Connecting You with the Truth
প্রিমিয়াম ওয়েব হোস্টিং + ফ্রি ডোমেইন
সাথে পাচ্ছেন ফ্রি SSL এবং আনলিমিটেড ব্যান্ডউইথ!
অফারটি নিন »

- Advertisement -

বিএনপির নির্বাচনী ইশতিহার -২০২৬ঃ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি বিনির্মানের রূপরেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

 

 

বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসন ও লুটপাটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাত সহ সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে সমস‍্যার কারণে ধুঁকছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
প্রধান অর্থনৈতিক বিপর্যয়গুলো হলো:

ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণঃ বিগত দেড় দশকে ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে। এর ফলে ৬.৭৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ তৈরি হয়েছে, যা অনেক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পরিস্থিতির চেয়েও খারাপ। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ, অপর্যাপ্ত তদারকি এবং দুর্নীতির কারণে এই খাতটি চরম সংকটে পড়েছে।

বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচারঃ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বা ১৬ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ বিদেশী সহায়তা এবং সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের মিলিত মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার আনুমানিক ১২০ টাকা ধরে) এর পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা।

মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নঃ গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি টাকার মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে নাটকীয়ভাবে কমে গেছে (২০২২ সাল থেকে প্রায় ৮৫ টাকা থেকে ১২৩ টাকার উপরে)। এর ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধিঃ দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির কারণে সরকারের রাজস্ব আদায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ব্যাপক ঋণ নিয়েছে, যার ফলে বৈদেশিক ঋণ গত এক দশকে তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব ঘাটতি (Fiscal Deficit) এবং বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি বর্তমানে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে এই দুটি সূচকই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। বিগত ১৬ বছরে (২০০৯ সাল থেকে) বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। সরকার বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), জাইকা (JICA) এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে।আগে বেশিরভাগ ঋণ সহজ শর্তে পাওয়া গেলেও, সম্প্রতি বাণিজ্যিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, যার সুদ হার বেশি এবং পরিশোধের সময় কম।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে এর কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের একটি বড় অংশ খেয়ে ফেলছে। এর ফলে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য তহবিলের পরিমাণ কমে গেছে।

শেয়ারবাজারের দুর্বলতাঃ বিগত ১৬ বছরে শেয়ারবাজার প্রায় ৩৮% সংকুচিত হয়েছে। অসংখ্য দুর্বল কোম্পানির শেয়ার অভিহিত মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ।

দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও সুশাসনের অভাবঃ প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার ক্রমাগত অবক্ষয়ের ফলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। মেধা ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তে রাজনৈতিক সংযোগ অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠেছে।
এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

অর্থনীতির বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের জন‍্য প্রয়োজন সুবিন‍্যস্ত পরিকল্পনা। বিএনপি দেশের অর্থনীতির সংকট মোকাবেলা করে দেশকে অর্থনৈতিক স্হিতিশীলতার জন‍্য “সবার আগে বাংলাদেশ ” স্লোগান কে সামনে রেখে ইশতেহার -২০২৬ ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি “অন্তর্ভুক্তিমূলক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি” হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দলটি। উচ্চাভিলাসী নতুন নতুন বৃহৎ প্রকল্প পরিকল্পনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক ক্ষত পুনরুদ্ধারের দিকে গুরুত্ব দিয়েছে নীতি নির্ধারকরা। ব‍্যবসা বাণিজ্য সহজীকরণ, এসএমই খাতের অর্থায়ন বাড়ানো, সুদ হার কমানো সহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত ও নীতি সহায়তা প্রদানের মাধ‍্যমে অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনয়নের ব‍্যবস্হা করা।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রয়ানের জন‍্য গোষ্ঠী বিশেষদের সুবিধার পরিবর্তে সকলের জন‍্য অংশগ্রহণ মূলক অর্থনীতি বিনির্মাণ করা। অর্থনীতিতে অলিগার্ক কাঠামোর পরিবর্তে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।
সরকার গঠনের প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে দলটি। বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) জিডিপির বর্তমান ০.৪৫% থেকে ২.৫% এ উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আর্থিক খাতের সংস্কারের জন‍্য একটি “অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন” গঠন করে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। আমলারা নয়, নীতিনির্ধারকরাই নীতি তৈরি করবেন।বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দেশব্যাপী পরিকল্পিত শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে ইনডেমনিটি আইনসহ সকল “কালো আইন” বাতিল করা হবে। নবায়নযোগ্য এবং মিশ্র জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে বাপেক্সকে শক্তিশালী করে গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধানে গুরুত্ব আরোপ করা হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকল, বস্ত্রকল এবং চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হবে।
কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে উৎসাহমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার ওপর জোর দিয়েছে বিএনপি। অ্যামাজন, আলিবাবার মতো বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বাংলাদেশকে একটি “সুপার সোর্সিং হাব” হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে এবং জেলা ও গ্রামভিত্তিক অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।

কৃষকদের সহায়তার জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে কৃষকরা সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি, সহজ ঋণ এবং শস্য বীমা পাবেন। এর পাশাপাশি নারী পরিচালিত খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছে।

ক্ষমতার সুষম বণ্টন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ইনডেমনিটি আইনসহ সব কালো আইন বাতিল করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করার কথা উল্লেখ করেছেন।দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) ভিত্তিতে হাসপাতাল নীতি বাস্তবায়ন এবং এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, নদী ও খাল পুনঃখনন এবং পরিবেশ উন্নয়নের উপরও জোর দেয়া হয়েছে।প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (Technical and Vocational Institutions) স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। ক্রীড়া শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে পেশাদার ক্রীড়াবিদ তৈরির মাধ্যমে এই খাতকেও উন্নত করার লক্ষ্য স্থির করেছেন।একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছেন, যেখানে পাহাড় ও সমতলের সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও ভাতার ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন।
সামগ্রিকভাবে, বিএনপি গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর একটি শক্তিশালী এবং নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তোলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যেখানে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হবে।

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.