‘’হামার আর খোঁজখবর কে নিবে? এতিম সন্তানদের নিয়ে কোন রকমে বাঁচি আছি’’
রংপুরের মিঠাপুকুরে পেট্রোল বোমায় বাদাম বিক্রেতা রহিম বাদশার মৃত্যুর ১ বছর
মুরাদ হোসেন, উলিপুর, কুড়িগ্রাম থেকে: রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে বাদাম বিক্রেতা রহিম বাদশা ও তার মা রহিমা বেগম এর মৃত্যুর ১ বছর কেটে গেল নিরবে নিভৃতে। গত বছর ১৪ জানুয়ারী গভীররাতে রংপুরের মিঠাপুকুরের বাতাসন এলাকায় ঢাকাগামী নাইট কোচে বিএনপি-জামায়াত জোটের মানবরুপী ঘাতকরা প্রেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে বাসের ভিতর জলন্ত আগুনে পুড়ে মা ও পুত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এসময় সহযাত্রি জেসমিনও পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। তাদের বাড়ী কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেনী ইউনিয়নের বিজয়রাম তবকপুর চড়ুয়াপাড়া ও পশ্চিম দড়িচর গ্রামে। গত বুধবার রহিম বাদশার বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, শুমসাম নীরবতা। স্বামীর শোকে পাথর বাদশার স্ত্রীকে কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, হামার আর খোঁজখবর কে নিবে। স্বামী ছিল, আজ স্বামী নাই। এতিম সন্তানদের নিয়ে কোন রকমে বাঁচি আছি। বড় ছেলে লিটন উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজের এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী, ছোট ছেলে লিমন ৪র্থ শ্রেণি আর একমাত্র মেয়ে রুমি খাতুন ৭ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। পুলিশের তৎকালীন মহা পরিদর্শক এর সাথে সাক্ষাতকালে আমাকে বলেছিলেন, ছেলেটার বয়স হলে পুলিশে চাকুরির ব্যবস্থা করবেন। আমি সে আশায় বুক বেঁধে আছি।
কথা প্রসঙ্গে বাদশার স্ত্রী কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমি সেদিনই শান্তি পাব, যেদিন আমার স্বামী ও শ্বাশুড়ি হত্যার বিচার পাব। জানা গেছে, দরিদ্র পরিবারের রহিম বাদশা বৃদ্ধা মাকে সাথে নিয়ে ঢাকার বিশ্ব ইজতেমায় বাদাম বিক্রি করে উপার্জন করার জন্য ঐদিন নাইটকোচ খলিল পরিবহনে উলিপুর থেকে ঢাকা যাচ্ছিল। এসময় বিএনপি-জামায়াত জোটের লাগাতার অবরোধের মধ্যে বাসটি গভীর রাতে ঐ এলাকা অতিক্রম করার সময় ঘাতকরা তাতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। তখনই বাদাম বিক্রেতার সব স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যায়। এ ব্যাপারে মিঠাপুকুর থানায় মামলা দায়েরর পর আসামীরা গ্রেফতার হলেও বিচার কার্যক্রমে বিলম্বের কারনে এখনও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত রয়েছে নিহত ও আহত পরিবারগুলোর স্বজনরা। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর দরিদ্র রহিম বাদশার পরিবারের পাশে দাড়ায় বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিবারটিকে এককালিন ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়ে আর্থিক সহযোগীতা প্রদান করেন। সেই সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ ১০ হাজার ৭’শ টাকা প্রতিমাসে পাচ্ছে পরিবারটি। এ টাকা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া খরচ চলছে। ঐসময় পুলিশের মহা-পরিদর্শক ৫০ হাজার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ২০ হাজার টাকা এককালীন প্রদান করেন। এছাড়াও কড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য এ.কে.এম মাঈদুল ইসলাম পরিবারটির জন্য গরম কাপড়সহ পাড়িপাতিল প্রদান করেন। রহিম বাদশার আশা ছিল ঢাকার ইজতেমা থেকে ফিরে এসে মামাকে টাকা দিয়ে বসতবাড়ীর জায়গাটুকু দলিল করে নেবে। কিন্তু সে আশা তার পূরণ হয়নি। পরিবারটি এখনও অন্যের ভিটায় আশ্রিত হয়ে বসবাস করছে।
পার্শ্ববর্তী পশ্চিম দড়িচর গ্রামের রিক্সাওয়ালা আব্দুল জব্বারের কন্যা জেসমিন আক্তার ( ১২) একই বাসে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে মারা যায়। ঐদিন রহিম বাদশার সাথে সে বাবা-মার কাছে ঢাকা যাচ্ছিল। এ পরিবারটিকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করেন।