আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা.
আতাহার হোসাইন:
মানব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব শেষ রসুল মোহাম্মদ (দ:)। তাঁর আবির্ভাব হয়েছে শতধাবিচ্ছিন্ন মানবজাতিকে একটি জাতিতে পরিণত করার জন্য এবং পৃথিবীর বুক থেকে সকল প্রকার জীবনব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে আল্লাহর দেওয়া শেষ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য (সুরা তওবাহ ৩৩, ফাতাহ ২৮, সফ ৯)। এ লক্ষ্যেই তিনি জন্ম দিয়েছেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে বড় বিপ্লবের। তাঁর পরবর্তী পৃথিবীতে যত বিপ্লবের জন্ম হবে তার সমস্ত উপাদান নিহিত আছে রসুলাল্লাহর পবিত্র ৬৩ বছরের জীবনে। শূন্য থেকে শুরু করে তদানীন্তন অর্ধ পৃথিবীকে এবং সেখানকার মানুষের হৃদয়কে ছেয়ে দেওয়ার মত বিপ্লব সৃষ্টির দৃষ্টান্ত তিনি মানবজাতির সামনে পেশ করেছেন। যে কোন প্রতিকূলতার মধ্যে অনড়, অটল থেকে সাফল্য ছিনিয়ে আনার শিক্ষা আমরা লাভ করি তাঁর পবিত্র জীবনী থেকেই। আজ সেই মহামানবের পবিত্র জন্ম ও ওফাত দিবস। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে আরবি ১২ রবিউল আউয়াল তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক একাদশ হিজরী সালের এই দিনে ওফাত গ্রহণ করেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট এই মহামানব একাধারে জাগতিক জীবনে যেমন সফল ছিলেন তেমনি আধ্যাÍিক জগতেও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে স্বীকৃত। সকল নবী-রসুলদের তিনি নেতা। বহু নবী তাঁর একজন উম্মাহ হবার জন্য আকুলতা ব্যক্ত করতেন। ঈসা (আ:) কামনা করতেন তিনি যেন শেষ রসুলের জুতোর ফিতা বাঁধার যোগ্য হতে পারেন (The Gospel of Barnabas, Chapter 44)। হাশরের দিনে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সমস্ত মানবজাতির গোনাহের ব্যাপারে সুপারিশ করার অধিকার রাখবেন। রসুলাল্লাহর সম্মান যে শুধু তাঁর উম্মাহর মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাই নয়। সত্য স্বীকার করতে যাদের সাহস আছে সেসব ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকেই অকপট বাক্যে একথা স্বীকার করেছেন যে, তিনিই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোৎকৃষ্ট মানব। ফরাসী ইতিহাসবেত্তা লা মার্টিন লিখেছেন- “দার্শনিক, বাগ্মী, নবী, আইন প্রণেতা, যোদ্ধা, ধারণাকে জয় ও প্রতিষ্ঠাকারী, বিচারবুদ্ধিসহ বিশ্বাসকে পুনর্জীবনদানকারী, মূর্তিহীন ধর্মের পুনঃপ্রবর্তক, বিশটি জাগতিক সাম্রাজ্যের ও একটি আধ্যাÍিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা-এই হোচ্ছেন মোহাম্মদ (দ:)। মানবীয় মহত্ব ও বিরাটত্ব মাপার যতগুলি মাপকাঠি আছে সেসবগুলি দিয়ে মাপলে আমরা প্রশ্ন কোরতে পারি- তাঁর চেয়ে বড়, মহীয়ান আর কোন মানুষ আছে?”(Historz of Turks)। আমেরিকান জ্যোতির্বেত্তা, ইতিহাসবেত্তা ও গণিতশাস্ত্রবিদ মাইকেল হার্ট তার The 100 বইয়ে আদম (আঃ) থেকে বর্তমান পর্যন্ত একশ’ জন মানুষের তালিকা কোরেছেন যারা মানবজতির ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার কোরেছেন। তাতে সর্বপ্রথম নাম মোহাম্মদ (দঃ)। বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “মোহাম্মদকে (দঃ) এক নম্বর করায় অনেকেই পছন্দ কোরবেন না, কিন্তু সত্যের খাতিরে আমাকে তা কোরতে হোয়েছে।”
অপরদিকে রসুলাল্লাহ সম্বন্ধে অস্তিত্বগতভাবেই যাদের ঘৃণা আছে, যারা রসুলের পবিত্র জীবনীকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছেন তাদের সকল কর্মকাণ্ড ইতিহাসে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের হীনতা এবং দীনতাই ফুটে উঠেছে। ১৪ শতাধিক বছর আগের একজন ব্যক্তির প্রতি আজও প্রায় ২০০ কোটি মানুষ সশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করে। শুধু স্মরণের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ নেই। এই ব্যক্তিত্বের প্রতি কেউ কোন দোষারোপ করলে এখনও কোটি কোটি মানুষ তাঁকে অসম্মানের পরিবর্তে নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত আছে, যেমনটা ছিল ১৪০০ বছর আগে। প্রশ্ন হচ্ছে এত দীর্ঘ সময় পরেও কেন এই মহামানবের প্রতি এত শ্রদ্ধা, এত ভালোবাসা? যদি তিনি তেমন যোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ না হতেন তাহলে কী তা সম্ভব হতো? না, মোটেই নয়। তাঁর আগে ও পরে আরো অনেক মানুষ পৃথিবীতে এসেছেন। কিন্তু কাউকে তাঁর মত সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করা হয় না। তাঁর সম্মান রক্ষার্থে যেমন পার্থিব সবকিছুকে কোরবান করে দেয় তেমনটা আর কারো জন্য মানুষ করে না।
আজ পৃথিবীতে মুসলমানগণ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তারা আজ ধর্মীয়ভাবে বহু ফেরকা, মাজহাব, দল উপদলে, আধ্যাÍিকভাবে বহু তরিকায়, ভৌগোলিকভাবে প্রায় ৫৫টিরও বেশি রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে গেছে। আর রাজনৈতিকভাবে ঠিক কতভাগে ভাগ হয়েছে তার কোন গোনাগাথা নেই। তথাপি জাতির এই ক্রান্তিকালে কাউকে যদি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য ডাক দিতে হয় তাহলে সেই নেতার নাম করে, ঐ মহামানবকে আদর্শ মেনেই ডাক দিতে হবে।
রসুলাল্লাহ যখন স্রষ্টার দেওয়া দীনকে প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করতে অগ্রসর হন, তখন তিনি পতিত হন চরম প্রতিকূলতায়। আরবের মানুষ তখন তাদের জীবন থেকে আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ বাদ দিয়ে বিভিন্ন দেব-দেবীর পুরোহিতদের কথায় তাদের সামগ্রীক জীবন পরিচালনা করতো। বাকি পৃথিবীর অবস্থাও ছিল তথৈবচ। কিন্তু তিনি যখন এসব বিধানের অসারতা তুলে ধরে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ঘোষণা দিতে লাগলেন তখন ঐ সময়ের পুরোহিত গোষ্ঠীটি তাঁর প্রচণ্ড বিরোধিতা শুরু করে। গুটিকয় লোক ছাড়া তাঁর সাথে কেউই ঐক্যবদ্ধ হয় নি। ১৩ বছর পর মদীনার কিছু মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দেন এবং তাঁকে মদীনায় হেজরত করার আহ্বান জানান। রসুলাল্লাহ তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে মদীনায় চলে যান। মদীনার মানুষ তাঁকে নিজেদের পরিবার-পরিজনের মত নিরাপত্তা প্রদানের অঙ্গীকার দিয়ে তাঁকে আপন করে নেয়। তিনি মদীনার আউস-খাজরাজ পর¯পরে সদা যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত দু’টি গোত্রকে একটি ভ্রাতৃত্বে এনে দেন। ফলে মদীনা হয়েউঠে একটি শক্তিশালী শহর। এরপর তিনি জাতিটিকে সামরিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে তুলতে লাগলেন, তাদের দীক্ষিত করলেন আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ববিজয়ের মন্ত্রে, শেখালেন আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সর্বস্ব কোরবানী করতে। তিনি তাঁর উম্মাহকে একটি দুর্ধর্ষ ও অকুতোভয় যোদ্ধা জাতি হিসেবে গড়ে তুললেন। মাত্র ১০ বছরের মধ্যে তিনি ছোটবড় ১০৭টি যুদ্ধ ও সমরাভিযানের মাধ্যমে তৎকালীন আরব উপদ্বীপকে আল্লাহর দীনের অধীনে নিয়ে আসেন। তাঁর ওফাতের পর তাঁর আসহবাগণ পরবর্তীতে মাত্র ৬০/৭০ বছরের মধ্যে বাকী দুনিয়ার অর্ধেক স্থানে এই দীনকে প্রতিষ্ঠা করেন। তারা মাত্র ২৮ বছরের মধ্যে তৎকালীন পৃথিবীর দুইটি পরাশক্তি রোমান এবং পারস্য সাম্রাজ্যকে একই সাথে তছনছ করে দেয়।
রসুলাল্লাহর পবিত্র জন্ম ও ওফাত দিবস উপলক্ষে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁর উম্মাহর দাবিদাররা আজ সেই মহামানবকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করবেন। পালিত হবে নানা ধরনের আয়োজন। এই জাতিটি এখন সংখ্যায় প্রায় ১৬০ কোটি হলেও, পৃথিবীর এক বৃহৎ অংশের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তারা রসুলাল্লাহর প্রকৃত শিক্ষা হারিয়ে ফেলার কারণে নিজেদের অতীত সম্মান হারিয়ে ফেলেছে। তারা এখন সর্বত্র লাঞ্ছিত, অপমানিত, ধিকৃত, নির্যাতিত, শোষিত, অবদমিত, ঘৃণিত। এই অবস্থার উত্তরণ হবে কিভাবে?
হ্যাঁ, এ জাতির জন্য আশার কথা এই যে, এই জাতি আবার তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে। কেননা তিনি বলেছেন, “সুসংবাদ দাও সুসংবাদ দাও, আমার উম্মাহর উদাহরণ এমন এক বৃষ্টির মত, যার প্রথম ভালো নাকি শেষ ভালো বলা মুশকিল। সে জাতি কেমন কোরে ধ্বংস হবে যার প্রথমে আমি, মধ্যে মাহদী এবং শেষে ঈসা। কিন্তু এর মাঝে আছে বিভ্রান্তরা। তারা আমার কেঊ নয় আমিও তাদের কেউ নই” (আনাস (রা:) থেকে তিরমিযি; জাফর (রা:) থেকে রাযিন)। কালনিদ্রায় মগ্ন এ জাতির আবার জেগে উঠার কিছু লক্ষণ বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে। রসুলের আদর্শে গড়া এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর অনুসারী একদল মানুষ তাদের সবকিছুকে কোরবান করতে বেরিয়ে পড়েছে। তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর রাজী ও খুশি। যারাই আজ নিজেদেরকে উম্মতে মোহাম্মদী হিসাবে পরিচয় দেন তাদের উচিৎ রসুলাল্লাহ যে দায়িত্ব তাঁর উম্মাহর উপর অর্পণ করে গেছেন অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যদীনকে বিজয়ী করা, সেই কাজে নিজেদেরকে ব্রতী করা। এনশা’আল্লাহ অচিরেই সত্যদীন সারা পৃথিবীকে আলোকিত করে তুলবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহান কাজে অংশগ্রহণ করার তওফিক দান করুন। আমীন।



