দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয় বাংলাদেশের

ক্রীড়া প্রতিবেদক : পাকিস্তান-ভারতের পর দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও ওয়ানডে সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। ফলে দেশের মাটিতে হ্যাট্রিক সিরিজ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লো মাশরাফি বাহিনী। সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে সৌম্য-তামিমের ব্যাটিং তান্ডবে প্রোটিয়াসদের ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারায় টাইগাররা। এতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমবারের ওয়ানডে সিরিজও জিতলো বাংলাদেশ। তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছে টাইগাররা। এই নিয়ে ১৯ বার দ্বিপাক্ষিক কোন সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে বাংলাদেশের এটি ১৫তম সিরিজ জয়।

বাংলাদেশ বোলারদের তোপে তৃতীয় ওয়ানডেতে ৪০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৬৮ রান করে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনে জয়ের টার্গেট দাঁড়ায় ৪০ ওভারে ১৭০ রান। সেই টার্গেট যে বাংলাদেশের দু’ওপেনারের কাছে এতটাই মামুলি ছিলো, তা কেউ আগে বুঝতেই পারেনি। বুঝতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকানরাও। তাই তো তামিম-সৌম্যর অবিশ্বাস্য ব্যাটিং-এর সময় প্রোটিয়াস অধিনায়ক আমলার কপালে চিন্তার ডালপালা ছড়িয়েছে।

চিন্তার ডালপালা ছড়ানোটা স্বাভাবিকই। কারণ বাংলাদেশ ইনিংসের শুরু থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের বুক ফুলিয়ে শাসনই করেছেন তামিম-সৌম্য। ১০ ওভারে দলের স্কোর ৬৩ রানে নিয়ে যান তামিম-সৌম্য। এসময় পাঁচ বোলারকে আক্রমণে এনেও কিছু করতে পারেননি প্রোটিয়াস দলপতি আমলা।

পরের ১০ ওভারেও সুখবর পায়নি দক্ষিণ আফ্রিকা। পরের ১০ ওভার থেকে ৬৮ রান যোগ করেন তামিম-সৌম্য। বাংলাদেশের স্কোরে ‘এত’ রান যোগ করার পিছনে অবদানটা বেশিই সৌম্যর। অবশ্য অবদানটা বেশিই হতে পারতো তামিমের। কিন্তু বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন তামিম। সৌম্য যেখানে হাত খুলে উইকেটের চার পাশে খেলছিলেন, তামিম তখন ছিলেন সঙ্গ দেবার ভূমিকায়। তাই তো নিশ্চিন্তে হাত খুলে উইকেটের চারপাশে চার-ছক্কার নকশা এঁকেছিলেন সৌম্য। ফলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ হাফ-সেঞ্চুরি তুলে ফেলেন সৌম্য।

সৌম্যের এমন বিধ্বংসী ব্যাটিং দেখেও লোভ সামলেছেন তামিম। বিধ্বংসী রূপ না নিয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের জয়ের পথকে সহজ করেছেন তিনি। সাথে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৩১তম হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ পান তামিম।

তামিমের এমন অর্জনে, সেঞ্চুরির প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয় সৌম্যর। সেখানেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তামিম। কারন দলের জয়ের রানের চেয়ে কিছুটা কম রান দরকার পড়ে সৌম্যর। তাই নিজে বড় শটে না গিয়ে সৌম্যকে স্ট্রাইক দিয়েছেন তামিম। কিন্তু দুভাগ্য সৌম্যর।

রিস্থিতিকে সহজভাবে নিয়ে সহজে খেলতে গিয়ে সফরকারী স্পিনার ইমরান তাহিরের বলে আউট হন সৌম্য। মাত্র ৭৫ বলে ১৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ৯০ রান করেন সৌম্য। তখন দলের রান ২৪ দশমিক ৪ বলে ১৫৪ রান। জয় থেকে তখন বাংলাদেশ দূরে ১৬ রান।

সেই দূরকে অতি নিকটে এনে বাংলাদেশকে ম্যাচ ও সিরিজ জয়ের উল্লাসে মাতিয়ে তুলেন তামিম। সেই জয়ে ভাগিদারও হয়েছেন তিন নম্বরে নামা লিটন কুমার দাস। চার মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন লিটন। ৫ রানে অপরাজিত থাকা লিটনের পাশে তামিমের রান ঝলমল করছিলো ৬১তে। তার ৭৭ বলের ইনিংসে ৭টি বাউন্ডারির মার ছিলো। ম্যাচ ও সিরিজ সেরার পুরস্কার পান বাংলাদেশ ওপেনার সৌম্য সরকার। আর সিরিজ সেরার পুরস্কার পান ।

ঈদুল ফিতরের আগে বাংলাদেশ দলের এমন সিরিজ জয় বাঙ্গালির জন্য মনে রাখার মত এক উপহারই বটে। অভিন্দন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে। অভিন্দন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে।

চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং বেছে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক হাশিম আমলা। শুরুতেই বাংলাদেশ বোলারদের তোপের মুখে পড়ে প্রোটিয়াসরা। ফলে ১৯ রানের মধ্যে ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে যায় সফরকারীরা। কুইন্টন ডি কককে ব্যক্তিগত ৭ রানে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমান এবং ফাফ ডু-প্লেসিসকে ৬ রানে ফিরিয়ে দেন অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।
এরপর প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন অধিনায়ক আমলা ও রিলি রোসৌ। কিন্তু আমলাকে নিজের ঘুর্নিতে বোকা বানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার তৃতীয় উইকেট তুলে নেন সাকিব। ফলে ২৬ রানের জুটি ভাঙ্গে। আমলা করেন ১৫ রান।

আমলার বিদায়ের ৫ রান পরই রোসৌকে প্যাভিলিয়নে ফেরান মাহমুদল্লাহ রিয়াদ। ১৭ রান করে থামেন রোসৌ। তার বিদায়ে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৫০ রান।

দ্রুত ৪ উইকেট হারানো দক্ষিণ আফ্রিকাকে এরপর সামনের দিকে টেনে নিয়ে যান ডেভিড মিলার ও জেপি ডুমিনি। বাংলাদেশ বোলারদের উপর চাপ সৃষ্টি করার পথেই হাটচ্ছিলেন তারা। কিন্তু ২৩ ওভার পরই বৃষ্টি নামলে বন্ধ হয়ে যায় খেলা।

দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকার আবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হয় খেলা। আর খেলার পরিধি নির্ধারন করা হয় ৪০ ওভার। এরপর খেলতে নেমে আবারো বাংলাদেশী বোলারদের দাপটে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা। তাই বড় স্কোর গড়ার আশা ভেস্তে যায় তাদের। ফলে শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ১৬৮ রান করতে সমর্থ হয় সফরকারীরা। দলের পক্ষে ডুমিনি ৫১ ও মিলার ৪৪ রান করেন। বাংলাদেশের পক্ষে সাকিব ৩টি, মুস্তাফিজুর ও রুবেল ২টি করে উইকেট নেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :
দক্ষিণ আফ্রিকা : ১৬৮/৯, ৪০ ওভার (ডুমিনি ৫১, মিলার ৪৪, সাকিব ৩/৩৩, মুস্তাফিজুর ২/২৪, রুবেল ২/২৯)।
বাংলাদেশ : ১৭০/১, ২৬.১ ওভার (সৌম্য ৯০, তামিম ৬১*, ইমরান ১/৩৭)।
ফল : বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

সিরিজ : তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নিলো বাংলাদেশ। 

ম্যান অব দ্য ম্যাচ : সৌম্য সরকার (বাংলাদেশ)।
ম্যান অব দ্য সিরিজ : সৌম্য সরকার (বাংলাদেশ)।

Comments (0)
Add Comment