ভূমিকম্পনের আগে ও পরে করণীয়

অনলাইন ডেস্ক: সোমবার ভোরে ঢাকা থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার পূর্বে ভারতের মনিপুরে আঘাত হানে ওই ভূমিকম্প। এ সময় কেঁপে ওঠে বাংলাদেশও। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে ঢাকা, রাজশাহী, লালমনিরহাট, জামালপুর ও পঞ্চগড়ে ৮ জনের মৃত্যেুর খবর পাওয়া গেছে। সারাদেশে আহত হয়েছেন শতাধিক। এ অবস্থায় বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশকে নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা আরেকটু বেশি হলে বিপর্যয়ে পড়তে পারে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও সিলেটের ডাউকি ফল্ট। তবে ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কের চেয়ে প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এসময় বেশি সচেতন থাকার পরামর্শ তথ্য অধিদফতরের।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ঢাকা শহরে ৭২ হাজার বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ। আর চট্টগ্রাম এবং সিলেটে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। গত এক বছরের মধ্যে এই ভূমিকম্পই সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

আর বিভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ঢাকার আশপাশের কোনো জেলাতেই ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে শহরটি বিশাল বিপর্যয়ে পড়বে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে এমন একটি সরকারি প্রকল্প কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের পরিচালক মো. আব্দুল কাইউম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘তারা এই প্রকল্পের অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ ৯টি বড় শহরের ঝুঁকি নির্ণয় করেছেন। আর ঢাকার পাশে মধুপুরকে একটি ভূমিকম্প ঝুঁকি এলাকা মনে করা হয়।

ভূমিকম্প টের পেলেই মানুষ দৌড়ে বাইরে চলে যায়। এর আগেও কয়েকবার দেশে ভূমিকম্পের সময় দেখা গেছে, সবাই রাস্তায় বের হন। সম্ভবত প্রচলিত ভুল ধারণা যেটা, সবাই ভাবেন বিল্ডিং লম্বালম্বিভাবে ধ্বসে পড়বে। কিন্তু বাস্তব ঘটনা তা নয়। ঢাকা শহরের মতো ঘন জনবসতি আর দালানে-পিলারে-সাইনবোর্ডে-ইলেকট্রিক তারে ঘিঞ্জি একটা জায়াগায় ভূমিকম্পের সময় বাইরে বের হওয়া মানে মোটামুটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া।

বিভিন্ন সময় বিশ্লেষকরা বলে আসছেন, শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল দেশের ভেতরে হলে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকাসহ অন্যান্য মহানগরীতে মারাত্বক বিপর্যয়ে পড়বে।

ভূমিকম্প হচ্ছে-হবে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে থামানোর কোনো রাস্তা নেই। আর এগুলো নিয়ে মানুষকে বিচলিত করা যাবে না। ধ্বংসযজ্ঞ হলেও যারা বেঁচে থাকবে তাদের উদ্ধারের জন্য তৈরি থাকতে হবে। আর এজন্য উপযুক্ত যন্ত্রপাতি কেনা ও যান চলাচলের উপযোগী রাস্তাঘাট রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশের জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভবন নির্মাণ করতে হবে।
আর হাসপাতালগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফিল্ড পর্যায়ে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করা দরকার।

আসলে বাংলাদেশ ভূমিকম্প নিয়ে ঝুঁকিতে আছে এটা সত্য। কিন্তু এ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। সচেতনতা ও প্রিপেয়ার্ডনেস হচ্ছে মূল করণীয়। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্য অধিদফতরের ব্যাখ্যায় ভূমিকম্প হলে করণীয়:

১) ভূমিকম্প হচ্ছে বুঝতে পারলে আতংকিত হয়ে পড়বেন না। একটু মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করুন।
২) ভূমিকম্পের সময় বাসাবাড়িতে থাকলে বা বিছানায় থাকলে বালিশ দিয়ে মাথা ঢেকে টেবিল বা শক্ত কোনো আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নিন।
৩) মাথা ঠাণ্ডা রেখে জীবন বাঁচাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করুন। চট করে রান্নাঘরের গ্যাসের চুলার সুইচ বন্ধ করে ফেলুন। এতে করে বড় ধরণের অন্য দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে পারবেন।
৪) স্কুল, কলেজ বা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকলে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলব্যাগ মাথায় দিয়ে শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন।
৫) ঘরের বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন বড় গাছ, উঁচুবাড়ি, বৈদ্যুতিক খুঁটি ইত্যাদি থেকে দূরে খোলা কোনো স্থানে আশ্রয় নিন।
৬) গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল, মার্কেট ও সিনেমা হলে থাকলে হুড়োহুড়ি করে বের হওয়ার জন্য দরজার সামনে ভিড় বা ধাক্কাধাক্কি করতে যাবেন না। যেখানে আছেন সেখানেই দু’হাতে মাথা ঢেকে বসে পড়ুন।
৭) দুর্ভাগ্যবশত ভাঙা দেয়ালের নিচে চাপা পড়লে অতিরিক্ত নড়াচড়া করে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করবেন না। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখুন, যাতে ধুলোবালি শ্বাস নালিতে না ঢোকে।
৮) একবার কম্পন হওয়ার পর আবারও কম্পন হতে পারে। তাই সুযোগ বুঝে বিল্ডিং থেকে বের হয়ে খালি জায়গায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
৯) বেশি উপরতলায় থাকলে কম্পন বা ঝাঁকুনি না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে লাফ দিয়ে বা লিফট ব্যবহার করে নামতে যাবেন না একেবারেই।
১০) কম্পন বা ঝাঁকুনি থামলে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে চলে যান।
১১) গাড়িতে থাকলে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার, গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামিয়ে ফেলুন এবং ভূকম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরে থাকুন।
১২) ব্যাটারিচালিত রেডিও, টর্চলাইট, পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম বাড়িতে রাখুন।
১৩) বিল্ডিং কোড মেনে ভবননির্মাণ করুন।

ভূমিকম্প শেষ হলে যা করবেন:

ভূমিকম্প মানে এই না যে, জমিন নড়ে উঠলো, বাড়ী ভেঙে পড়লো, ভেঙে পড়ার আগেই বাড়ি থেকে বের হয়ে বেঁচে গেলাম!। ঝামেলা শুরু হয় এর পরে।
বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ভয়াবহতা হলো, এর পর সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। পানি, গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি সব বন্ধ হয়ে যাবে। আন্ডারগ্রাউন্ড পানি আর গ্যাসের পাইপগুলো ভেঙে এলোমেলো হয়ে যাবে, সাপ্লাই পুনরায় শুরু করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। ফোনলাইন বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা খুব বেশি, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও বিকল হবার সম্ভাবনা খুবই জোরালো। এই বিষয়ে একটু সচেতন থাকা জরুরি।
এর বাইরে অনেক জায়াগায় রাস্তা নষ্ট হতে পারে। সেক্ষেত্রে রাস্তার যেটুকু চলার উপযোগি থাকবে, সেটুকু ভরে যাবে গাড়িতে, রিক্সায়। আর রাস্তা ঠিকটাক না থাকেল সেটা নিজেদের মতো সংস্কার করতে হবে।
আরো বড় যে সমস্যাটা, সেটা হলো প্যানিক। যে দোকানগুলোতে জিনিসপত্র কেনার মতো অবস্থা থাকবে, সেগুলোর কী দশা হবে ভাবুন। শতশত মানুষ ভীড় জমাবে, সবাই চাইবে যত বেশি সম্ভব এটা ওটা কিনে মজুত করতে হবে।
আরো সমস্যা আছে, এই প্যানিকের সময় গুজব ছড়াবে অসংখ্য। সেটার আফটারইফেক্ট কতদূর যাবে তা নির্ভর করবে পুরোই আপনার ভাগ্যের ওপর, মানে, গুজবটা কতটুকু ফ্যাটাল আর সেটা শুনে আপনি কতটুকু মাথা ঠান্ডা রাখতে পারছেন তার ওপর।
এসব সমস্যার কথা মাথায় রেখে আমরা যদি ভূমিকম্পের সময় কী করব সেটা নিয়ে নিজেরা কিছু আগাম ব্যবস্থা নিয়ে রাখি। শুধু সরকার কিংবা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই, নিজেদেরও টুকটাক কাজগুলো করতে হবে।

Comments (0)
Add Comment