যেকোনো সময় অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে তার জীবন। এই মুহূর্তে তাকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটেই রাখতে হবে। বাইরে বের করা যাবে না। নাজমার বুকফাটা কান্নায় তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বাতাস ভারী। রাত গভীর হওয়ায় তার গগণবিদারী কান্না আরো তীব্র হয়ে উঠছিলো। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নাজমার আকুতিতে এক পর্যায়ে তাকে নেয়া হয় নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) বিভাগে। ওখানেই ভর্তি আছে নাজমার শিশুটি।
নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যার জন্ম। দুর্বৃত্তদের গুলিতে মায়ের পেটে বসেই সে গুরুতর আহত হয়েছে। পিঠের ভিতর গুলি ঢুকে বুকের পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। গত ২৩ জুলাই রাতে মাগুরা শহরের দোয়াপাড়ায় দলীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় যুবলীগ নেতা আজিবুর ও আলী হোসেনের গ্রুপ চা দোকানি বাচ্চু ভুঁইয়ার বাড়িতে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে। এ সময় বাচ্চু ভূইয়ার স্ত্রী গর্ভবতী নাজমা আক্তার গুলিবিদ্ধ হন। আবদুল মোমিন ভূইয়া ও মিরাজ হোসেন নামে আরো দুইজন গুলিবিদ্ধ হন সেখানে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবদুল মোমিন মারা যান।
গত ২৪ জুলাই রাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নাজমা মেয়ে শিশু জন্ম দেন। জন্মের আগেই পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা যায় শিশুটির শরীরেও গুলির ক্ষত রয়েছে। জন্মের পর দেখা যায় শিশুটির শরীরেও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তার পিঠে গুলি লেগে বুকের এক পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। ডান হাতে গুলি লেগেছে। এছাড়া চোখের উপরও ক্ষত রয়েছে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে ২৫ জুলাই ভোরে শিশুটিকে মাগুরা থেকে এনে ঢামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়।
গত ২৮ জুলাই শিশুটির চিকিৎসার জন্য ৮ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের সদস্যরা একমত হয়ে গত ২৯ জুলাই শিশুটির অপারেশন করেন। চার ঘণ্টার সফল অপারেশন শেষে শিশুটিকে শিশু সার্জারি ওয়ার্ডে নেয়া হয়। তার শরীরে মোট ২১টি সেলাই লেগেছে। ৩০ জুলাই শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে তাকে নেয়া হয় এনআইসিইউতে। সেখানেই ভর্তি আছে শিশুটি। এদিকে, ওইদিন সন্ধ্যায় শিশুটির মা নাজমাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। তাকে ভর্তি করা হয় গাইনী ওয়ার্ডে।
শিশুটিকে দেখার জন্য নাজমা হাসপাতালে আসার পর থেকেই কাঁদছিলেন। গভীর রাতে তার আর্তচিৎকারে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে হাসপাতালের। অনেক আকুতি-মিনতির পরে তাকে নেয়া হয় এনআইসিইউ’র সামনে। ট্রলিতে শুইয়ে তাকে নেয়া হয় সেখানে। ভেতরে কাচের ঘরে চিকিৎসাধীন শিশুটি। ঘাড় কাত করে সন্তানকে দেখার পরেই গগণবিদারী চিৎকার দিয়ে ওঠেন নাজমা। পরে তাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে সেখান থেকে নিয়ে আসা হয়। ডাক্তার বলেছেন, নাজমা এখনো সুস্থ নন। তার শরীরেও গুলির গভীর ক্ষত। তারোপরে সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য অস্ত্রোপচার। এখনো উঠে বসার ক্ষমতাও হয়নি তার। অপরদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার আবিদ হোসাইন মোল্লা আজ সাংবাদিকদের বলেছেন, শিশুটি এখনো পরিপূর্ণ হয়নি।
নির্ধারিত সময়ের আগেই তার জন্ম। এছাড়া গুলির গভীর ক্ষতে রয়েছে ২১টি সেলাই। ডাক্তার বলেছেন, শিশুটিকে এই মুহূর্তে মায়ের কাছে দেয়াটা নিরপদ নয়। তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে এবং এন্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে। ডাক্তার বলেছেন, শিশুটি একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই মায়ের কাছে দেয়া যাবে। এদিকে, বাচ্চু ভূইয়া তার স্ত্রী নাজমা ও শিশু সন্তানকে দেখভালের জন্য হাসপাতালে অবস্থান করছেন। আজ তিনি বলেছেন, তারা আতঙ্কে আছেন। দুর্বৃত্তদের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেকোন সময় তারা বড় ধরণের কোন ঘটনা ঘটাতে পারে বলে তার আশঙ্কা।
বাংলাদেশেরপত্র/এডি/পি