গৃহকর্মীর কাজে সৌদিতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন কুড়িগ্রামের রওশনারা
শাহ্ আলম, কুড়িগ্রাম: সংসারের অভাব দুর করে মেয়েকে ডাক্তারী পড়ানোর আশায় সরকারী ভাবে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে ফেঁসে গেছেন কুড়িগ্রাম শহরের পুরাতন রেজিস্ট্রি পাড়া এলাকার রিকসা চালক আব্দুল খলিলের স্ত্রী রওশন আরা বেগম। গত বছরের ২৫ অক্টোবর ২ বছরের জন্য গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে যান তিনি। রিয়াদে গৃহকর্মীর কাজে যোগদানের পর সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম ও মানসিক নির্যাতনের ফলে বর্তমানে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। পরিবারের লোকজনের দাবী তাদের সাথে ঠিকমতো কথাও বলতে দেন না গৃহকর্তা। তাছাড়া শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় ঠিক মতো কথাও বলতে পারছেন রওশনারা বেগম।
এদিকে রওশনারা বেগমের অসুস্থতার খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন তার মেয়ে খাদিজা আক্তার ও ছেলে আব্দুর রহিম। রওশনারার বৃদ্ধ বাবা সোলেমান আলী ও মা রেজিয়া খাতুন খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে শয্যাসায়ী হয়েছেন।
অসুস্থ রওশনারাকে ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসক, কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, রিক্রুটিং এজেন্সিসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ ও লিখিত আবেদন করেও কোন ফল পাচ্ছেন না পরিবারের লোকজন।
এ অবস্থায় উপায়ান্ত না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রওশনারার স্বজনরা। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের নিকট রওশনারাকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনার আকুল আবেদন জানিয়েছেন তারা।
রওশনারার স্বামী রিকসা চালক আব্দুল খলিল জানান, আমার স্ত্রী মেয়েকে ডাক্তারী পড়ানোর আশায় সৌদি আরবে কাজ করতে যায়। কিছুদিনের মধ্যে আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে সে বাড়ি আসতে চায়। কিন্তু তারা বাড়ি আসতে দিচ্ছে না আবার আমার স্ত্রীর চিকিৎসাও ঠিকমত করাচ্ছে না। এ অবস্থায় আমার ছেলে মেয়েরা মায়ের জন্য সব সময় কান্নাকাটি করে। ডিসি অফিসসহ বিভিন্ন অফিসে যোগযোগ করেছি কিন্তু কোন কাজ হয় নাই। আমি সরকারের নিকট আকুল আবেদন জানাই আমার স্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
রওশনারার মেয়ে খাদিজা আক্তার জানান, আমার মা আমাকে ফোন করে বলেছে তার সব সময় বেøডিং হচ্ছে কিন্তু তার কোন চিকিসা করানো হচ্ছে না। ফোনে কথা বলতে চাইলে ফোনও দেয়া হচ্ছে না। ফোন কেড়ে নেয়। নির্যাতনের কোন কথা বাড়িতে জানাতে নিষেধ করেছে। আমার মা ভয়ে কোন কিছু বলতে সাহস পায় না। শুধু বলে আমি আর এখানে থাকতে চাই না। যে করেই হোক আমাকে নিয়ে যাও। সে বর্তমানে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না। আমি আমার মাকে ফিরিয়ে চাই।
রওশনারার মা রেজিয়া খাতুন বলেন, আমার মেয়ে খুব সমস্যায় আছে। মেয়ে আমাকে বলেছে জমি-জমা বিক্রি করে হলেও আমাকে নিয়ে যাও। আমি আমার মেয়েকে দেখতে চাই বাবা। তাকে যে ভাবেই হোক এনে দেন।
কুড়িগ্রাম টেকনিকেল ট্রেনিং সেন্টারের অধ্যক্ষ আইনুল হক জানান, আমাদের ট্রেনিং সেন্টারে জব কেয়ারের লোকজন এসে কর্মী বাচাই করে নিয়ে যায়। পরে তাদের রংপুর কারিগরি প্রশিক্ষন কেন্দ্রে ২১ দিনের ট্রেনিয়ের পর বিদেশে পাঠানো হয়। আমি রওশনারার ব্যাপারটি তার পরিবারের লোকজনের নিকট শুনেছি। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আমার করার কিছু নেই।
এ ব্যাপরে রংপুর কারিগরি প্রশিক্ষন কেন্দ্রে অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান জানান, আমাদের এখানে শুধু ট্রেনিং করানো হয়। পরে তাদের শান ওভারসিজ এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারবো না। আপনারা রংপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। তারাই বিদেশে পাঠানো ও ফিরিয়ে আনার কাজ করে থাকেন।
রংপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক আমেনা বেগম বলেন, রওশনারাকে ফিরিয়ে আনতে তার পরিবারের আবেদন পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে শান ওভারসিজ এজেন্সির পরিচালক কাজলের নিকট রওশনারার বিষয়টি জানতে চাই তিনি উত্তেজিত হয়ে এ প্রতিবেদককে জানান, আপনারা সাংবাদিকরা যেন সব কিছুই। আর আমরা কিছই না। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন সাংবাদিক আমাকে ফোন দেয় দেখা করে। আপনার পেয়েছেন কি। এখন কিছুই বলতে পারবো না বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন জানান, রওশনারার পরিবারের লোকজন আমার সাথে দেখা করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে একটি আবেদন দিয়েছেন। যা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।