লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটকের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। ৩ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার ভোরে পরিচালিত এই অভিযানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ‘সাফল্যজনক’ দাবি করলেও, বিশ্লেষকরা একে দেখছেন ৩৬ বছর আগে পানামায় চালানো মার্কিন আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হিসেবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো হঠাৎ কেন ভেনেজুয়েলায় সরাসরি সামরিক হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র? এর পেছনে কি শুধুই ‘মাদকবিরোধী’ অভিযান, নাকি লুকিয়ে আছে গভীর কোনো ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ?
বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পেছনে ৫টি প্রধান কারণ উঠে এসেছে:
১. ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসের অভিযোগ: যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার প্রধান ‘আইনি’ ভিত্তি হলো নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ।
প্রেক্ষাপট: ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ) মাদুরো এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসের অভিযোগ আনে। তখন তার সন্ধান বা গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য ১৫ মিলিয়ন (দেড় কোটি) ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
বর্তমান পদক্ষেপ: যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, মাদুরো কার্তেল অফ দ্য সানস (Cartel of the Suns) নামক একটি মাদক চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচার করে। ট্রাম্প প্রশাসন এই অভিযানকে কোনো ‘যুদ্ধ’ হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অপরাধীকে গ্রেপ্তারের জন্য ‘আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ হিসেবে চিত্রিত করছে।
২. বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ নিয়ন্ত্রণ: ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘জ্বালানি তেল’।
তেলের রাজনীতি: ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ রয়েছে (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল)। মাদুরো সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার কারণে দীর্ঘদীন ধরে মার্কিন কোম্পানিগুলো এই তেল সম্পদ থেকে দূরে ছিল।
মাদুরোর অভিযোগ: হামলার আগেই মাদুরো বারবার বলে আসছিলেন, ওয়াশিংটন গণতন্ত্র চায় না, তারা চায় ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘বাড়ির পাশে’ তেলের নিরাপদ উৎস নিশ্চিত করতে মরিয়া ছিল।
৩. রাশিয়া ও ইরানের প্রভাব খর্ব করা: ভেনেজুয়েলা ছিল লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান শত্রু রাশিয়া ও ইরানের সবচেয়ে বড় মিত্র।
ভূ-রাজনীতি: মাদুরো সরকারের আমলে ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির (মনরো ডকট্রিন) জন্য এটিকে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কৌশলগত অবস্থান: ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে রাশিয়ার ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তখন ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়া মানে লাতিন আমেরিকা থেকে মস্কো ও তেহরানের শক্ত ঘাঁটি উপড়ে ফেলা। হামলার পর রাশিয়া ও ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া এই সমীকরণকেই নির্দেশ করে।
৪. ১৯৮৯ সালের ‘পানামা মডেল’ অনুসরণ: রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই হামলার সঙ্গে ১৯৮৯ সালে পানামায় মার্কিন আগ্রাসনের হুবহু মিল পাচ্ছেন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: সে সময় পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে মাদক পাচারের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করতে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ চালিয়েছিল। নরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিচার করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের কৌশল: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোর ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ করেছেন। মাদুরোকে ‘স্বৈরশাসক’ ও ‘মাদক কারবারি’ তকমা দিয়ে সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
৫. অভিবাসন সংকট ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ভেনেজুয়েলা ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ।
মাইগ্রেশন: গত এক দশকে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ধসের কারণে লাখ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে, যা মার্কিন সীমান্তে সংকট তৈরি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, মাদুরোকে সরিয়ে একটি মার্কিন-পন্থী সরকার বসালে দেশটি স্থিতিশীল হবে এবং অভিবাসন স্রোত কমবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী এই হামলা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ এবং ‘মাদক নির্মূলের’ জন্য করা হলেও, এর গভীরে রয়েছে তেলের নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল। রাশিয়া ও চীন-সমর্থিত মাদুরো সরকারকে উৎখাত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার বার্তা দিল। তবে এই আগ্রাসন দীর্ঘমেয়াদে ভেনেজুয়েলায় গৃহযুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংঘাতের জন্ম দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।