লুৎফর রহমান, হাকিমপুর সংবাদদাতা: দিনাজপুরের হিলির মুহাড়াপাড়া থেকে অপহরনের ৩৬ঘন্টা পর আবতাহি আল রশিদ নামের চার বছরের এক শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার ও ঘটনার মুল হোতা সামিউল ইসলাম (১৮) ও তার পিতা আমজাদ হোসেনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে উত্তেজিত গ্রামবাসী অপহরনকারীর বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ভাংচুর চালিয়েছে। তারা অপহরনকারীদের দ্রুত যেন ফাসী দেওয়া হয় সে দাবী করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টায় শিশুটিকে প্রতিবেশী আমজাদ হোসেনের টিন সেডের বাড়ির তালার ওপর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এঘটনায় নিহতের পিতা মামুনুর রশিদ আজাদ বাদি হয়ে প্রতিবেশী আমজাদ হোসেন, স্ত্রী লাকি বেগম ও ছেলে সামিউল ইসলামকে প্রধান আসামী করে গতমঙ্গলবার রাতেই একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যাহার নং ৬, তারিখ ১২.৪.১৬ইং।
নিহত আবতাহি আল রশিদ হাকিমপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যক্ষ ও হিলির মুহাড়াপাড়া গ্রামের মামনুর রশিদ আজাদের ছেলে। ঘটনায় আটক একই এলাকার মৃত সৈমুদ্দিনের ছেলে আমজাদ হোসেন (৪৫),তার ছেলে সামিউল ইসলাম সে স্থানীয় হাকিমপুর ডিগ্রি কলেজের এইএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র। স্ত্রী লাকি বেগম পলাতক রয়েছে।
বুধবার সকালে শিশুটির মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরন করা হয়। পরে দুপুরে আটককৃত সামিউল ও আমজাদকে আদালতে প্রেরন করা হয়েছে। পরে বিকাল সাড়ে ৩টায় নিহত আবতাহি আল রশিদের মরদেহের ময়না তদন্ত শেষে স্থানীয় মুহাড়াপাড়া ঈদগা মাঠে জানাযার নামাজ শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে পুলিশ ঘটনাস্থল হতে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে ও শিশু হত্যা ঘটনার মুল হোতা সামিউল ও তার পিতাকে আটক করে থানায় নিয়ে গেলে উত্তেজিত গ্রামবাসী অপহরনকারীর বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ভাংচুর করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে গেলে গ্রামবাসীর বিক্ষোভের মুখে পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ একত্রে গিয়ে পরিস্থিতী নিয়ন্ত্রনে আনেন। এঘটনায় স্থানীয়রা জড়িতদের দ্রুত আটক ও আটককৃতদের দ্রুত বিচার কার্য সম্পূর্ন করে ফাসীর দাবী করে বিক্ষোভ করেছেন। এদিকে দুই সপ্তাহআগে একই এলাকা থেকে অপহরনের সময় এলাকাবাসী তিন শিশুকে উদ্ধার ও এক অপহরনকারীকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এনিয়ে এলাকায় শিশুদের অভিভাবকদের মাঝে এক ধরনের আতংক বিরাজ করছে।
শিশুটির পিতা মামুনুর রশীদ আজাদ ও স্থানীয়রা জানান, গত সোমবার সকাল ১১টার দিকে ছেলে আত্বাহী আল রশিদ ভাত খাওয়া শেষে ছেলে বাড়ির পার্শ্বে সামনের উঠানে খেলতে যায়। ঘটনার প্রায় আধঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পড়েও ছেলে বাড়িতে না আসায় বাড়ির আশে পাশেসহ সকল এলাকা ও নিকট আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে খোজ নেওয়া হয়। আশে পাশের পুকুরসহ সমস্ত এলাকায় অনেক খোজাখুজি এবং মাংকিং করা হলেও কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে এবিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় হাকিমপুর থানায় একটি সাধারন ডায়েরি করি। রাতেই অপরহনকারীরা বাসার উঠানে লিচু গাছের নিচে আমার ছেলের ব্যাবহৃত সেন্ডেল ও একটি মোবাইল নাম্বার রেখে চলে যায়। পরে সে মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে শিশুটি তাদের হেফাজতে রয়েছে মর্মে ছেলেকে ফেরত নিতে চাইলে ত্রিশ লাখ টাকা মুক্তিপন দিতে হবে বলে মোবাইলে মেসেজ দেয় অপহরনকারীরা। সে মোতাবেক শিশুটির পিতা অপহরনকারীদের দাবীকৃত টাকা দিতেও সন্মত হয়েছিল। কিন্তু কোথায় বা কখন টাকা দিতে হবে এ বিষয়ে অপহরনকারী মেসেজে কিছুই জানায়নি। পরে বিষয়টি থানাকে অবহিত করা হয়।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মিজানুর রহমান জানান, অভিযোগের পরপরই আমরা শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য তৎপর হই এবং আমাদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুটিকে উদ্ধার করার চেষ্টা করি। এর মধ্যে আমরা সংবাদ পাই শিশুটির পিতার নিকট ত্রিশ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবী করা হয়েছে ও টাকা দিলে শিশুটিকে ছেড়ে দিবে অপহরনকারীরা। বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক হয়ে পুলিশ সুপারের নির্দেশে আমি নিজে পুলিশের কয়েকটি টিম নিয়ে অপারেশনে বেড় হই। পরে মোবাইলের ম্যাসেজের সুত্র ধরে অপহরনকারীর মোবাইল ট্যাক করে আমজাদ হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আমজাদ হোসেন ও সামিউলকে আটক করা হয়। এসময় লাকি বেগম পালিয়ে যায়। পরে সামিউলকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার দেওয়া তথ্য মতে তার শোবার ঘরের তালা থেকে প্লাষ্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সামিউল জানিয়েছে, অপহরনের সাথে সাথেই সে শিশুটিকে গলাটিপে স্বাসরোধ করে হত্যা করে শিশুটির মৃতদেহ বস্তাবান্দি করে ঘরের তালায় রেখে দেয়। যার ফলে শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সে টাকার জন্য একাই ঘটনাছি ঘটিয়েছে বলেও আমাদের জানিয়েছে।
এঘটনায় নিহত শিশুটির পিতা মামুনুর রশিদ আজাদ বাদি হয়ে প্রতিবেশী আমজাদ, লাকি বেগম ও সামিউলকে আসামী করে মঙ্গলবার রাতেই একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
বুধবার সকালে শিশুটির মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরন করা হয়েছে। এর মধ্যে মামলার অন্যতম সামিউল ও আমজাদকে দুপুরে দিনাজপুরে আদালতে প্রেরন করা হয়েছে। মামলার অপর আসামী লাকি বেগমকেও গ্রেফতারে এলাকায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে বলে তিনি জানান।