নড়াইল প্রতিনিধি: নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নের ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে প্রকল্পের অধিকাংশ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে এলাকাবাসী ও শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্র জানায়, গত ২৮ নভেম্বর থেকে উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুুে হয়েছে। শেষ হবে ২০ জানুয়ারি। ৪০ দিনের এ কর্মসূচিতে প্রতি কর্মদিবসের জন্য শ্রমিকেরা ২০০ টাকা করে মজুরি পাবেন। ব্যাংকে হিসাব খুলে শ্রমিকদের নিজস্ব চেকের মাধ্যমে মজুরি পরিশোধের নিয়ম। প্রকল্পে মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশ নারী থাকার কথা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কর্মসূচিটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। ১১টি প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় প্রকল্প বিবরণী-সংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানোর কথা থাকলেও কোথাও তা নেই। কোথাও সব শ্রমিক পাওয়া যায়নি। যৎসামান্য শ্রমিক দিয়ে অল্প কয়েক দিন কাজ হয়েছে। অধিকাংশ প্রকল্পে নারী শ্রমিক নেই। এলাকাবাসী ও শ্রমিক সূত্র জানায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউপি সদস্যরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে শ্রমিকদের পরিশোধ করেছেন। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে অধিকাংশ প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এলাকায় প্রকল্প বিবরণী লেখা সাইনবোর্ড থাকলে স্থানীয় লোকজনই কাজ আদায় করে নিতেন। দিঘলিয়া ইউনিয়নের চর দিঘলিয়া পূর্বপাড়া শওকত মোল্যার বাড়ি থেকে দক্ষিণ দিকে চারের ঘাট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে ৩৪ জন শ্রমিকের মজুরির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে সেখানে গিয়ে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। ওই প্রকল্পের শ্রমিক আনোয়ার মোড়ল বলেন, ‘৪০ দিনির মধ্যি এহানে মোট ১২ দিন কাজ হইছে। ১২ দিনি ১৫০০ টাকা পাইছি। মেম্বার বলিছে কাজ শেষ হয়ে গেছে, আবার কাজ পাস হলি ডাকপানি। ইউপি সদস্য অমল কৃষ্ণ ঘোষ এ কাজ করিছেন। তিনি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এনে দিছেন। চেকে সই নেননি।’ স্থানীয় বাবু মীর বলেন, ইউপি সদস্য অমলকে এ কাজ চুক্তিতে দেওয়া হয়েছে। এখানে ৩৪ জন শ্রমিক নেওয়ার কথা থাকলেও ৭ থেকে ১৪ জন করে কাজ করেছেন। অমল আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের দিয়ে ব্যাংকে হিসাব খুলে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অতিদরিদ্র শ্রমিকেরা বঞ্চিত হয়েছেন। অমল কৃষ্ণ ঘোষ বলেন, ‘অন্য জায়গায় কাজ হচ্ছে। আমি নিজে ব্যাংক থেকে টাকা তুলিনি, অন্য একজন টাকা তুলে দিয়েছেন।’ কোথায় কাজ হচ্ছে তা তিনি বলতে পারেননি। শালনগর ইউনিয়নের আজমপুর ইউনুচের বাড়ি থেকে টেপু মিয়ার জমি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে ৭৯ জন শ্রমিকের জন্য ৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত রোববার দুপুর ১২টার দিকে দেখা যায়, চারজন পুরুষ কাজ করছেন। ইউপি চেয়ারম্যান লাবু মিয়া ও পিআইও নজরুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় লোকজন জানান, এখানে চুক্তিতে পেশাদার মাটিকাটা শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। সর্বোচ্চ ১৪ জন শ্রমিক ১০-১২ দিন এখানে কাজ করেছেন। লাবু মিয়া বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমার প্রকল্পের মতো এত ভালো কাজ অন্য কোথাও হচ্ছে না।’ জয়পুর ইউনিয়নের আস্তাইল গুচ্ছগ্রামের রাস্তা থেকে পূর্ব দিকের রাস্তা মাটি দিয়ে সংস্কার প্রকল্পে ৪৫ জন শ্রমিকের জন্য ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। রোববার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সেখানে গিয়ে কোনো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য শাহাদাৎ হোসেন কাজের পরিমাণ ও শ্রমিকের সংখ্যার বিষয় স্বীকার করে বলেন, ‘এখানে আমার তেমন কিছু থাকে না, অনেককেই
ম্যানেজ করতে হয়।’ পিআইও নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক অবস্থানে থাকা কঠিন। তাহলে চেয়ার থাকবে না।’ লোহাগড়ার ইউএনও সেলিম রেজা বলেন, ‘নতুন ইউএনও হয়েছি, তাই বুঝতে দেরি হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ দিন প্রশিক্ষণে ভারতে ছিলাম। তাই সমস্যা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব বিষয়ে শক্ত অবস্থানে থাকব।’