বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীকে নাগরিকত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি, বঞ্চিত ২২৫

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: অবশেষে বাংলাদেশে অবস্থিত বিলুপ্ত ১১১টি ছিটমহলের অধিবাসীদের নাগরিকত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের নোটিশ বোর্ডে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রাথমিকভাবে বিলুপ্ত ১১১টি ছিটমহলের ৩৭ হাজার ৫৩৫ জন অধিবাসী বাংলাদেশি হিসেবে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত ১২টি ছিটমহলের ৭ হাজার ৭৪৭ জন নাগরিকত্ব পেয়েছেন। গত বছরের ৩১ জুলাই দিনগত রাত ১২টায় (১ আগস্ট) স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের আট মাস পর তারা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই স্বীকৃতি পেলেন।
জেলা প্রশাসকের জিএম শাখা সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-১ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ইতোমধ্যে কুড়িগ্রামে এসে পৌঁছেছে। উপ-সচিব জাহিদ হোসেন মুন্সি স্বাক্ষরিত এবং ‘অধুনালুপ্ত ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ৩৭,৫৩৫ (সাঁইত্রিশ হাজার পাঁচশত পঁয়ত্রিশ) জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান’ শিরোনামের চিঠিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১১ এপ্রিল প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অধিশাখা-৩ এর আওতায় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের নোটিশ বোর্ডে দেখা যায়, প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে নাগরিকত্ব পাওয়া ৩৭ হাজার ৫৩৫ জনের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ছিটমহলগুলোতে পরিচালিত সর্বশেষ হেড কাউন্টিং-এ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে ইচ্ছুক তালিকাভুক্ত অধিবাসীদের নাগরিকত্ব দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পোরারি প্রভিশনস) অ্যাক্ট, ১৯৫১-এর ১৩ নম্বর ধারা-এর ক্ষমতাবলে সরকার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের অপশনকৃত ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ৩৭,৫৩৫ (সাঁইত্রিশ হাজার পাঁচশত পঁয়ত্রিশ) জন ব্যক্তিকে (তালিকা সংযুক্ত) বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান করিল।’ এই প্রজ্ঞাপনটির মাধ্যমে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব আদায়ের কয়েক যুগের দাবি পূরণ হলো।
মূলত ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়ায় ছিটমহল বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়। এগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী, সদর (লোকালয়হীন) ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় ১ হাজার ৮৮০ দশমিক ৪৪ একর আয়তনের মোট ১২টি ছিটমহল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত ১০টি ছিটমহলের ১ হাজার ২১৮ জন এবং ফুলবাড়ী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের ৬ হাজার ৫২৯ জনকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ২০১৫ সালের ৬-১৬ জুলাই তৎকালীন ছিটমহলগুলোতে দুই দেশের যৌথ সমীক্ষা চালানো হয়। এই সমীক্ষায় হেড কাউন্টিং হালনাগাদ এবং অধিবাসীদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়। এ সময় কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত ১২টি ছিটমহলের ভারত যেতে ইচ্ছুক ৩০৫ জনের মধ্যে ২৪৫ জন ভারত চলে যান। একজনের মৃত্যু হয় এবং বাকি ৫৯ জন অধিবাসী শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেই তাদের পৈতৃক ভিটে-মাটিতে থেকে যান।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি (বর্তমানে বিলুপ্ত), বাংলাদেশ ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাওয়ায় ছিটমহলের অধিবাসীরা অত্যন্ত আনন্দিত। এ কারণে বিলুপ্ত ছিটবাসীদের কয়েক যুগের বিড়ম্বনার অবসান ঘটার কথা উল্লেখ করে মোস্তফা জানান, যাদের নাম তালিকাতে আসেনি তারাও যেন দ্রুত নাগরিকত্ব পান সে ব্যাপারে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।
এদিকে ২০১৫ সালের ৬-১৬ জুলাই তৎকালীন ছিটমহলগুলোয় পরিচালিত দুই দেশের যৌথ সমীক্ষায় কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিটমহলগুলোয় মোট অধিবাসীর তালিকা পাওয়া যায় ৭৮৮৬ জনের। যৌথ সমীক্ষায় হেড কাউন্টিং হালনাগাদ এবং অধিবাসীদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়। সে সময় কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত ১২টি ছিটমহলের অধিবাসীদের মধ্য থেকে ভারত যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন ৩০৫ জন। বাকি ৭ হাজার ৫৮১ জন অধিবাসী বাংলাদেশেই থেকে যাওয়ার মত দেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে তালিকা এসেছে ৭ হাজার ৭৪৭ জনের। যৌথ সমীক্ষায় হেড কাউন্টিং হালনাগাদ এবং অধিবাসীদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মতামতে বাংলাদেশে থেকে যেতে ইচ্ছুক ১৬৬ জনের নাম এই প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ পড়েছে। ফলে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে দেখা দেয় সংশয়।
অন্যদিকে ৩০৫ জন ভারত গমনেচ্ছু অধিবাসীর মধ্যে ২৪৫ জন ভারত চলে যান, একজনের মৃত্যু হয় এবং বাকি ৫৯ জন অধিবাসী শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেই তাদের পৈতৃক ভিটে-মাটিতে থেকে যান। প্রজ্ঞাপনে শেষ পর্যন্ত ভারতে না যাওয়া এই ৫৯ জনেরও নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে এ নিয়ে নাগরিকত্ব বঞ্চিত মোট দুই শ ২৫ জনের মধ্যে সংশয় তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে কথা হয় কুড়িগ্রাম জেলা থেকে সদ্য বিদায়ী রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর মো. সোহেল মারুফের সঙ্গে যিনি ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। সোহেল মারুফ জানান, যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেন তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তা পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ ক্রস চেকিংয়ের মাধ্যমে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ব্যাপারে কোনও জটিলতা সৃষ্টিরও সম্ভাবনা নেই। তবে কুড়িগ্রামের অন্তর্ভুক্ত বিলুপ্ত ছিটমহলে ভারত যেতে গমনেচ্ছু ৩০৫ জনের মধ্যে থেকে শেষ পর্যন্ত থেকে যাওয়াদের নাগরিকত্বের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে ফুলবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও জানান, আমরা এখনও কারও কাছ থেকে নাগরিকত্ব না পাওয়া নিয়ে কোনও অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।