সচিব পদমর্যাদায় জেলা জজ, এমপিরা তার ওপরে
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ক্রমবিন্যাস (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) নির্ধারণ করে দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত রায়ে জেলা জজদের সচিবের পদমর্যাদা, সংসদ সদস্যদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও তিন বাহিনীর প্রধানদের মর্যাদায় রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া রায়ে প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার তিন নম্বর স্থানে স্পিকারের সমতুল্য, অ্যাটর্নি জেনারেলকে হাইকোর্টের বিচারপতির পদমর্যাদায় এবং হাইকোর্টের বিচারপতিদের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় স্থান দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়, সংবিধান যেহেতু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, সেহেতু রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের শুরুতেই সাংবিধানিক পদাধিকারীদের গুরুত্ব অনুসারে রাখতে হবে।
২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি তত্কালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা সংক্রান্ত হাইকোর্টের আদেশ কিছু সংশোধন ও পরিমার্জনসহ বহাল রাখে। প্রায় দুই বছর পর গতকাল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে আপিল বিভাগ। এর মূল রায়টি লিখেন বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন। এতে স্বাক্ষর করেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। প্রকাশিত রায়ে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম তালিকা (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) তুলে ধরে রায়ে বলা হয়, ওইসব দেশের রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম তালিকা (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) বাংলাদেশ থেকে আলাদা।
প্রধান বিচারপতিকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সমমর্যাদার রাখার কারণ হিসেবে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে এ দুটি পদ একসঙ্গে ৪ নম্বর তালিকায় ছিল। সেসময় ২ নম্বরে ভাইস প্রেসিডেন্টের এবং ৩ নম্বরে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছিল। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ উঠে যাওয়ায় দুই নম্বরে প্রধানমন্ত্রীকে নেওয়া হয়েছে। ৩ নম্বরে স্পিকারকে নেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে ৪ নম্বরে রেখে তার পদমর্যাদার অবনমন করা হয়েছে। তাই প্রধান বিচারপতির পদটি স্পিকারের সঙ্গে রাখতে বলা হলো।
আপিল বিভাগের বিচারপতিকে তালিকার ৭ নম্বরে এবং আট নম্বরে হাইকোর্টের বিচারপতিদের সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলকে রাখতে বলা হয়েছে। এ তালিকার ১২ নম্বরে সংসদ সদস্য, কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল ও ন্যায়পালকে, ১৫ নম্বরে পিএসসি চেয়ারম্যানকে রেখে সরকার আইন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
রায়ে জেলা জজদের ১৬ নম্বরে রাখার যুক্তি হিসেবে আদালত বলেছেন, হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে- বর্তমান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী হাইকোর্টের বিচারপতিদের রাখা হয়েছে নয় নম্বর ক্রমিকে। আর জেলা জজদের রাখা হয়েছে ২৪ নম্বরে। কিন্তু একজন জেলা জজকে যখন সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করা হয় তখন তার পদক্রম যায় নয় নম্বরে। এভাবে সংবিধানে উল্লেখিত জেলা জজদের রাখাটা অবমাননামূলক ও লজ্জাজনক। কেননা জেলা জজ পদটি জুডিশিয়াল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ। অন্যদিকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন সচিবরা। একজন বিচারক চাকরির ২০ বছরের আগে এ পদটিতে আসীন হতে পারেন না। রায়ে বলা হয়, বিচার বিভাগের পদটি (জেলা জজ) সাংবিধানিক পদ নয়। তবে এ পদটি প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী বিভাগের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে সমান মর্যাদা প্রতিফলিত হয়। এ কারণে রায়ে জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচার বিভাগীয় সদস্যরা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের ২৪ নম্বর থেকে ১৬ নম্বরে সরকারের সচিবদের সমমর্যাদায় উন্নীত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে জেলা জজদের পদক্রম কোনোভাবেই প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধানদের উপরে হতে পারে না। তাদের সচিবদের সমমর্যাদায় রাখতে হবে। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচার বিভাগীয় সদস্যদের অবস্থান হবে জেলা জজদের ঠিক পরেই, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের ১৭ নম্বরে।
রায়ে বলা হয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের পদক্রম তালিকায় অ্যাটর্নি জেনারেলকে তিন বাহিনী প্রধানের (জেনারেল র্যাংকধারী) উপরে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে রাখা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ওপরে রাখা হয়েছে এ পদটিকে। তাই আমাদের হাইকোর্ট অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি ওপরে রাখতে যে রায় দিয়েছেন তা যুক্তিযুক্ত।
রায়ে বলা হয়, পাশ্ববর্তী দেশসমূহের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবপ্রাপ্তদেরকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। যারা সাংবিধানিক বা প্রজাতন্ত্রের কোন পদধারি নয়। কিন্তু আমাদের দেশের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সেটা নেই। এটা প্রত্যাশিত যে, ওই সব সম্মানিত ব্যক্তি যারা বেসামরিক খেতাবপ্রাপ্ত, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত, একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং যেসব মুক্তিযোদ্ধ তাদের অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন, তাদেরকে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা উচিত হবে।
সরকারের কার্যপ্রণালী বিধি (রুলস অব বিজনেস) অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে ১১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরি করে তা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে। সরকার তা ২০০০ সালে আবার সংশোধন করে। সংশোধিত এই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের তত্কালীন মহাসচিব জজ মো. আতাউর রহমান ২০০৬ সালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। আবেদনে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদ, সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত ও সংজ্ঞায়িত পদগুলো প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নীচের ক্রমিকে রাখা হয়েছে দাবি করে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সরকারের প্রণীত ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স বাতিল ঘোষণা করে আট দফা নির্দেশনা দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করে। এ নিয়ে দীর্ঘ শুনানিও হয়। গতকাল আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এখন সরকারকে নতুন করে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরি করতে হবে।
যেসব আইনজীবীরা মামলা পরিচালনা করেন
আদালতে আপিলকারী পক্ষে অ্যাডভোকেট আব্দুর রব চৌধুরী, রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও রিটকারী পক্ষে ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও অ্যাডভোকেট এম আসাদুজ্জামান অংশ নেন।