শিল্প-সংস্কৃতি ধর্মের প্রতিপক্ষ নয়, পরিপূরক: গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
ইসলামে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বরূপ ও এর চর্চা নিয়ে রাজধানীতে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বক্তারা বলেছেন, ধর্ম শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
হেযবুত তওহীদের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিভাগের উদ্যোগে শনিবার (৩০ আগস্ট ২০২৪) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ইসলাম ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি’ শীর্ষক এই আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনা শেষে ৭ দফা প্রস্তাবনা গৃহীত হয়।
সংগঠনের ঢাকা বিভাগীয় সভাপতি মাহবুব আলম মাহফুজের সভাপতিত্বে ও গণমাধ্যম সম্পাদক শারমিন সুলতানা চৈতির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হেযবুত তওহীদের সাহিত্য সম্পাদক কবি রিয়াদুল হাসান।
মূল প্রবন্ধে রিয়াদুল হাসান বলেন, “ইতিহাসের প্রতিটি সভ্যতার বিকাশে ধর্ম ছিল প্রধান নিয়ামক এবং শিল্প-সংস্কৃতি ছিল তার অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্তু একশ্রেণির কথিত আলেম ঢালাওভাবে সকল শিল্প-সংস্কৃতিকে হারাম ফতোয়া দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছেন, যা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী।”
কোরআন ও হাদিসের আলোকে তিনি বলেন, “আল্লাহ কেবল অশ্লীলতা, আল্লাহর অবাধ্যতা ও শিরককে হারাম করেছেন। মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা তৎকালীন আরবের জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান শুনেছেন এবং গেয়েছেন। এমনকি মসজিদে নববী নির্মাণের সময়ও তাঁরা কর্মসঙ্গীত গেয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নির্মিত গান, নাটক বা শিল্পকর্ম জিহাদ বা ইবাদত হিসেবে গণ্য হতে পারে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সঙ্গীত ছিল অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। আল্লাহর অবাধ্যতা ও অশ্লীলতা না ঘটিয়ে ছবি আঁকা, ভাস্কর্য নির্মাণ বা চলচ্চিত্র নির্মাণ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়।” তিনি নবী সোলায়মান (আ.)-এর ভাস্কর্য নির্মাণের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “মূর্তিপূজা শিরক, কিন্তু ভাস্কর্য নির্মাণ শিরক নয়।”
আরবীয় সংস্কৃতিকে ইসলামী সংস্কৃতি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “ইসলাম কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধ করে না। আরবীয় পোশাক বা খাদ্যাভ্যাস ইসলামী সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং তা ভৌগোলিক সংস্কৃতির পরিচায়ক।”
অনুষ্ঠানে হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী বলেন, “আমাদের সংগঠন সুস্থ সংস্কৃতি চর্চাকে উৎসাহিত করে। এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী শুদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ছিলেন এবং তাঁর দেখানো পথেই আমরা ‘মাটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’ নামে একটি সংগঠন পরিচালনা করছি।”
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, জাতীয় কবিতা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আলতামাসুল ইসলাম আকন্দ, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম খান, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সহ-সভাপতি গোলাম মো. চৌধুরী আলাল, গণঅধিকার পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান হোসাইন, শের-এ বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আকবর আলী প্রমুখ।
বক্তারা শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা নিরসনে এমন আয়োজনের প্রশংসা করেন এবং দেশজুড়ে এ ধরনের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বৈঠকে গৃহীত ৭ দফা প্রস্তাবনা:
১. দেশব্যাপী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মতবিনিময় সভা ও সেমিনার আয়োজন করা।
২. উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতাবিরোধী লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা।
৩. ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে লেখা ও গবেষণাপত্র প্রকাশ করা এবং প্রতি তিন মাস অন্তর একটি জার্নাল প্রকাশ করা।
৪. শিল্পী-সাহিত্যিকদের শুদ্ধ শিল্পচর্চায় বাধা দেওয়া হলে সরকারের কাছে দাবি উপস্থাপন করা।
৫. ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা সম্বলিত বই ও পুস্তিকা প্রকাশ করে ভুল ধারণা দূর করা।
৬. অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সুস্থ সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা ও অনুষ্ঠান প্রচার করা।
৭. শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সমাজের সংকট উত্তরণে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করা।