জঙ্গিবাদ নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা চলছে অন্তত এক যুগ আগে থেকে। এ আলোচনায় বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। টিভি-টকশোতে, সেমিনারে, পত্র-পত্রিকায় বিশেষজ্ঞরা জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ নিয়ে অনেক জ্ঞানগর্ভ মতামত দিয়ে এসেছেন এতদিন। এক যুগ আগে থেকে চলে আসা এসব আলোচনা-সাক্ষাৎকারে সাধারণত জঙ্গি হবার পেছনে অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণ সামনে আনা হত। কোন ক্লাসের ফ্যামিলি থেকে তরুণরা জঙ্গিবাদে নাম লেখাচ্ছে, কোন মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে জঙ্গি বের হচ্ছে- এসবের আলোচনাই বেশি হত। বলা হত- মাদ্রাসা হচ্ছে জঙ্গি তৈরির কারখানা; আর জঙ্গি হয় সাধারণত গরীব-নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা যারা কারও ভালোবাসা পায় না, দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে বড় হয়। ইনিয়ে-বিনিয়ে এটাই প্রমাণের চেষ্টা চলত যে, সামাজিক অবহেলার শিকার নিম্নবিত্ত পরিবারের তরুণগুলোকে অর্থের লোভ দেখিয়ে জঙ্গি বানানো হয়, কিংবা শিক্ষা-দীক্ষার অভাব থাকায় ভুল-ভাল বুঝিয়ে খুব সহজেই জঙ্গি বানিয়ে ফেলা হয়।
কিন্তু সে আলোচনায় ভাটা পড়েছে গত ২/৪ বছর আগে থেকে। ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। এখন আর অর্থনৈতিক শ্রেণীবিভাগকে দায়ী করা হচ্ছে না। বিশেষ করে গুলশান ট্র্যাজেডির পর দেখা যাচ্ছে ভয়ংকর জঙ্গিরা প্রায় সবাই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র, আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন তরুণ। তারা প্রত্যেকেই ধনীর ঘরের আদরের দুলাল, সামাজিক বঞ্চনার প্রশ্নই ওঠে না। এই ধরনের উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা যখন জঙ্গিবাদের দিকে পা বাড়াচ্ছে তখন পূর্বের ওইসব অনুমাননির্ভর আলোচনা মুহূর্তেই অসার ও অযৌক্তিক প্রতিপন্ন হয়ে গেছে। এখন তারা উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন- কেন ওরা ওই পথে পা বাড়াল, কীসের অভাব তাদের, কীসের কষ্ট তাদের মনে? না, কোনো অভাবের তাড়না থেকে নয়, লালসা থেকে নয়, বাধ্য হয়ে নয়, নিজেদের ঈমানী দায়িত্ব মনে করে তারা ওই পথে পা বাড়িয়েছে। মূল কারণ ধর্মবিশ্বাস। হ্যাঁ, কেউ তাদেরকে উদ্দীপ্ত করেছে, প্ররোচিত করেছে, কিন্তু সেটা ধর্ম দিয়েই, কোনো পার্থিব বস্তুর লোভ দেখিয়ে নয়। ধর্মবিশ্বাস কত সাংঘাতিক বিষয়, কত শক্তিশালী চেতনা, তা আমাদের বিশেষজ্ঞ আলোচকরা এতদিন ঘুনাক্ষরেও টের পান নি। যারা বস্তুবাদী চিন্তাধারা লালন করেন তারা বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিয়েই জঙ্গিবাদকে বুঝতে চেয়েছেন, জাতিকেও সেটাই বুঝিয়ে এসেছেন।
ধর্মবিশ্বাস যতটা সরল ততটাই ভয়ানক। জাতির ধর্মবিশ্বাস বা ঈমান যদি সঠিক পথে ব্যবহৃত হয় তাহলে সে জাতিতে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসতে বাধ্য। কিন্তু ধর্মবিশ্বাস যদি ভুল খাতে প্রবাহিত হয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে হাইজ্যাক হয়ে যায়, তাহলে সেটা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে, মানুষের ক্ষতি হয় এমন জাতিবিনাশী কাজে ব্যবহৃত হবে। সঠিক পথে ব্যবহৃত হচ্ছে না মানেই ভুল পথে ব্যবহৃত হবে, কল্যাণের কাজে লাগছে না মানেই অকল্যাণের কাজে লাগানো হবে। এই ঈমান যাতে কোনো গোষ্ঠীর হাতে বন্দী হয়ে না যায়, কেউ যাতে কারও সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থহাসিল করতে না পারে, সমাজের ক্ষতি করতে না পারে, এ জন্যই ইসলামের মৌলিক একটি নীতি হচ্ছে- আকীদা পরিষ্কার থাকতে হবে। আকীদা হচ্ছে সম্যক ধারণা, অর্থাৎ কোন কাজ কেন করব, তাতে আমার কী লাভ, সমাজের কী লাভ, ইসলামের কী লাভ সেটা ভালোমতো জেনে-বুঝে করা। আকীদা সঠিক না হলে ঈমানের কোনো দাম নেই- এটা সকল মাজহাবের আলেমরাই স্বীকার করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমান নামক এই জাতির আজ ভয়াবহ রকমের আকীদাচ্যুতি ঘটেছে। তাদের কোনো লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই, নেতৃত্ব নেই, শৃঙ্খলা নেই। ফলে সঠিক আকীদা না থাকায় ঈমান বিপথগামী হচ্ছে। হালবিহীন, কা-ারীবিহীন জাতির ঈমানকে ব্যবহার করে যে যেভাবে পারছে স্বার্থ হাসিল করছে। কেউ পীর-মুরিদীর পথে, কেউ অপরাজনীতির পথে, কেউ জঙ্গিবাদের পথে কাজে লাগাচ্ছে। সেই ঈমানের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হচ্ছে জঙ্গিবাদের বাস্তবিক সমাধান। কলাম: সংগঠক, হেযবুত তওহীদ।