Connecting You with the Truth
ওয়েব ডিজাইন
গ্রাফিক্স
এসইও
ফেসবুক বুস্ট
📞 01757-856855
অর্ডার করুন »

ব্রিটিশ আমলে জাতিকে বিভক্তির ষড়যন্ত্র

education systemরিয়াদুল হাসান:
এই উপমহাদেশ শাসনকালে ব্রিটিশরা আমাদেরকে চিরকালের জন্য গোলাম বানিয়ে রাখতে একটি শয়তানি বুদ্ধি করেছিল। তারা দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল – একটি সাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা আরেকটি মাদ্রাসা শিক্ষা।
এই দুটো শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে চিন্তা-চেতনায় বিরাট মৌলিক ব্যবধান ও বৈপরীত্য রয়েছে। এখানেই তারা আমাদের জাতিটিকে মানসিকভাবে ও বাস্তবে বিভক্ত করে দিয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য কী ছিল তা আলিয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ জনাব ইয়াকুব শরীফ “আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস” বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, “মুসলমানরা ছিল বীরের জাতি, ইংরেজ বেনিয়ারা ছলে-বলে-কৌশলে তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের প্রচলিত ধর্ম, শিক্ষা ও মর্যাদা হরণ করার জন্য পদে পদে যেসব ষড়যন্ত্র আরোপ করেছিল, আলিয়া মাদ্রাসা তারই একটি ফসল।
বাহ্যত এই প্রতিষ্ঠানের পত্তন করা হয়েছিল আলাদা জাতি হিসাবে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্ত, যাতে মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি ও আদর্শ রক্ষা পায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়াই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য।” এই যে ধোঁকাটা দিল, কী সে ধোঁকা? মারটা কোন জায়গায় দিল সেটা বুঝতে হবে। ব্রিটিশ পন্ডিতরা অনেক গবেষণা করে একটি বিকৃত ইসলাম তৈরি করলো যা থেকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও জেহাদকে বাদ দেওয়া হলো এবং ব্যক্তিগত জীবনের মাসলা-মাসায়েল, ফতোয়া, দোয়া-কালাম, মিলাদের উর্দু-ফার্সি পদ্য বিশেষ করে দীনের যে বিষয়গুলো সম্পর্কে পূর্ব থেকেই বিভিন্ন মাজহাবের ফকিহদের মধ্যে বহু মতবিরোধ সঞ্চিত ছিল সেগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করলো।
সেই ইসলামটিকে জাতির মনে মগজে গেঁড়ে দেওয়ার জন্য বড়লাট লর্ড ওয়ারেন হেসটিংস ১৭৮০ সনে ভারতের তদানীন্তন রাজধানী কোলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলো। সেখানে নিজেরা অধ্যক্ষ থেকে ১৯২৭ সন পর্যন্ত ১৪৬ বছর ধরে মুসলিম জাতিকে সেই বিকৃত ইসলামটি শেখালো। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাসে অংক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির কোনো কিছুই রাখা হলো না। ফলে আলেমরা বাস্তব জীবনে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হলেন। কিন্তু জীবিকা ছাড়া তো মানুষ চলতে পারে না, তাই অগত্যা তারা ধর্মের বিভিন্ন কাজ করে রুজি- রোজগার করাকেই নিয়তি হিসাবে গ্রহণ করলেন। ইংরেজ খ্রিস্টানরা এটা এই উদ্দেশ্যে করলো যেন তারা সর্বদা পরনির্ভরশীল হয়ে থাকে এবং মেরুদন্ড সোজা করে কখনো তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে। ইংরেজরা তাদের এ পরিকল্পনায় শতভাগ সাফল্য লাভ করলো।
সেখান থেকে কোর’আন-হাদিসের জ্ঞান নিয়ে লক্ষ লক্ষ আলেম বেরিয়ে আসছেন কিন্তু তাদেরকে জাতির ঐক্য গঠনের গুরুত্ব, জীবন-সম্পদ উৎসর্গ করে সত্যদ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রেরণা শিক্ষা দেয়া হয় নি। এই ষড়যন্ত্রের পরিণামে তাদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞানের অহঙ্কার যেমন সৃষ্টি হলো, পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের গতিশীল ভূবন থেকে পিছিয়ে থাকার দরুন একপ্রকার হীনম্মন্যতাবোধও সৃষ্টি হলো তাদের হৃদয়ে। তাদের অন্তর্মূখিতা, ছোটখাট বিষয় নিয়ে গোঁড়ামি, বিভক্তি ও অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি প্রচন্ড বিদ্বেষের কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াতেই গ্রথিত রয়েছে।
এ কারণে আমাদের জাতীয়ভাবে আল্লাহর দেওয়া বিধান কার্যকর নেই এবং সেটা করার প্রচেষ্টাও তাদের মধ্যে নেই। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষায় আল্লাহ রসুল সম্পর্কে প্রায় কিছুই শিক্ষা দেওয়া হয় নি। বরং সুদভিত্তিক অংক, ব্রিটিশ রাজা- রানীর ইতিহাস, ভুগোল, বিজ্ঞান, গণিত, পাশ্চাত্যের ধর্মহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, পাশ্চাত্য দর্শন ইত্যাদির পাশাপাশি ধর্ম সম্পর্কে, ইসলাম সম্পর্কে একটা বিদ্বেষভাব শিক্ষার্থীদের মনে প্রবেশ করানো হলো। সেখান থেকে লক্ষ লক্ষ কথিত আধুনিক শিক্ষিত লোক বের হচ্ছেন যারা চরম আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর, নিজেদের বৈষয়িক উন্নতি ছাড়া আর কিছুই তারা ভাবেন না। তারা অধিকাংশই আল্লাহর দ্বীনকে মনে করেন সেকেলে, মধ্যযুগীয় চিন্তাধারা, ধর্মকে মনে করেন কল্পকাহিনী। তাদের দৃষ্টিতে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে ধর্ম অচল। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ধর্মবিদ্বেষে এতদূর অগ্রসর যে, কথায় কথায় আল্লাহ, রসুল আর কোর’আনকে গালি দেয়। তাদের অধিকাংশই আবার মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছে। এর মূল কারণ যে বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা ।
এ বিষয়টি এখন আমাদের সবাইকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। একদিকে ইসলামের মূল চেতনাবিহীন আচারসর্বস্ব ধর্মীয় শিক্ষা অপরদিকে একেবারে ধর্মহীন পাশ্চাত্য ধ্যান ধারণার একটি সাধারণ শিক্ষা। এই দুই বিপরীত চেতনায় শিক্ষিত দুটোর শ্রেণির আক্রমণ পাল্টা আক্রমণের মাঝখানে পড়ে বিশাল সংখ্যক ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ মানুষ দিগি¦দিক জ্ঞান শূন্য। এই দুটো চেতনার সংঘর্ষে আমাদের সমাজ, দেশ ও জাতি প্রায়ই নৈরাজ্যের মধ্যে পতিত হয়।
মহান আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ১. নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনবিধান হিসেবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন বা ধর্ম হচ্ছে ‘ইসলাম’ (সুরা ইমরান-১৯)। ২. কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না (সুরা ইমরান ৮৫)। ৩. আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীনরূপে মনোনীত করলাম (সুরা মায়েদা ৩)। মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এক কথায় সর্বব্যাপী জীবনে একটা জীবনব্যবস্থা বা সিস্টেম লাগবেই।
সেটা দুই ধরণের হতে পারে। ক. আল্লাহর দেয়া। খ. মানুষের নিজেদের তৈরি করা। কোনটা সে গ্রহণ করবে এ স্বাধীনতা মানুষকে দেয়া হয়েছে। এর উপরেই তার শাস্তি ও পুরস্কার নিহিত। আল্লাহর বক্তব্য হলো তোমাদের সীমিত জ্ঞানে (সুরা বনী ইসরাইল ৮৫) তোমরা যে দ্বীন রচনা করেছ তা তোমাদের শান্তি দিতে পারবে না। আমি আমার নবী-রসুলের মাধ্যমে যে পথ নির্দেশনা, হেদায়াহ পাঠিয়েছি তাই তোমাদের শান্তি দিতে পারবে। যারা এর অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিতও হবে না (সুরা বাকারা ৩৮)। এ জন্যই এই দীনের নাম ইসলাম। আক্ষরিক অর্থেই শান্তি।
এখন সমগ্র মানবজাতির কথা বাদই দিলাম, যে মুসলমান জাতির উপর দায়িত্ব ছিল নিজেরা আল্লাহর দেওয়া দীনের অধীনে বাস করে শান্তিতে থাকবে এবং বাকি মানবজাতিকেও এই শান্তির আস্বাদ দিয়ে নবীর রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালন করবে সেখানে এই মুসলমানরাই আল্লাহর দেওয়া দীনুল হক ত্যাগ করে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের তৈরি করা জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়েছে। পরিণামে দুনিয়াময় অশান্তি।
কেউ হয়তো বলবেন, আমরা তো নামাজ পড়ি, নিখুঁতভাবে অজু করি, কেউ কেউ গভীর রাতে অতি কষ্ট করে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ি, রোজা রাখি, হজ্ব¡ করি, কোরআন খতম করি। আমরা বলি, হ্যাঁ তা করছেন। কিছু আমল করছেন। কিন্তু ইসলাম তো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সেখানে ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি সর্ব অঙ্গনের বিধানই রয়েছে। সেগুলো কি মানা হচ্ছে? সার্বভৌমত্ব বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা কি আল্লাহকে মানতে পারছেন? সেখানে মানতে হচ্ছে ইহুদি-খ্রিষ্টান দের সার্বভৌমত্ব ও তাদের তৈরি অর্থব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি সবকিছু।
আল্লাহর বিধানের আংশিক মানা আর আংশিক প্রত্যাখ্যান করা কি শেরক নয়? আল্লাহ বলেন, “তবে কি তোমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছ যে আল্লাহ কেতাবের আংশিক মান্য করবে আর আংশিক প্রত্যাখ্যান করবে? এমন যারা করবে তাদের শাস্তি তো পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা আর আখেরাতে তাদেরকে ভয়াবহ শাস্তির দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হবে।” (সুরা বাকারা ৮৫)। লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.