রাষ্ট্রকে ন্যায়ের দন্ড ধারণ করতে হবে – জঙ্গিবাদ বিরোধী জনসভায় হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

নিজস্ব প্রতিনিধি: রাজধানীর পান্থপথে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নানামুখী ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই’ শীর্ষক জনসভায় প্রধান আলোচক হিসেবে ভাষণ দান করেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তাঁর ভাষণের কিছু চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো।
আজকে দেশ যখন জঙ্গিবাদের করাল থাবায় আক্রান্ত, আজকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ধ্বংসাবশেষ যখন আমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত সাক্ষী হয়ে আছে, তখন এই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রতিটি মোমেনের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, তোমরা ঐক্যবদ্ধ হও, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না। আজকে যদি আমরা এই বিভীষিকার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারি, তবে সেই বিভীষিকা যেদিন আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকেও সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে তখন আমাদের কোনো ধর্ম থাকবে না। সুতরাং বলতে চাই, আসন্ন যে সংকটের কথা আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারছি, সেই সংকটকে প্রতিরোধ করতে যাবতীয় ফেরকা, মাজহাব, দলাদলি বিসর্জন দিয়ে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্য গড়ে তুলি। আসুন সমাজে বিরাজমান যাবতীয় অন্যায় আর অশান্তিকে দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে জীবন ও সম্পদকে উৎসর্গ করি। তবেই আমাদের দেশ রক্ষা পাবে, আমাদের ধর্ম রক্ষা পাবে, আমাদের ঈমান রক্ষা পাবে।
ওদের ইসলাম আল্লাহ-রসুলের ইসলাম নয়
জঙ্গিদের ইসলাম আর আল্লাহ-রসুলের ইসলাম যে এক নয় তা বোঝার জন্য রসুলের জীবনী থেকে দুইটি ঘটনাই যথেষ্ট। একদিন আল্লাহর রসুল (সা.) ক্বাবা ঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের নির্যাতন-অত্যাচার, যুলুম তখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। এক সাহাবী এসে অত্যন্ত কাতরকণ্ঠে রসুলকে বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ, আপনি দোয়া করুন যাতে এই মোশরেকরা ধ্বংস হয়ে যায়। হাদীসে এসেছে ওই সাহাবীর এই ধ্বংসকামনা শুনে তিনি হেলান অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসলেন। রিপুজয়ী মহামানব, মানবজাতির মুকুটমনি তাঁর জীবনে খুব কম সময়ই রাগান্বিত হয়েছেন। যে অল্প কয়েকটি ঘটনায় তাঁকে রাগতে দেখা গেছে তার মধ্যে এই ঘটনা একটি। সাহাবীর কথা শুনে রসুল (সা.) অনেক রেগে গিয়েছেলেন এবং বলেছিলেন- শিগগিরই এমন সময় আসছে যখন একটি মেয়ে লোক একা সানা থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবে, তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য পশু ছাড়া আর কিছুরই ভয় থাকবে না।
বিশ্বনবীর (সা.) এই কথাটির ভেতরে প্রবেশ করুন। ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায় একটি কথাতেই। তিনি কি বললেন? তিনি মূলত ইঙ্গিত দিলেন- এত বাধা, এত অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি সফল হবেন এবং যাদের ধ্বংস করার জন্য ঐ সাহাবা দোয়া করতে বলছেন তারাই এমন বদলে যাবে এবং তাদের দিয়েই এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে একা একটা মেয়ে মানুষ কয়েক শ’মাইল পথ নির্ভয়ে চলে যেতে পারবে। এতে দুইটি বিষয় পরিষ্কার হয়। এক- ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, দুই- আল্লাহর রসুল এত অত্যাচারের মুহূর্তেও চান নি অত্যাচারী মোশরেকরা ধ্বংস বা বিনাশ হয়ে যাক। এর দ্বারা তিনি তাঁর উম্মতের জন্য শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন যে, মানুষের বিনাশ নয়, মানুষের কল্যাণ সাধন করাই মুক্তির পথ, জান্নাতের পথ।
আরেকটি ঘটনা তায়েফের। মক্কায় বছরের পর বছর সত্যের আহ্বান করেও যখন অধিকাংশ লোকের পক্ষ থেকে নির্যাতন, নিপীড়ন আর অপমান ছাড়া কিছুই পেলেন না, তখন আল্লাহ রসুল (সা.) তায়েফের ব্যাপারে কিছুটা আশাবাদী হলেন। সেখানকার গোত্রপতিদের সাথে রসুলাল্লাহর নিজ গোত্রের সুসম্পর্ক ছিল। তাই আশা করেছিলেন দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেও অন্তত অসৌজন্যমূলক আচরণ কেউ করবে না। কিন্তু বাস্তবে সেখানে তাঁকে আরও নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। তায়েফের নেতৃস্থানীয়রা অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হয় নি, তারা এলাকার বখাটে, গুন্ডা ও শিশু-কিশোরদের লেলিয়ে দেয় রসুলকে শারীরিক নির্যাতন করতে। তারা পাথর নিক্ষেপ করতে করতে রসুলের সারা শরীর রক্তাক্ত করে ফেলে। হাদীসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, সেদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে মালায়েক এসে রসুলকে বলেছিল- ‘হে মুহাম্মদ (সা.), আপনি আদেশ করুন আমি তাদের উপর মক্কার দু’দিকের পাহাড় একত্র করে চাপিয়ে দেই।’ কিন্তু সেই রিপুজয়ী মহামানব বললেন- ‘না না, আমি আশা করি তাদের ভবিষ্যৎ বংশধর সত্য গ্রহণ করবে।’ রসুলাল্লাহ সেদিন তায়েফবাসীর মুর্খতার জন্য নিজে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন- হে আল্লাহ, তারা অজ্ঞতাবশত এই কাজ করেছে, তাদেরকে পাকড়াও কর না। এই অতুলনীয় ক্ষমা ও উদারতার মাধ্যমে সেদিন পৃথিবীর ইতিহাসের বিস্ময়কর ওই মহামানব দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, ইসলাম ‘ধ্বংস’ নয়, শান্তির বার্তাবাহক।
আজকে ইসলামের নাম করে যারা সমস্ত পৃথিবীতে বিনাশের প্রলয়নাচন শুরু করেছে তাদের ইসলাম আর আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলামের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে। আল্লাহ-রসুলের ইসলামে জান্নাত তাদের জন্য যারা মানুষকে শান্তি দিতে সংগ্রাম করবে, আর এরা সেই মানুষকেই বিনাশ করে নিজেরা জান্নাতে যেতে চায়। আল্লাহ রসুলের ইসলাম চায় ঐক্য, এরা চায় বিভক্তি-হানাহানি। আল্লাহ-রসুলের ইসলাম চায় মানবজীবনে সার্বিক নিরাপত্তা, এরা চায় আতঙ্ক-ভয়-ত্রাস। আল্লাহ-রসুলের ইসলাম চায় সম্প্রীতি, এরা চায় আক্রোশ-বিদ্বেষ আর রক্তপাত। সুতরাং যারা এদের বেপরোয়া কর্মকা- দেখে ভাবছেন ইসলাম এরকম সন্ত্রাসীপনা শিক্ষা দেয়, নিরীহ মানুষ হত্যা সমর্থন করে এবং এটা বিশ্বাস করে ইসলামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হচ্ছেন, ইসলামকে দোষারোপ করছেন, তাদেরকে বলব- আপনারা ভুল বুঝবেন না, ওটা ইসলাম নয়। আসলে যারা ইসলামকে ব্যবহার করে স্বার্থোদ্ধার করে ও বিধ্বংস ডেকে আনে, তারা কেবল মানবতার শত্রুই নয়, তারা ইসলামেরও শত্রু।
আল্লাহ-রসুলের ইসলামে তখনকার ইহুদি-খ্রিষ্টান-পৌত্তলিক সবাই ছিল এক জাতি। আর আপনারা কার কাছে ইসলাম শিখেছেন? মন্দির-গীর্জায় মানুষ খুন করছেন, নামাজরত মানুষকে পাহারা দানকারী পুলিশকে হত্যা করছেন, এটা কার ইসলাম? কে শিখিয়েছে এমন ইসলাম? আপনারা মানবতার শত্রু, আল্লাহর শত্রু।
আল্লাহ হক্ব, সত্য। তাঁর রসুল ছিলেন হক্ব। তিনি যে কেতাব নিয়ে এসেছেন সেটাও হক্ব, সত্য। সেটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি যে জাতি গঠন করলেন উম্মতে মোহাম্মদী সেই জাতিও সত্য। সত্য শান্তি আনে, আর মিথ্যা আনে অশান্তি। এ কারণেই আল্লাহ-রসুলের ইসলাম এমন শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, একা একজন যুবতী নারী রাতের অন্ধকারে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিলেও তার মনে কোনো ভয় জাগ্রত হত না। অপরাধ নেমে এসেছিল শূন্যের কোঠায়। আদালতে মাসের পর মাস অপরাধ সংক্রান্ত কোনো মামলা আসত না। এমন স্বচ্ছলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, মানুষ উটের পিঠে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে পথে পথে ঘুরত গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যেত না। যারা বংশানুক্রমে হানাহানি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে আসছিল সেই মানুষগুলোই সত্য ইসলামের প্রভাবে এমন ন্যায়নিষ্ঠ মানুষে পরিণত হলেন যে, আজও তাদের নাম উচ্চারণ করলে আমরা বলি- রাদি’আল্লাহু আনহুম ওয়া রাদু আনহু। কিন্তু আজকের ইসলাম তেমন শান্তি দেওয়া তো দূরের কথা, ইসলামকে ব্যবহার করে পৃথিবীব্যাপী অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। বৃক্ষের পরিচয় ফলের মধ্যে। আজকের ইসলাম যদি হক্ব হত, আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম হত তাহলে অশান্তি সৃষ্টি হত না, সন্ত্রাস সৃষ্টি হত না। আসলে আমরা প্রকৃত মো’মেন নই, প্রকৃত মুসলিম নই, প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী নই। এই কথাটি বলার জন্যই হেযবুত তওহীদের আবির্ভাব হয়েছে। এই কথাটি আমরা প্রত্যেকের বিবেকে জাগ্রত করতে চাই। তা না হলে যে ভয়াবহ বিপদ ধেয়ে আসছে তার মোকাবেলা করা যাবে না। সত্য-মিথ্যার স্পষ্ট পার্থক্য না করলে সমস্যার সমাধান হবে না।
এই কথাটি বলার কারণেই আমার বাড়িতে হামলা করা হয়েছে, আমার দুইজন ভাইকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে, আমার সদস্যদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, রক্তাক্ত করা হয়েছে আমাদের নিরপরাধ সদস্যদেরকে। আজ সত্য প্রকাশিত হচ্ছে। যে সমস্ত জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা আমার বাড়িতে হামলা করেছিলে তাদেরকে বলতে চাই- তোমরা চেয়েছিলে আমাকে পুড়িয়ে মারতে, তবে জেনে রেখো- আমি বেঁচে আছি তোমার বংশধরকে রক্ষা করতে, তাদের জীবন বাঁচাতে। আমরা প্রমাণ করে দিব- বিনাশ করা ইসলামের শিক্ষা নয়, মানুষকে শান্তি দেওয়াই ইসলামের উদ্দেশ্য।
সরকারের প্রতি বক্তব্য আজকে সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছেন মানুষকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য। আমরা অত্যন্ত আশান্বিত। কেননা আমরাই সবার আগে বলেছি, জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করতে জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই। শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার উপর নির্ভর করে আপনারা এই সংকট মোকাবেলা করতে পারবেন না। এটা আশার বিষয় যে, সরকার এ ব্যাপারে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশব্যাপী মানববন্ধন হচ্ছে, প্রতিবাদ সভা হচ্ছে, মিটিং-মিছিল-সভা-সেমিনার হচ্ছে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বারবার জঙ্গিবাদের বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এক, এই সমস্যার গোড়া খুঁজে বের করা হবে। দুই, মানুষকে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দিতে হবে। তিন, সমগ্র জাতিকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই তিন বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করে আমি আজকে হেযবুত তওহীদের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাবনা পেশ করব। সবাই বিবেচনা করবেন।
হেযবুত তওহীদের প্রস্তাবনা:
১. এই সঙ্কট ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে আত্মা দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। তাদেরকে বুঝতে হবে ধর্ম কী। ধর্ম হচ্ছে বস্তুর বৈশিষ্ট্য বা গুণাগুণ। আগুনের ধর্ম যেমন পোড়ানো, পানির ধর্ম যেমন তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা দূর করা, নদীর ধর্ম যেমন বয়ে চলা তেমনি মানুষের ধর্ম হচ্ছে মানবতা। সকল ধর্মের মর্মকথা হচ্ছে, সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানবতা। আর এই মানবতাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রাম করাই হচ্ছে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় ইবাদত। সূর্যকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাপ ও আলো বিকিরণ করার জন্য। সে অনবরত তা করে যাচ্ছে। এভাবে যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা করাই তার ইবাদত। তেমনি মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য। এই কাজ করতে গিয়ে নিজের জীবন ও সম্পদকে উৎসর্গ করাই তার সবচেয়ে বড় ইবাদত। পাশের গৃহে আগুন লেগেছে, সাহায্য করার জন্য চিৎকার ভেসে আসছে। আর আপনি সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে তাহাজ্জুদ পড়ছেন। যদি মনে করেন বিরাট ইবাদত করছেন তবে ভুল হবে। আল্লাহর কাছে সেটা ইবাদত রূপে গৃহীত হবে না। আজ যখন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, আজ যখন অন্যায় আর পাপাচারে সমাজ পূর্ণ হয়ে গেছে, মানবতা যখন ভূলুণ্ঠিত, তখন সেই অন্যায়, অবিচার, অশান্তিকে দূর করে পৃথিবীতে ন্যায়, শান্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই প্রতিটি মো’মেনের প্রকৃত ইবাদত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীকে অশান্তির আগুনে পুড়তে দেখেও, বিশ্ব মানবতাকে দুরাচারীদের পদতলে পিষ্ট হতে দেখেও, ক্ষুধার্ত, নিপীড়িত মানুষের ক্রন্দন শুনতে পেয়েও, নির্যাতিতা নারীর আর্ত-চিৎকার শুনতে পেয়েও যার হৃদয় বিচলিত হয় না, সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার স্পৃহা জাগ্রত হয় না, সে হৃদয় মানবতা হারিয়েছে, সে তার ধর্ম হারিয়েছে। হতে পারে সে বিরাট নামাজি, হতে পারে বিরাট পরহেজগার। কিন্তু আল্লাহর কাছে তিনি ধার্মিক বলে গৃহীত হবেন না। এই বোধটি সবার মধ্যে জাগ্রত করতে হবে।
২. আল্লাহ কোর’আনে শত শত আয়াতে জিহাদের কথা বলেছেন। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াত মোতাবেক বলা যায় জিহাদ ছাড়া কেউ মো’মেন হতে পারবে না। আল্লাহর রসুল জিহাদ করেছেন। তাঁর হাতে গড়া উম্মতে মোহাম্মদী জাতি জিহাদ করেছে। সুতরাং জিহাদকে ইসলাম থেকে ‘নাই’ করে দিতে পারবেন না। জিহাদের ব্যাপারে গোপনীয়তা বজায় রাখারও অবকাশ নেই। যা করতে হবে তা হচ্ছে জিহাদের সঠিক ব্যাখ্যাটা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। জিহাদ কী? জিহাদ হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। জিহাদ কখনও অশান্তি ডেকে আনতে পারে না। কোনটা জিহাদ, কোনটা কিতাল আর কোনটা সন্ত্রাস সে ব্যাপারে সামগ্রিক কনসেপ্ট দিতে হবে জাতিকে। কিতাল কি, কেন, কার জন্য, কখন, কীভাবে- এসব প্রশ্নের প্রামাণ্য যুক্তি হাজির করতে হবে এবং ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।
৩. কোনটা ইসলাম কোনটা ইসলাম নয়, কোনটা গোনাহ কোনটা সওয়াব, কোনটা বৈধ কোনটা অবৈধ এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। জেনে রাখবেন- যে কথায় যে কাজে মানবতার উপকার হয় সেটাই সওয়াবের কাজ, ইসলামের কাজ, আর যে কথায় ও কাজে মানবতার ক্ষতি হয় তা গোনাহর কাজ। এই নীতিমালাটি সবাই জানলে যে কেউই ন্যায়-অন্যায় চিনতে পারবে। তার ঈমানকে কেউ ভুল পথে ব্যবহার করতে পারবে না। আমাদেরকে প্রকৃত মো’মেন হতে হবে। যদি হতে পারি তাহলে কেবল এই দেশের মানুষকে নয়, সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করতে পারব ইনশা’আল্লাহ।
৪. এতদিন থেকে বলা হচ্ছিল মাদ্রাসা থেকেই কেবল জঙ্গি হয়। গরীব ঘরের ছেলেরা অর্থের লোভে জঙ্গি হয়। কিন্তু এই কথা যে পুরোপুরি সত্য নয় সেটা প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ধনীর দুলালরা যাদের কোনো অর্থ-বিত্তের অভাব নাই তারা জঙ্গি হচ্ছে। তাই এখন অনেকেই বলছেন- শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে। কোথায় গলদ আছে সেটা এখন বুঝতে হবে। এই সঙ্কটের শিকড় অনেক গভীরে। আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে- প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আপনারা জানেন বর্তমানের এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তক হচ্ছে ব্রিটিশরা। আমরা যখন ব্রিটিশদের অধীনে ছিলাম তখন তারা এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই ব্যবস্থায় তারা প্রকৃত ইসলাম শিক্ষা দেয় নাই, ঐক্য শিক্ষা দেয় নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী চেতনা শিক্ষা দেয় নাই। এটা ছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির অন্তর্ভুক্ত একটি ষড়যন্ত্র। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর মানুষ বের হচ্ছে, দেশপ্রেমিক বের হচ্ছে না। এই ব্যবস্থায় ধর্ম সম্পর্কে হীনম্মন্যতা শিক্ষা দেওয়া হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা পরিবার থেকে পায় ধর্মের অনুশাসন, নীতি-নৈতিকতাবোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাচ্ছে নাস্তিক্যবাদী শিক্ষা। এই সাংঘর্ষিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এত ভাগ রাখা যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে একমুখী। আর সে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে প্রথম ও প্রধান যে শিক্ষাটি মানুষকে দিতে হবে তা হচ্ছে- যে কাজে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই কাজ সে করবে না।
৫. শুধু শক্তি দিয়ে এই সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। শক্তির পাশাপাশি আদর্শ লাগবে। এ কথা আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। এখন সবাই বলছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন- ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা দিতে হবে। সেই প্রকৃত শিক্ষা কোথায় আছে সেটা খুঁজে বের করে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। এই কাজে মিডিয়াকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।
৬. রাষ্ট্রকে ন্যায়ের দন্ড ধারণ করতে হবে। যা ন্যায় তাকে ন্যায় বলে স্বীকার করা, যা অন্যায় তাকে অন্যায় বলে স্বীকার করা এবং তার প্রতিকার করা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ধর্ম। এখানে কে কোন দলের, কে কোন মতের, এরূপ প্রশ্ন তোলা রাষ্ট্রের শোভা পায় না। শাসক যখন ন্যায়দন্ড ধারণ করেন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হন, তখন মানুষ সেই শাসকের জন্য প্রয়োজনে জীবন দিতে দ্বিধা করে না। আজকে যখন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, তখন সরকারকে বলব, আমাদের জনপ্রতিনিধিদের বলব, আপনাদের একেকজনকে হতে হবে ধর্মের মূর্ত প্রতীক। আপনাদের দাঁড়াতে হবে ন্যায়ের দন্ড হাতে। যাবতীয় স্বার্থপরতা, স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে যদি মানুষকে ভালোবেসে রাজনীতি করেন, তবে নিঃসন্দেহে কোটি কোটি মানুষ আপনাদের জন্য জীবন দেবে। আপনাদের এক আহ্বানে সমস্ত জাতি ঐক্যবদ্ধ হবে। কিন্তু এই শর্ত পূরণ না করে জাতিকে যতই ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করুন, তা হবে প্রাকৃতিক নিয়মবিরুদ্ধ। রাষ্ট্র যদি ন্যায়ের দন্ডকে ধারণ করতে পারে তাহলে যাবতীয় অন্যায়-অনৈতিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার নৈতিক শক্তি পাবে, হিম্মত পাবে। জানি এটা কঠিন কাজ, কারণ বর্তমান ব্যবস্থাটাই এরকম যে ন্যায়ের দন্ড ধারণ করা অনেক কঠিন। কিন্তু তবু করতে হবে, ইনশা’আল্লাহ আল্লাহ সহজ করে দিবেন। আমি আপনাদেরকে কোনো নির্দিষ্ট লেবাস ধারণ করতে বলছি না, নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের আশ্রয় নিয়ে অন্য ধর্মকে অবজ্ঞা করতেও বলব না। লেবাস, খানাদানা, আনুষ্ঠিকতা ধর্ম নয়। ধর্ম হচ্ছে ন্যায়। ন্যায়ের দন্ড- ধারণ করাই রাষ্ট্রের প্রধান ধর্ম।

Comments (0)
Add Comment