধর চেয়ে সরকারী ওষুধের কার্যকারিতা অনেক বেশি তারা প্রমাণ পেয়েছেন। উদাহরণস্বরুপ ব্যাথার জন্য চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী জানান, সরকারী হাসপাতালের প্যারাসিটামলে যে কাজ তিনি পান বাইরের এক্সট্রা প্যারাসিটামলেও তা পাননি। রোগীদের অভিযোগ, কোম্পানীর প্রলোভনেই সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সরকারী ওষুধ অব্যবহৃত রেখে পাচারের পথ সুগম করে দেন। এছাড়া হাসপাতালে প্রতিদিনের ওষুধ তালিকা জনসম্মুখে টাঙানোর নিয়ম থাকলেও তা হয় না। অনেক সময় লিষ্ট থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের সাপ্লাই নেই বলে জানানো হয়।
সরেজমিনে দেখা দেখা গেছে, অফিস টাইম অর্থাৎ সকাল ৯টা হতে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও তা মোটেই মানা হচ্ছে না। হাসপাতালের চিকিৎসকদের কক্ষগুলোতে অফিস টাইমেই কোম্পানী প্রতিনিধিদের জমজমাট আড্ডা দেখা যায়। বাইরে এসব প্রতিনিধিদের সারিবদ্ধ যানবাহন। কেননা অন্যসময় হাসপাতালে চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না, তাই কোম্পানী প্রতিনিধিদেরও অফিস টাইমের বাইরে তখন অযথা সময় ব্যয় করতে হয় না হাসপাতালে। এর বাইরে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের দালালের তৎপরতা দিনরাত সারাক্ষণই ওপেন সিক্রেট।
ফমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে সরকারী ওষুধ ও চিকিৎসা না পেয়ে রাগে-ক্ষোভে হাসপাতাল ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে। বিশ্ব মা দিবসে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারী ওষুধ না পেয়ে হাসপাতালের বাগানে সন্তান প্রসবকারী মা আমেনাকে উনআনত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ফমেক হাসপাতালে। এখানে তাকে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার রেফার্ড করে ওয়ার্ডে পাঠালেও তার ভাগ্যেও সরকারী ওষুধ জোটেনি। অসুস্থ্য অবস্থায় পরেরদিন কাউকে না বলে হাসপাতাল ত্যাগ করেন আমেনা। হতদরিদ্র এই মায়ের ভাষ্য, ‘নার্স আমারে বাইরে থিক্যা ওষুধ কিনতে কইছিলো। আমি ট্যাহা পামু কই? তাই হাসপাতাল ছাইড়া চইল্যা আইছি।’
এসব ব্যাপারে ফমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম মো: আজাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চিকিৎসকদের অসাধুতার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করে জানান, সরকারী ও কোম্পানীর ওষুধের নাম সবই এক। রোগীরাই বিভিন্নসময় বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বেশি তৎপর হন। হাসপাতালের ওষুধ ও ইনজেকশান পাচারের ব্যাপারে তিনি জানান, এব্যাপারে ডা. ইউসুফকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্ত টিম আরো ৭ দিনের সময় চেয়েছে। তদন্ত শেষেই রহস্য জানা যাবে। পাচার হওয়া ইনজেকশানের ব্যাপারে তিনি জানান, তার সময়কালে হাসপাতালে কোন ইনজেকশান বরাদ্দ পাননি। তার দ্বায়িত্ব নেয়ার আগেকার সময়ের হতে পারে এসব ইনজেকশান। আর দালালের উপদ্রবের বিষয়টি তিনি নির্দ্ধিধায় স্বীকার করে নেন।