মিতু হত্যাকান্ড: মেলেনি অনেক প্রশ্নের উত্তর

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল সাতজন। এর মধ্যে কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয় তিনজন। এই তিনজনের মধ্যে ওয়াসিম অস্ত্র ঠেকিয়ে মিতুর মাথা ও বুকে গুলি করে। তার গুলিতেই মৃত্যু নিশ্চিত হয় পুলিশকর্তার স্ত্রীর। গতকাল রোববার চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমনটাই জানিয়েছে ওয়াসিম।
আদালতে ওয়াসিম এবং তার আরেক সহযোগীর স্বীকারোক্তির বিষয়ে পুলিশের ব্রিফিং আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হত্যা মামলায় গভীর রাতে বাবুলকে বাসা থেকে উঠিয়ে ১৫ ঘণ্টা ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে এমন ইঙ্গিত কিছু গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার ফলে গুঞ্জনই কেবল বাড়ছে।
নানা রকম প্রশ্ন উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কিন্তু প্রশ্নের নিরসন তো দূরের কথা, পুলিশ আর কর্তাব্যক্তিদের নানা বক্তব্য বরং নতুন প্রশ্ন উস্‌কে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ দাবী করছে যে ওয়াসিম একজন পেশাদার অপরাধী। ওয়াসিমের সহযোগী হিসেবে মোঃ আনোয়ার নামের একজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দু’জনেই আদালতে জবানবন্দী দিয়ে অপরাধ স্বীকার করেছে।
মাহমুদা বেগম মিতুর হত্যার পুলিশের প্রথম ধারণা ছিল ‘জঙ্গী দমনে সফল’ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের প্রতি প্রতিশোধ নিতে জঙ্গীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া দু’জন জঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্কিত- এমন কোন দাবী করছে না পুলিশ।
তাহলে এই দু’জন কথিত পেশাদার ভাড়াটে খুনী মাহমুদা বেগম মিতুকে কেন খুন করবে? কার বা কাদের হয়ে এই দু’জন ভাড়া খেটেছেন? আর সরাসরি গুলি না করে কেন ঐ নারীকে কোপানো হলো? তা কি এই ঘটনা জঙ্গীদের সাথে সম্পর্কিত দেখানোর জন্যেই?
সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে বাবুল আক্তার পুলিশ সুপার হয়েছেন। এটি পুলিশের কমান্ড কাঠামোতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর। এই স্তরের একজন কর্মকর্তার স্ত্রীকে হত্যার ঘটনা কোন কারণ ছাড়া ঘটতে পারে না বলেই বিশ্বাস করেন পুলিশেরই অনেক কর্মকর্তা। তাহলে কার নির্দেশে ঘটেছে এই হত্যাকাণ্ড?
গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, কার নির্দেশে খুন, জেনেও তা বলছে না পুলিশ। পুলিশ যদি কিছু জেনেও থাকে, তাহলে তারা কেন কিছু বলছে না? বাবুল আক্তারকে গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে তার শ্বশুরের বাসা থেকে নিয়ে গিয়ে ১৫ ঘণ্টা ধরে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করা হয়েছিল।
রাত পেরিয়ে দিনভর সংবাদমাধ্যমে খবর আসায় গুঞ্জন ডালপালা মেলতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিশেষ করে দুপুর পর্যন্ত পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি না হওয়ায় বেশি সমালোচনা ও উদ্বেগ দেখা দেয়। তাকে কেন নেয়া হয়েছে, কোথায় নেয়া হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নীরব ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে মুখ খুলতে হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে, যিনি প্রশ্নের সামনে পড়ে সাংবাদিকদের জানান যে সন্দেহভাজনদের মুখোমুখি করতে তাকে গোয়েন্দা দপ্তরে নেয়া হয়েছে।
বাবুলকে নিয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পরিবারের এই উদ্বেগের মধ্যে কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম এই কর্মকর্তা ও তার পরিবারকে জড়িয়ে ‘বিভ্রান্তিকর’ খবর প্রকাশ করে। কিছু সংবাদমাধ্যম স্ত্রী হত্যার সঙ্গে স্বয়ং বাবুল আক্তারকে জড়িয়ে খবর প্রকাশ করে, গুঞ্জন তোলে নির্মমভাবে নিহত স্ত্রী সম্পর্কেও।
পুলিশের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা মনে করেন, তদন্তকারীদের এখন খুঁজে বের করতে হবে ঘটনার পেছনে কে রয়েছে, কারণ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কারা এদের ভাড়া করেছিল।
আর যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জবানবন্দীতে তারা কাদের নাম বলেছে, আর যাদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি, গ্রেপ্তার হলে তারা কাদের নাম বলবে- ঐ কর্মকর্তা মনে করছেন এ সবই হবে এই হত্যা রহস্য উন্মোচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বাবুল আক্তারের স্ত্রীর হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, হত্যাকারীদের ছাড়া হবে না। তবে এটা হয়তো এখন অনেকটাই নির্ভর করছে অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব পাওয়ার ওপর। বিবিসি বাংলা

Comments (0)
Add Comment