আমাদের দেশের মানুষ ব্যক্তিগত ও দলীয় চিন্তা-ভাবনার বাইরে একটুও এগোতে পারছে না। যদি পারতো এদের দিয়ে অনেক বড় বড় কাজ করানো যেত। এরা সারা পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার মতো কাজ করতে পারতো। পারছে না কারণ তাদের সামর্থ্যকে তারা কাজে লাগায় না। ভাবনা-চিন্তা করে না। যদিওবা একটু করে তাও সংকীর্ণতায় ভরা। এরা দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে পারে না। বড় কোনো লক্ষ্য নির্দিষ্ট করতে পারে না। সামর্থ্যগুলো যেন অপাত্রে পড়েছে। কোটি কোটি মানুষ আয়-রোজগার করছে, খাচ্ছে, বংশবিস্তার করছে, মরে যাচ্ছে। সমাজ কীভাবে চলছে, রাষ্ট্র কীভাবে চলছে, বিশ্ব কীভাবে চলছে- তা যেন চিন্তার বিষয়ই নয়। সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সভ্যতা, রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা এদের দৃষ্টিতে সীমাহীন বিলাসিতা।
এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের চিন্তার দৌড় বড়জোর নির্বাচন পর্যন্ত। তারা পাঁচটি বছর ধরে সকল নির্যাতন, নিপীড়ন, অন্যায় সহ্য করবে আর ভোট এলে নির্যাতনকারী দলের প্রতিপক্ষকে ভোট দিয়ে সেই নির্যাতনের ঝাল মিটাবে- এই তাদের রাজনৈতিক জীবন। তাদের রাজনীতিজ্ঞান সীমাবদ্ধ সরকারি দল ও বিরোধী দলের হানাহানিভিত্তিক প্রতিযোগিতার সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে। এর বাইরে ‘বিশ্ব’ বলে যে একটি জিনিস আছে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, তেল-গ্যাসভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, যুদ্ধ অর্থনীতি, আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, অস্ত্রব্যবসাসহ যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানবজাতির চরম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা তাদের ধারণ ক্ষমতার বাইরে। বসনিয়া যুদ্ধের সময় বসনিয়ার মুসলমানদের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করা হতো বিভিন্ন দেশে দেশে। আমাদের দেশেও হতো। একদিন এক ব্যক্তি নাকি সাহায্য সংগ্রহকারী ব্যক্তিদের কাছে এসে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল- ‘বসনিয়ার আসলে কী হইছে ভাই? সে কোন হাসপাতালে ভর্তি হইছে? তার শরীরের অবস্থা কী এখন?’ ঘটনাটি লোকমুখে শোনা। সত্য নাও হতে পারে তবে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্ন আসাটা মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। কোটি কোটি মানুষকে এমন সীমাহীন সংকীর্ণতায় ডুবিয়ে রেখে আমাদের নীতিনির্ধারকরা কীভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখেন বুঝে আসে না।
এদিকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সমাজ ও দেশ নিয়ে ভাববে কি, তারা থাকে লুটেপুটে খাওয়ার ধান্দায়। রাজনীতিক দলগুলো পরিণত হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। আগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করতো, এখন রাজনীতিকরা ব্যবসা করে। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলছি না। ব্যতিক্রম আছে, তবে খুবই কম। সিস্টেমটাই দাঁড়িয়ে আছে বাণিজ্যের উপর নির্ভর করে, সুতরাং এই রাজনৈতিক সিস্টেমে টিকে থাকতে হলে বাণিজ্য করেই টিকে থাকতে হবে। জনসেবাও সেখানে বাণিজ্যেরই অনুষঙ্গ। তার সাথে আবার যোগ হয়েছে রাজনীতির নামে নগ্ন দলবাজী, অসহিষ্ণুতা, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ, হত্যা, গুম, গালাগালি ইত্যাদির নির্লজ্জ অপসংস্কৃতি। সব মিলিয়ে রাজনীতিকরাও একটি নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন ও এতই সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন যাদের দিয়ে প্রকৃতপক্ষে সমাজের কোনো কল্যাণ করা সম্ভব নয়। বিশ্ব নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে, সময়ের চাহিদা অনুধাবন করে, সকল প্রকার সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, নিজেদের মধ্যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক কোন্দল-হানাহানি বন্ধ করে, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের জন্য কল্যাণকর সুষ্ঠু নীতি নির্ধারণ করা ও সমগ্র জাতিকে সঙ্গে নিয়ে তার বাস্তবায়ন করার জন্য যে আদর্শিক দৃঢ়তা দরকার সেটা তাদের একেবারেই নেই।
বাকি রইল যে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী অর্থাৎ তথাকথিত প্রগতিশীল গোষ্ঠী, দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের অবস্থা আরও করুণ। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধির অভাব নাই, অভাব সত্যনিষ্ঠতার, অভাব ত্যাগস্পৃহার, অভাব নিঃস্বার্থপরায়ণতার। সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে- ভোগবাদী ও হানাহানিভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে রাজনীতিকে বের করার চেষ্টা না করে এরা উল্টো ওই অপসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য জানপ্রাণ উজার করে দেয়। এরা সামান্য স্বার্থের বশবর্তী হয়ে নিরপেক্ষতা হারায়। নিজেদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বের ছাপ রেখে যায় সর্বাঙ্গনে। যে জ্ঞান আমাদের বুদ্ধিজীবীদেরকে সমাজে পূজনীয় করে রাখতে পারতো, সে জ্ঞানের অপব্যবহারের কারণে তাদের নামের পাশে আজ শোভা পায় ‘দলদাস, দলান্ধ, দলকানা, তল্পিবাহক’ ইত্যাদি অসম্মানজনক শব্দ। সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে, বিশ্ব নিয়ে ভাবার মতো লোক এ দেশে এরাই ছিল, এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের অনেক বড় বড় আমূল পরিবর্তন ঘটতে পারতো, মানুষকে জাগিয়ে তোলা যেত, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- এরা জাতির কোনো উপকারে লাগে নি। ভারবাহী গাধার মতো তারা তাদের জ্ঞানকে বোঝা বানিয়ে বয়ে চলেছে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে।
সংকীর্ণতার এই কালো থাবায় আক্রান্ত হয়েছে আমাদের ইতিহাসও। বাঙালির ইতিহাস প্রেরণাদায়ক, সংগ্রামের চেতনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে ইতিহাস থেকে জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। এ দেশের প্রগতিশীল নামধারী গোষ্ঠীটির অন্ধত্বের কারণে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম যে ইতিহাস শিখছে তা হাস্যকরভাবে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীতে সম্ভবত আমরাই একমাত্র স্বাধীন জাতি যাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। ইতিহাস নিয়ে অপরাজনীতির স্বাভাবিক পরিণতি হলো ইতিহাসের ব্যাপ্তি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া। আজকে কয়জন মানুষ বাংলার সুলতানি আমল, নবাবী আমল, ব্রিটিশ আমলের প্রকৃত ইতিহাস জানেন তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়। অথচ এই সবক’টি অধ্যায়ে বাঙালি নিজেদের গৌরবদীপ্ত পরিচয় প্রদান করে এসেছে। আমাদেরকে যে ইতিহাস শেখানো হয় তাতে মনে হয়- বাঙালির জন্ম মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তার আগে এ জাতির কোনো ইতিহাস নেই, কোনো কৃতীত্ব নেই, অস্তিত্ব নেই। মুক্তিযুদ্ধকে তার প্রাপ্য মূল্য অবশ্যই দিতে হবে, সে ইতিহাসকে সর্বদা আলোকোজ্জ্বল করে রাখতে হবে, তবে অন্য ইতিহাসগুলোকে নি¯প্রভ করে নয়। আমাদের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মীরা এখানেও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
এভাবে একটি জাতির জনসাধারণ থেকে শুরু করে সে দেশের নীতি নির্ধারক মহল পর্যন্ত গোটা জাতিই যখন অন্ধত্ব, সংকীর্ণতা ও স্বার্থপূজারীতে পরিণত হয় তখন সে জাতির অধঃপতন ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। সমস্যা হলো- একটি জাতি যখন এতটা সংকীর্ণতায় পর্যবসিত হয়ে পড়ে, তখন তারা অধঃপতন বোঝার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। আমাদের অবস্থা এর চেয়ে ভালো নয়। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।