রিয়াদুল হাসান
যে কাজের গুরুত্ব বেশি সেটা বেশি বার বলা স্বাভাবিক। ইসলামের কোন বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝার জন্য কোন বিষয়টি কোর’আনে বেশিবার বলা হয়েছে সেটাকে নির্ভুল মানদণ্ড মনে করা হয়।
ইসলামের দুটো অংশ – তওহীদের উপর ঈমান ও আমল। আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ মেনে নেওয়া হচ্ছে তওহীদ যা সব আমলের পূর্ব শর্ত। তাই তওহীদের কথা কোর’আনে এসেছে ৫৫৭ বার। আরো বহু আয়াতে এর ব্যাখ্যা যুক্তি প্রমাণ উল্লেখিত হয়েছে।
বর্তমানে মুসলিম দাবিদার জাতিটি আল্লাহকে তাদের হুকুমদাতা, বিধানদাতা (ইলাহ) হিসাবে মানছে না, তাদের সামগ্রিক জীবনে মানুষের তৈরি বিধিবিধানকে তারা মেনে নিয়েছে অর্থাৎ মানুষকে ইলাহ মানছে। ফলে তারা তওহীদ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে কুফর ও শেরকে নিমজ্জিত হয়ে আছে। তওহীদে না থাকলে কোনো আমল কবুল হয় না। তারা যে তওহীদে নেই এটা অনুধাবন না করার দরুণ এই জনগোষ্ঠী ধুমাইয়া আমল করে যাচ্ছে যা পণ্ডশ্রম হচ্ছে।
কোর’আনে কীসের উল্লেখ কতবার হয়েছে সেই আলোকে আমলগুলোর গুরুত্বের ক্রমধারা দাঁড়ায় এমন:-
১. জেহাদ ৬৭৪ বার।
২. সালাত শব্দটি এসেছে ১৪০ বার
৩. যাকাত শব্দটি এসেছে ৪২ বার
৪. হজ্ব শব্দটি এসেছে ৩১ বার
৫. সওম শব্দটি এসেছে ২ বার
গুরুত্বের ধারণা ভুল হলে যে কোনো বস্তু অর্থহীন হয়ে যায়। যেমন মানুষের শরীরে অপরিহার্য, ভাইটাল কিছু অঙ্গ থাকে যেগুলো ছাড়া মানুষ বাঁচবে না। যেমন মাথা, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস। একটা হাত, চোখ বা পা ছাড়াও মানুষ বাঁচতে পারে কিন্তু কষ্টকর তার জীবন।
আবার চুল, ভ্রু শরীরেরই অংশ কিন্তু এগুলো না থাকলে সৌন্দর্যহানি ছাড়া তেমন কিছু ক্ষতি নেই। এখন যদি আপনি চুলকে হৃৎপিণ্ডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তাহলে মানুষ আপনাকে একটা আহাম্মক বললে আমি আপত্তি করব না। তেমনি জেহাদের চেয়ে সালাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে যে, তার বেলাতেও একই কথা।
আল্লাহ মোমেনের সংজ্ঞার মধ্যে কোন আমলটির কথা বলেছেন? জেহাদ। তিনি বলেন, মোমেন শুধু তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে (তওহীদ), অতঃপর তাতে সন্দেহ করে না এবং জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। (সুরা হুজরাত ১৫)।
ক্ষমা ও জান্নাতে যাওয়ার জন্য কোন আমলটির কথা আল্লাহ কোর’আনে উল্লেখ করেছেন? জেহাদ। তিনি বলেন, “আমি কি তোমাদের এমন বাণিজ্যের সন্ধান দেব যা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা হচ্ছে আল্লাহ ও রসুলের প্রতি ঈমান (তওহীদ) এবং জীবন ও সম্পদ কোরবান করে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ। (সুরা সফ ১০)।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে পলায়ন মনোবৃত্তি। কারণ এই কাজটি বিপদজনক এবং এতে সর্বোচ্চ কোরবানির প্রয়োজন হয়। গরু কোরবানি না, নিজেকে কোরবানি করতে হয়। এই ডরে জেহাদকে ডিঙিয়ে, এড়িয়ে ইসলাম পালনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে সুবিধাবাদী শ্রেণি। তাদের কাছে জেহাদের চেয়ে সালাত সওম তো বটেই দাড়ি টুপি পর্দা বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ।
যে সওম সম্পর্কে সর্বসাকুল্যে মোটে চারটি আয়াত, সেই সওম পালনকে নিয়ে সারাদিন কত হুলুস্থুল। পুরো মুসলিম দুনিয়ার চালচিত্রই পাল্টে যায়। সেহরির সময় মাইকে, গান গেয়ে ডাকাডাকি, রেডিওতে অনুষ্ঠান, টিভিতে টকশো, পোশাক আশাকে আরবীয় ভাবমূর্তি, ইফতারের ছড়াছড়ি, আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্য, তারাবি, কোর’আন খতম ইত্যাদি বহুকিছু।
কিন্তু সেই সওম পালনের কোনো বাস্তব প্রভাব সমাজে পড়ে না। অপরাধ সব মাসে যেমন এই মাসেও তেমন। অপচয় এই মাসে আরো বহু বেশি হয়, দ্রব্যমূল্য সীমাহীন বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সওমের, সংযমের উল্টোটা হয়।
আল্লাহ মানুষের বাইরের চেহারা সাজসজ্জা দেখেন না, দেখেন তার আমল আর অন্তর। অথচ আজকের ইসলাম পুরোটাই ভাবমূর্তিসর্বস্ব। আপনি কত বড় মুসলিম সেটার প্রমাণ আপনার দাড়ি, টুপি, আরবী লেবাস ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বিষয়ে একটি প্রত্যক্ষ নির্দেশও কোর’আনে নেই। এগুলোর গুরুত্ব থাকলে আল্লাহ কি একটিবারও বলতে পারতেন না?
তবু যেভাবেই হোক এগুলোকে আজ তওহীদের উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। সমাজে আল্লাহর হুকুম আছে কি নেই, সেই হুকুম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আছে কি নেই, সেটার চেয়ে বড় প্রশ্ন তোমার দাড়ি এক মুষ্টি নেই কেন, লম্বা জোব্বা নেই কেন? জয় হোক মূর্খতার, জয় হোক অন্ধত্বের, জয় হোক সকল যুক্তিহীন ফতোয়ার।
মডারেট মুসলিম ভাইয়েরা, আমি জানি ইসলামের জেহাদ নিয়ে আপনারা বড়ই শরমিন্দা। রসুলের জীবনে এত যুদ্ধ, এত রক্তপাত। আপনারা চান এগুলো না বলে মোলায়েম মানবিক বিষয়গুলো বলে ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলে প্রচার করতে। কিন্তু সে গুড়ে বালি।
জঙ্গি আর ইসলাম বিদ্বেষীরা কাছা দিয়ে নেমেছে ইসলামকে যুদ্ধময় বলে প্রমাণ করতে। আপনাকে জানতে ও জানাতে হবে যে, ইসলামের জেহাদ সবচেয়ে বড় মানবতার কাজ। দুষ্কৃতকারীর বিনাশহেতু যে যুদ্ধ তা চিরকালই ধর্মযুদ্ধ।
পুলিশের কাছে অস্ত্র থাকবে এটা যেমন স্বাভাবিক, মুসলিমের কাছে তলোয়ার থাকাও ছিল তেমন স্বাভাবিক। এই অস্ত্রের প্রয়োগ হবে শান্তি রক্ষার্থে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। পুলিশের সেই অস্ত্র যদি সন্ত্রাসী লুট করে নেয় তখন সেটার ব্যবহার কীরূপ হবে বলে মনে করেন? তখন ইসলাম হয়ে যাবে জঙ্গিবাদ আর মুসলিম হয়ে যাবে সন্ত্রাসী। এখন সেটাই হয়েছে। মুসলিমরা অস্ত্র ত্যাগ করে নিরীহ মুসুল্লি হয়েছে, ফলে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র ধরেছে।
জেহাদ নিয়ে যখন মিডিয়া, রাষ্ট্র এমনকি আলেম সমাজ যখন নীরব তখন জেহাদের সঠিক আকীদা মানুষ জানতে পারে না। জেহাদ যে আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড ও জেহাদ যে সম্পূর্ণ বিপরীত- এটা সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে যায়। কিন্তু বাঁচতে হলে জানতে হবে।
আপনি না বললেও সেগুলো কথিত জঙ্গিরা নিজেদের ব্যাখ্যা সহকারে ঠিকই প্রচার করে যাচ্ছেন। কিশোর, তরুণ, যুবক তাদের মতবাদে দীক্ষিত হচ্ছে। মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে জেহাদের আয়াত ও হাদিস দেখিয়ে তাদেরকে বোঝাচ্ছে যে, দেখ, দেখ জেহাদের কত গুরুত্ব, কত মাহাত্ম্য অথচ এটা কেউ তোমাকে শেখায় নি।
কোর’আন দেখে মুসলিম উদ্বুদ্ধ হবে না তো কী দেখে হবে? এজন্য সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের জেহাদ সংক্রান্ত আকিদা পরিষ্কার করা প্রয়োজন যেন তারা ইসলামের দলিল ও যুক্তি দেখে নিশ্চিত হয় যে, গাড়িতে পেট্রল বোমা ছুঁড়ে নিরীহ মানুষ হত্যা, নিরস্ত্র মানুষকে গুপ্তহত্যা, পুরোহিত হত্যা ইসলাম সম্মত নয়।
ইসলামে জেহাদের সঠিক রূপটি কী, কে জেহাদ করবে, কার বিরুদ্ধে করবে এসব তথ্য বেশি বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। আজকে পুলিশ নিজে মানুষের হাতে লাঠি তুলে দিচ্ছে কেন? হ্যাঁ, এটাই হচ্ছে জেহাদের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই কোর’আনে এতবার জেহাদের উল্লেখ হয়েছে। লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ ও নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশেরপত্র.কম।