ক্বাবাকে সামনে রেখে নামাজ পড়া হয় কেন?

Untitled-3-300x201আসাদ আলী: অধিকাংশ ব্যক্তিই তার জীবনে হয়ত একবারও এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেন নি। করবেন কি করে, এটা যে একটা প্রশ্ন হতে পারে সেটাই তো অনেকের চিন্তার বাইরে। একবারের জন্যও ভাবা হয় না- কেন আমরা ক্বাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ব? একেকজন একেকদিকে মুখ করে নয় কেন? কেউ বলতে পারেন- ক্বাবা আল্লাহর ঘর, তাই ক্বাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া হয়। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো- আল্লাহতো সর্বত্র আছেন, আমাদের প্রত্যেকের ঘাড়ের রগের চেয়েও যিনি নিকটে আছেন (সুরা কাফ ১৬) তাঁকে স্মরণ করার জন্য হাজার হাজার মাইল দূরে তাঁর ঘরের দিকে মুখ করার প্রয়োজন কি?
আসল উদ্দেশ্য সেটা নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে- ঐক্য। মতের ঐক্য, উদ্দেশ্যের ঐক্য, লক্ষ্যের ঐক্য, আকীদার ঐক্য। একদল লোক যদি একত্র হয়ে কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য স্থানের দিকে রওনা হয়, তবে যতক্ষণ তাদের ঐ গন্তব্যস্থানের কথা মনে থাকবে ততক্ষণ তারা একত্রিত থাকবে, একত্রিতভাবেই পথ চলতে থাকবে, কোন বাধা আসলে একত্রিত হয়েই তা প্রতিহত করবে, একত্রিত হয়েই বাধা অপসারণ করবে। কিন্তু মধ্য পথে যদি তারা হঠাৎ সবাই গন্তব্যস্থানের কথা ভুলে যায় তবে অবশ্যম্ভাবীরূপে তারা আর ঐক্যবদ্ধ, একত্রিত থাকবে না, এক এক জন এক এক দিকে ছড়িয়ে যাবে, দল আর দল থাকবে না। এটা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহর রসুল এই জাতির লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন- সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে মানবজীবনে শান্তি আনয়ন করা। এই উদ্দেশ্য-লক্ষ্য, আকীদা এই জাতি যাতে সর্বক্ষণ মনে রাখতে পারে, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যে অভিন্ন, তাদের গতিপথ যে একইদিকে, তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতেই থাকুক, তাদেরকে যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, উদ্দেশ্য স¤পর্কে সজাগ থাকতে হবে- সর্বাবস্থায় এই ধারণাটা মাথায় রাখার জন্য আল্লাহ নামাজের ভেতরেও এই জাতির কেবলা একদিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।
পৃথিবীর সকল প্রান্তের মু’মিন যখন কেবলামুখী হয়ে নামাজে দাড়াবে তখন তাদের মনের ভাব হবে এমন যে, হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ওপর তোমার নবীর মাধ্যমে যে মহাদায়িত্ব (সমস্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা) অর্পণ করেছ, সেই দায়িত্ব পূরণ করার জন্য যে মহান চরিত্র, আত্মার বল প্রয়োজন, সেই চারিত্রিক, আত্মিক ও শারীরিক প্রশিক্ষণ নিতে আমরা তোমার সামনে দাড়িয়েছি। তুমি আমাদেরকে সেই চরিত্র, আত্মিক শক্তি দান কর যাতে করে আমরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দৃঢ় থাকতে পারি।
অর্থাৎ একজন মু’মিন যতবার ক্বাবার দিকে মুখ করে নামাজে দাড়াচ্ছে ততবার সে তার জাতীয় ঐক্য, গন্থব্য ও স্বীয় দায়িত্ববোধ ঝালিয়ে নিতে পারছে। সে যত নামাজ পড়ছে ততই তার জাতীয় চেতনাবোধ শাণিত হচ্ছে। কাবা তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ঐক্যের কথা, গন্তব্যের কথা। দুর্ভাগ্যক্রমে আজ এই উম্মাহ শুধু শারীরিকভাবে একই দিকে, কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ায়; কিন্তু মানসিকভাবে তারা বিভিন্ন মযহাবে, ফেরকায়; আত্মিকভাবে বিভিন্ন তরিকায় ও রাজনৈতিকভাবে
বিভিন্ন ভৌগোলিক রাষ্ট্রে ও রাজনৈতিক দলে বিভক্ত। তারা একই ইমামের নেতৃত্বে, এক মসজিদে, এক জামাতে, একদিকে মুখ করে নামাজ পড়ে। কিন্তু নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসেই ফেরকা-মাজহাব-দলাললি করে একে অপরের বিরুদ্ধে মারামারি-হিংসা-বিদ্বেষে লিপ্ত হয়। তারা ভুলে গেছে তাদের গন্তব্যের কথা, তাদের দায়িত্বের কথা। আজ তাদের একেকজনের একেক লক্ষ্য। পরিণতিতে- এরা অতি নিষ্ঠার সাথে নামাজ পড়ছে ঠিকই, তবে আকীদা ভুলে যাবার কারণে সেই নামাজ তাদেরকে অবধারিত লাঞ্ছনা, অপমান ও গোলামি থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হচ্ছে না। সমস্ত পৃথিবীকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা যাদের, তারা নিজেরাই আজ অনিরাপদ। অত্যাচারী শক্তির বোমার আঘাত থেকে রেহাই পায় না এদের উপাসনালয়গুলোও। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here