তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিমির জানিয়েছেন, অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩ হাজার সেনাসদস্যকে আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাও রয়েছেন। তুর্কি প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনাকে দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে কলঙ্কিত দাগ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এদিকে অভ্যুত্থানের নেপথ্যে কে তা নিয়ে গতকাল পর্যন্ত সংশয় কাটেনি। তুরস্ক সরকার কোনো দ্বিধা না করেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা গুলেন ফেতুল্লাহকে দায়ী করেছেন। তবে গুলেনের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে গুলেন এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন দাবি করে বলেন, তুরস্কের জনগণের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছি। তুরস্ক যাতে শান্তিপূর্ণভাবে ও দ্রুত এ কঠিন সময় পার হতে পারে এ জন্য প্রার্থনা করছি। ৭৫ বছর বয়সী গুলেন এক সময় এরদোগানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তবে গত কয়েক বছরে দুজনের বন্ধুত্বে চিড় ধরে। এরদোগান গুলেনের হিজমত আন্দোলন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি তুর্কি সমাজ, গণমাধ্যম, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় গুলেনের শক্তিশালী উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ ওঠার পর ১৯৯৯ সালে গুলেন যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফোকোনো পাহাড়ি এলাকার ছোট একটি শহরে বাস করেন।
বিবিসি জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকালের পর রাজধানী আঙ্কারা, ইস্তানবুলে মুহুর্মুহু গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। সেনাদের সাঁজোয়া যান রাস্তায় নেমে পড়ে। ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় বসে সেনা প্রহরা। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো বন্ধ করে দেয় তারা, কয়েকটি গণমাধ্যম দপ্তরের নিয়ন্ত্রণও নেয়, দখল করে সরকারি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবন। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট ভবনেও আক্রমণ চালায়। পার্লামেন্টে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটায়। ধারণা করা হচ্ছে, সাংসদরা পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। এছাড়া ইস্তানবুল পুলিশের প্রধান কার্যালয়ের দিকেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। সিএনএন-তুর্কি চ্যানেলের সাময়িক সময়ের জন্য সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অভ্যুত্থানকারী সেনাদের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘শান্তি পরিষদ’ দেশের ক্ষমতা নিয়েছে। তারাই দেশের সংবিধান, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সংরক্ষণ করবে বলেও ওই বিবৃতিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এছাড়া ওই বিবৃতিতে জনগণকে বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সব অংশের সমর্থন না থাকায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তৎপরতায় জনগণ রাস্তায় নেমে এলে বিদ্রোহী সেনাদের উদ্যোগ ভেস্তে যায়। সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনতা রাজপথে অবস্থান নেয়। অপরদিকে পুলিশ বিদ্রোহী সেনাদের গ্রেপ্তার করে।
সেনাদের একাংশ যখন সেনা অভ্যুত্থানে ব্যস্ত ছিল ঠিক ওই সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোগান অবকাশযাপনের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার মারমারিস রিসোর্টে। সেখান থেকেই তিনি তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে টেলিভিশনে ভাষণে বিবৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ওই বিবৃতিতে তিনি অভ্যুত্থান রুখে দিতে সর্বস্তরের জনগণকে রাস্তায় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। এরদোগানের এ আহ্বানে ব্যাপক সাড়া মেলে। হাজার হাজার জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। এর ফলে কার্যত দৃশ্যপট পাল্টে যায়। গতকাল এক পর্যায়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওগুলোয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। এ সময় মারমুখী জনতার মুখে পড়ে সেনারা। অনেক সেনাসদস্য জনতার হাতে বেধড়ক পিটুনির শিকার হন।
কয়েক ঘণ্টা ধরে নৈরাজ্যকর অবস্থা চলার পর ইস্তানবুুলে আতাতুর্ক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রেসিডেন্ট এরদোগান। তিনি এক ভাষণে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তুরস্ককে কোনো দখলদারের কাছে দেওয়া হবে না। এ সময় শত শত সমর্থককে শুভেচ্ছা জানান। তিনি দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল হুলুসি আকার কোথায়, কী অবস্থায় আছেন তা জানেন বলেও জানান। পরে অবশ্য রাজধানী আঙ্কারা থেকে উত্তর-পশ্চিমে আতিনজি বিমানঘাঁটিতে অভিযান চালিয়ে হুলুসি আকারকে উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার রাতে অভ্যুত্থানকারীরা তাকে জিম্মি করেছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিমির জানান, ভারপ্রাপ্ত নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে উমিত দুনদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য একে অভ্যুত্থান বলে মানতে নারাজ। তার মতে এটা সেনাবিদ্রোহের বেশি কিছু নয়। ২ হাজার ৮৩৯ বিদ্রোহী সেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ইলদিমির।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থান চেষ্টার পর দুনদারকে তুরস্কের সেনা প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পাঁচ জেনারেল ও ২৯ কর্নেলকে বরখাস্ত করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ২ হাজার ৭৪৫ বিচারককে।
দেশটির ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান উমিত দুনদার টেলিভিশনের মাধ্যমে জানান, সেনা অভ্যুত্থা চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এতে ১০৪ সেনাসদস্য নিহত হয়েছে।
এদিকে গতকাল তুরস্কের পার্লামেন্ট অধিবেশন বসে। অধিবেশনে সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার নিন্দা প্রস্তাব করা হয়।
তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থান কেন হলোÑ তা নিয়ে বাতাসে নানা গুঞ্জন। কে বা কারা রয়েছে এ রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের নেপথ্যে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তুর্কি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে মার্কিন প্রবাসী ফেতুল্লাহ গুলেনকে দায়ী করলেও গুলেনের পক্ষ থেকে তা জোর গলায় অস্বীকার করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে তা হলোÑ অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর কামাল আতাতুর্ক প্রতিষ্ঠিত আধুনিক তুরস্কে গেল এক যুগের ডান শাসনে সেনাবাহিনীর বহু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়, যা নিয়ে সামরিক বাহিনীতে ক্ষোভ রয়েছে। ক্ষুব্ধ সেনাদের একটি অংশ এটি করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, সিরিয়া ইস্যুতে তুরস্কের মধ্যে গভীর বিভক্তি রয়েছে। অর্থাৎ এরদোগান সরকার সিরিয়ার লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে তুর্কি রাজনীতিতে দ্বিমত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এর ফলে সম্প্রতি দেশটিতে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এর প্রভাব সেনাদের মধ্যে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া এরদোগানের একে পার্টির আধুনিক তুরস্কের মতবাদ দেশটির মধ্যে ইসলামপন্থিরা তীব্রভাবে বয়কট করেছে। এছাড়া এরদোগান সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে মতপ্রকাশে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ। এসব কারণেও হামলা হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
এদিকে তুরস্কের এই ঘোর সংকটের মধ্যে পাশে রয়েছে বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তুর্কি কর্তৃপক্ষকে টেলিফোনে এরদোগান সরকারের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ন্যাটো জোট তুরস্কের বর্তমান সরকারের প্রতি ‘পূর্ণ আস্থা’ রয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানায়। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল এরদোগান সরকারের সমর্থনে বিবৃতি দেয়। এছাড়া রাশিয়া ও ইরান পৃথক বিবৃতিতে অভ্যুত্থানের নিন্দা করে এবং তুর্কি সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।
১৯২৩ সালে মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কের যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬০ সাল থেকে দেশটিতে তিনটি অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে।