“তারুণ্যের শক্তিকে স্বার্থের রাজনীতিতে ধ্বংস হতে দেয়া যাবে না”

স্বার্থের রাজনীতির বৃত্ত ভেঙে নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের দৃপ্ত শপথে প্রকম্পিত হলো রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তন। শনিবার (২৩ আগস্ট) হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত ‘তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ছাত্রদের ভূমিকা’ শীর্ষক কেন্দ্রীয় ছাত্র সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা হাজারো শিক্ষার্থীর সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এই পরিবর্তনের অঙ্গীকার।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। দুপুরে তার আগমনে মিলনায়তনে যেন প্রাণচাঞ্চল্যের ঢেউ বয়ে যায়। স্লোগান ও করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। ফুলেল শুভেচ্ছায় তাকে বরণ করে নেওয়ার পর শুরু হয় সম্মেলনের মূল পর্ব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেযবুত তওহীদের ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “মানবসভ্যতার প্রতিটি বিপ্লব তারুণ্যের রক্তে সফল হলেও সঠিক আদর্শের অভাবে তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। আমরা তরুণদের সেই শক্তিকে আর স্বার্থান্বেষী রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হতে দেব না। তাদের আত্মত্যাগ আর বৃথা যেতে দেয়া হবে না।”

বাংলাদেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে তারুণ্যের আত্মত্যাগের গাঁথা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত-মুহূর্তে ছাত্রসমাজ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। স্বৈরাচারের ট্যাঙ্ক, বুলেট আর মেশিনগান তাদের অদম্য শক্তির কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এত আত্মত্যাগ, এত মায়ের বুক খালি হওয়ার পরেও যে শান্তির স্বপ্ন নিয়ে তারা রাজপথে নেমেছিল, তা অধরাই রয়ে গেছে।”

ইতিহাসের বিভিন্ন বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে তিনি বলেন, “বিপ্লব কেবল একটি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের নাম নয়, এটি একটি নতুন সমাজ বিনির্মাণের অঙ্গীকার। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লব, কোনোটিই মানুষকে কাঙ্ক্ষিত শান্তি দিতে পারে নি, কারণ বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ছিল না। ফলে এক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে আরেক স্বৈরাচারের উত্থান হয়েছে।”

এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার বিপরীতে তিনি প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এক সফল মহাবিপ্লবের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে সংঘটিত সেই বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ -অর্থাৎ এক আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধান জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া। সেই আদর্শের জন্যও তরুণরা জীবন দিয়েছিলেন, আর তাদের সেই আত্মত্যাগ একটি সোনালী সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিল।”

হেযবুত তওহীদের ইমাম বলেন, “আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেলিয়াতের সমাজ রূপান্তরিত হয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজে। সেখানে ন্যায় ও নিরাপত্তার এমন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, যা এখন রূপকথার মতো শোনায়। মানুষ রাতে দরজা খোলা রেখে ঘুমাত, যুবতী নারীরা অলংকার পরে গভীর রাতে একা পথ চলতে পারত, ধনীরা যাকাত দেওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াতো অথচ দরিদ্র মানুষ খুঁজে পেত না। চরম ইসলামবিদ্বেষী ইতিহাসবিদরাও এই সত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।”

দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিকে ইসলামপূর্ব আরবের জাহেলি যুগের সঙ্গেই তুলনা করে তিনি বলেন, “আজ বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শতধা বিভক্ত। মানুষ হতাশ। ভয়ানক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে প্রতিটি দিন পার হচ্ছে। এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সেই দেড় হাজার বছরের পরীক্ষিত আদর্শ- তওহীদভিত্তিক জীবনব্যবস্থা।”

তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা আর তরুণদের বৃথা রক্তবিসর্জন দেখতে চাই না। আমরা তাদের সামনে সেই মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছি, যা ইহকাল ও পরকালে সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়। এই তারুণ্যের ইস্পাতদৃঢ় শক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমরা একটি শান্তিময় ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করব, ইনশাল্লাহ।”

হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের সভাপতি রাদ উল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেযবুত তওহীদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুফায়দাহ্ পন্নী, ঢাকা বিভাগের সভাপতি ও ছাত্র ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ, কেন্দ্রীয় নারী বিষয়ক যুগ্ম সম্পাদক ও ছাত্র ফোরামের উপদেষ্টা আয়েশা সিদ্দিকা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক সাইফুর রহমান, সাহিত্য সম্পাদক রিয়াদুল হাসান, কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক সুলতানা রাজিয়া, নোয়াখালীর চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল হাসান, হেযবুত তওহীদ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি তসলিম উদ্দিন প্রমুখ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রুফায়দাহ্ পন্নী বলেন, “যখনই কোনো জাতি আল্লাহর তওহীদভিত্তিক আদর্শকে ধারণ করেছে, তখনই তারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে এবং সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সাথে সাথেই তাদের পতন ঘটেছে। বর্তমান এই সংকটময় মুহূর্তে হেযবুত তওহীদ মানবজাতির সামনে ইসলামের সঠিক রূপরেখা পুনরায় তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, “আজকে দুর্দশাগ্রস্ত মুসলিম জাতির সামনে আশার আলো হেযবুত তওহীদ, আর হেযবুত তওহীদের সামনে আশার আলো এই তরুণ সমাজ।”

হেযবুত তওহীদের কেন্দ্রীয় নারী নেত্রী ও ছাত্র ফোরামের উপদেষ্টা আয়েশা সিদ্দিকা তার বক্তব্যে বলেন, তারুণ্যের শক্তিকে স্বার্থান্বেষী মহল বারবার নিজেদের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তরুণদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে শাসক বদল হলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য অধরা থেকে যায় এবং তারা বারবার প্রতারিত হয়। এখন সময় এসেছে বিভেদ ও বিভক্তির মানবসৃষ্ট ব্যবস্থা ছুঁড়ে ফেলে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার।

সভাপতির বক্তব্যে হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের সভাপতি রাদ উল ইসলাম এই সম্মেলনকে একটি ‘ঐতিহাসিক দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মাত্র তিন মাসের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া পাওয়া গেছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আদর্শের সংকট বিরাজ করায় শিক্ষার্থীরা একটি সঠিক পথের দিশা খুঁজছে এবং হেযবুত তওহীদের আদর্শকে তারা সাদরে গ্রহণ করেছে। কিছু ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর বাধা সত্ত্বেও সাধারণ ছাত্রসমাজ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ফোরামের খুলনা বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর জান্নাতুল নাইম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম, সিলেট বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর ইমরান হাসান মারজান, বরিশালের প্রতিনিধি সুমাইয়া আক্তার মিথিলা, রংপুর বিভাগের আবইয়াজ রহমান সাগর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর ইকরামা বিন খুরশীদ, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর হাবিবুর রহমান রাজা, ঢাকা বিভাগের সহ-সভাপতি জাকারিয়া মাহাথির, ইডেন মহিলা কলেজের সভাপতি সাবিকুন নাহার ইভা, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ শাখার সভাপতি মেকদাদ প্রমুখ।

এর আগে সকাল ১০টায় হাফেজ মোহাম্মদ রিফাত হাসানের কণ্ঠে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। পুরো আয়োজনটি জনস্বাস্থ্য শিক্ষার্থী তুহিন মাহমুদ এবং স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থী নওশীন আমিনের সাবলীল ও বুদ্ধিদীপ্ত সঞ্চালনায় ভিন্ন মাত্রা পায়।

সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ থেকে আগত ছাত্র ফোরামের সভাপতি, বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ছাত্রদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে এক মিলনমেলায় পরিণত করে। শিক্ষার্থীরা তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে নিজেদের শক্তি, মেধা, জীবন, সম্পদ উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেন। পরে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।

Comments (0)
Add Comment