প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব আজ এগিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বৈশ্বিক ক্ষুধার ক্ষেত্রেও। তবুও বিশ্বের প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষ এখনও অপুষ্টিতে ভুগছেন।’
তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদ আজ কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে।’
শেখ হাসিনা শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ইন্টারপার্লামেন্টারিয়ান ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১৩৬তম সম্মেলনের বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ সংসদীয় ফোরামের আয়োজন করে জাতীয় সংসদ। উদ্বোধনী পর্বে নানা আয়োজনে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, একাত্তর, বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনকে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘১৯৮৬ সালে আমি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আইপিইউ সম্মেলনে অংশ নিয়েছি। এ সম্মেলনকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। কারণ গণতন্ত্র শুধু কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটা মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি মাধ্যম। আইপিইউ সম্মেলন গণতন্ত্রের এ উদ্দেশ্য পূরণে ভূমিকা রাখে।’
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, ‘এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে পরিত্রাণের জন্য যে সহায়তার প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন ফোরামে দেয়া হয়েছে, সেগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।’
তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক বিরাটসংখ্যক শিশু পুষ্টির অভাবে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। অসুখে-বিসুখে চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত তারা। সুযোগ পাচ্ছে না বিদ্যালয়ে যাওয়ার। অথচ প্রাচুর্যে ভরা এই বিশ্বে মানবজাতির বেঁচে থাকার সব ধরনের রসদ বিদ্যমান। একটু সহানুভূতি, সহযোগিতা, পরস্পরের প্রতি মমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বিশ্বকে এক নিমিষেই ক্ষুধামুক্ত করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব নতুন এক উপদ্রবের মুখোমুখি হয়েছে। সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। মানুষের শান্তি বিনষ্ট করছে। জঙ্গিবাদ আজ কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। তা না হলে আমরা আবার অন্ধকার যুগে ফিরে যাব।
৫ দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সম্মেলনের উদ্বোধন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী এ সময় স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন এবং আইপিইউ ওয়েব টিভিও উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় একটি বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের অন্যান্য ইভেন্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) অনুষ্ঠিত হবে। ৫ দিনের এ সম্মেলনে ১৩১টি দেশের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদ সদস্যসহ প্রায় দেড় হাজার প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতায় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদসহ অস্থিরতা দূরীকরণে সংসদ সদস্যদের কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্পিকার বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে কাজ করার কথা এমপিদের স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি এ সময় জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব অ্যান্টনিও গুদরেজের একটি বাণী পড়ে শোনান।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও আইপিইউর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট হবেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আইপিইউর এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘অসাম্যতার প্রতিকার : মর্যাদা নিশ্চিত এবং সকলের জন্য কল্যাণ।’ ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা লাভের পর আইপিইউর আন্তর্জাতিক এ সম্মেলন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্মেলন উপলক্ষে নেয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয় -সাবের হোসেন : উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইপিইউ প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী সম্মেলনে আগত সব দেশের জনপ্রতিনিধিসহ পর্যবেক্ষকদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি এ সম্মেলনে আতিথেয়তা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি, আর্থিক সেবায় মানুষের অংশগ্রহণের মতো বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। দেশের মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা লাভের সুযোগ রয়েছে। ১০ বছর আগে দেশের খুব অল্প মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। এখন দেশের প্রায় সব মানুষের হাতেই মোবাইল ফোন পৌঁছে গেছে। এ সময়ে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে সাড়ে ছয় কোটিতে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের এসব অর্জন বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।’
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ টেনে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের এক রোল মডেল বাংলাদেশ। আজকের সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা সবাই নারী। এমন একটি দেশে আইপিইউর সম্মেলন এই প্রথম।’
বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের শুরু : মূলত বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকায় শুরু হল আইপিইউর সম্মেলন। প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ সংসদীয় ফোরামের সম্মেলনের আয়োজক বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। উদ্বোধনী পর্বে সংসদ ভবনকে ব্যাকগ্রাউন্ড রেখে নৌকা আকৃতির মঞ্চ তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হয়। বিশ্বের ১৬৪টি দেশের আইনসভার সংগঠন আইপিইউর বর্তমান সভাপতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী।
৫ দিনের এ সম্মেলনে নোবেল বিজয়ী মানবাধিকারকর্মী কৈলাশ সত্যার্থী আজ সম্মেলনের প্রতিপাদ্যের ওপর কি নোট পেপার উপস্থাপন করবেন। শুক্রবার আইপিইউর পক্ষ থেকে জানানো হয়, এবারই প্রথমবারের মতো ‘গ্রিন অ্যাসেম্বলি’র আয়োজন করা হয়েছে। উদ্বোধন করা হয় আইপিইউ ওয়েব টিভির। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ সহস্রাধিক অতিথি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ দিয়েই শুরু আইপিইউ টিভি : ঢাকায় আইপিইউর ১৩৬তম সম্মেলন থেকে শুরু হল আইপিইউ অনলাইন টেলিভিশন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। সংগঠনটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আইপিইউ টিভি চালু হল। আর এটি হচ্ছে বাংলাদেশের একটি আইটি কোম্পানির মাধ্যমে, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বলে শনিবার জানিয়েছেন সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী।