রমজান ঘিরে ওইসব বৈঠকে সরকার সমর্থক বলে পরিচিতি কোনো কোনো ব্যবসায়ী আগ বাড়িয়ে বলেছিলেন, সরবরাহ ও মজুদ স্বাভাবিক থাকার পরও কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যবসায়ীদের এ কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও একাধিকবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, রমজান উপলক্ষে বাজারে সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে। উৎপাদন ও আমদানি পরিস্থিতিও চাহিদার চেয়ে বেশি। ফলে রমজানে কেউ কারসাজি করে পণ্যের দাম বাড়ালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারির পরও পণ্যের দাম বেড়েছে। ভোক্তারা আশা করেছিলেন, যেহেতু সরকার ও ব্যবসায়ীরা একই সঙ্গে বিষয়টি দেখার কথা বলেছেন, সেহেতু এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু কার্যত এ ক্ষেত্রে সরকার বা ব্যবসায়ী নেতারা, কারো পক্ষ থেকেই কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই ভোক্তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কিনতে গিয়ে পকেট কাটার বা বেশি দামে কেনার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন।
এত হতাশার মধ্যেও আশার কথা হলো, এরই মধ্যে বাজার তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৪টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিম বাজারে রয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে ১৪টি মনিটরিং টিম বাজারে নামানো হয়েছে। এর বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিমের পাশাপাশি গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা বাজারে নেমেছেন। তারা কোথাও পণ্যের দামে অস্বাভাবিকতা দেখলে সঙ্গে-সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমান পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, রোজার মাসে সব কিছুর দাম একটু বাড়ে। কারণ এ মাসেই কর্মচারীদের বেতনের পাশাপাশি বোনাস দিতে হয়। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক অনেক খরচ রয়েছে। তারপরও পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়েনি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই আছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত তিন মাসের ব্যবধানে খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রমজান সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম। তবে সয়াবিন তেলের দাম এবার খুব বেশি বাড়েনি। কেননা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে এর দাম কমেছে, সেভাবে স্থানীয় বাজারে কমেনি।
বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব পণ্যেরই দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। দাম নিয়ে বাকবিত-ায় লিপ্ত হতে দেখা গেছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের। পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় পাইকারি বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি বাজারে দৃশ্যমান স্থানে একটি নোটিশ বোর্ডে পণ্যের মূল্যতালিকা উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ বাজারে নোটিশ বোর্ড দেখা গেলেও তাতে পণ্যের মূল্যতালিকা নেই। এ বিষয়ে কেউ তদারকিও করেন না। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিল মোহাম্মদ জানান, আগে মূল্যতালিকা টানানো হতো। এখন টানানো হচ্ছে না। কারণ কেউ এটি টানাতে বলে না। এ ছাড়া বাজারে সকালে থাকে এক দাম, বিকালে অন্য দাম। রাতে দাম আরও কমে। এ কারণে মূল্যতালিকা লেখা হয় না।
বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চিনি ৬২ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ৩৮ টাকা। তিন মাস আগে প্রতি কেজি চিনি ছিল ৪৫-৪৮ টাকা। ইফতারের অন্যতম পণ্যের মধ্যে আছে ছোলা। এর দাম এখন ১০০ থেকে ১১০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে এর দাম ছিল ৭৮-৮৮ টাকা। বিদেশি আমদানিকৃত রসুনের দাম এখন ২২০ টাকা। যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ১৬০ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে এর দাম ছিল ১৪০ থেকে ১৫৫ টাকা। দেশি রসুন প্রতি কেজি ১৩০ টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা।
পেঁয়াজের দামও বেড়েছে লাগামহীনভাবে। দেশি পেঁয়াজের কেজি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বিদেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২৪ থেকে ৩০ টাকা।
কাঁচামরিচের দাম বেড়ে এখন ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩০ টাকা। শসার দাম এখন ৪০ টাকা কেজি। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩০ টাকা। বেগুন প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১৫ থেকে ২৫ টাকা।
চিকন মুড়ির কেজি ৫৫ থেকে ৬০ এবং দেশি মোটা মুড়ি ১০০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত। চিড়ার কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এসব পণ্যেও প্রতি কেজিতে গড়ে ১০ টাকা করে দাম বেড়েছে।
প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকায়। আগে ছিল ৪০০ টাকা। খাসির মাংসের কেজি ৬২০ থেকে ৬৫০ টাকা। আগে ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। ব্রয়লার সাদা মুরগি ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা কেজি। এক মাস আগেও ছিল ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা।
মসলার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। ক্রেতারা মসলা স্বল্প পরিমাণে কেনেন বলে এর দাম বেশি পড়ে। জিরা প্রতি কেজি ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, আগে ছিল ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা। দারুচিনি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি, লবঙ্গ প্রতি ২৫০ গ্রাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, এলাচ প্রতি ২৫০ গ্রাম ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আদার কেজি ৬৫ থেকে ৮০ টাকা। এ ছাড়া আখের গুড় ৮০-৯০, পোলাউয়ের চাল ১১০, সুজি ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল ৪৫৫ এবং এক লিটারের বোতল ৯০-৯৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৬৪-৬৬ টাকায় এবং পাম অয়েল সুপার বিক্রি হচ্ছে ৬৭-৬৯ টাকা লিটার দরে।
চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, স্বর্ণা ও গুটি চালের দাম বেড়েছে কেজিতে দুই টাকা। ৫০ কেজির বস্তায় ১০০ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে জিরা নাজির ৫৫, নাজিরশাইল ৫২, নিম্নমানের নাজিরশাইল ৪৫, লতা ৩৬, হাসকি ৩৬, মিনিকেট (পুরনো) ৪৮, নতুন ৪৫, জিরা মিনিকেট ৪২, পাইজাম ৩০, গুটি ৩০, কাটারি ৮০ ও বাসমতি বাংলা ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র (কেজি/টাকায়)
পণ্যের নাম গতকালের দর (সরেজমিন) ফেব্রুয়ারি মাসের গড় দর (টিসিবি) বৃদ্ধির পরিমাণ
চিনি ৬২-৬৫ ৪৫-৪৮ ১৭
ছোলা ১০০-১১০ ৭৮-৮৮ ২২
কাঁচামরিচ ৭০-৮০ ২৫-৩৫ ৪৫
রসুন (আমদানি) ২২০ ১৪০-১৫৫ ৮০-৬৫
পেঁয়াজ ৪৫-৫০ ২৫-৩০ ২০
বেগুন ৫৫-৬০ ১৫-২৫ ৩৫
আলু ২০-২২ ১৪-১৬ ৬
গরুর মাংস ৪৫০ ৩৭০-৪০০ ৮০-৫০
খাসির মাংস ৬৫০ ৫০০-৫৫০ ১৫০-১০০
মুরগি (ব্রয়লার) ১৭০-১৭৫ ১৩৫-১৪৫ ৩০
খেজুর (মানভেদে) ২০০-৩০০ ১৫০-২০০ ৫০-১০০