আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝলাম বিশ্বশান্তির জন্য দরকার সিস্টেমের পরিবর্তন
ইলিয়াস আহমেদ যেখানেই একাধিক প্রাণের অস্তিত্ব সেখানেই প্রতিযোগিতা থাকবে। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে সেই প্রতিযোগিতার একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকবে; যা হবে ভারসাম্যপূর্ণ। যতদিন প্রতিযোগিতা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকবে ততদিন ঐ সিস্টেম তৈরির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে ঠিকঠাক। জয় হবে সত্যের। ভারসাম্য ও সীমার লঙ্ঘন হলেই এর স্বরূপে পরিবর্তন ঘটবে। যেটা সম্পূর্ণ সিস্টেমটাকেই প্রথমে জটিল থেকে জটিলতর দিকে নিয়ে যাবে এবং পরবর্তীতে ধ্বংস করে দেবে চিরদিনের জন্য। যখনই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে সিস্টেম, তখনই সিস্টেমের মহানিয়ন্ত্রক সেই বিকৃত সিস্টেমটাকে সংশোধনের জন্য অভিযোজন ঘটান। এরই উপর চলছে মহাবিশ্ব। এই আমরা দেখে আসছি পৃথিবীর প্রকৃতিতে। এখানে আছে খাদ্যচক্র, পানি চক্র, নাইট্রোজেন চক্র, অক্সিজেন চক্র, জীবন চক্র, খাদ্যের পিরামিড, শক্তির পিরামিড, পুষ্টির পিরামিড ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো প্রত্যেকটাই এক একটা মিনি সিস্টেম। এই মিনি সিস্টেমগুলো মিলেই আরেক বড় সিস্টেমের সৃষ্টি করে। মাল্টিসিস্টেমের প্রতিটাই মানুষ নামের একটা প্রাণাধিকারীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেহেতু মানুষ নিজেই এর একটি উপাদান। কিন্তু উন্নত মস্তিষ্কই মানুষকে এনে দিয়েছে সৃষ্টির সেরা জীবের পদবী, সৃজনশীলতা আর উচ্চ বুদ্ধিমত্তা দ্বারাই পৃথিবীর তাবৎ কিছুকেই দাস বানিয়ে নিজের কাজে ব্যবহার করছে এই মানুষ নামের প্রাণিটি। আর এ কারণেই মানুষ হয়েছে পুরো সিস্টেমের প্রধান ও একমাত্র নিয়ামক। আর সে কারণেই পুরো সিস্টেমের ভালোমন্দ নির্ভর করছে মানুষের উপর। তাই চলুন লক্ষ্য করি বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির দিকে। মানুষ যে সিস্টেমে চলছে, তা কি নির্ভুল? আজকের দুনিয়ায় বিজ্ঞান মহলে প্রধান আলোচনার বিষয় বিশ্বমানবতা ও পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এগুলোর কোনো সুরাহাই করতে পারছে না বিজ্ঞানীমহল। একদিকে ধ্বংসময় যজ্ঞের আয়োজন করেছে ইহুদি-খ্রিষ্টান যান্ত্রিক সভ্যতা দাজ্জাল। পারমাণবিক-রাসায়নিকসহ অন্যান্য উন্নতপ্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে আজকের পৃথিবী। এগুলো এ কারণে তৈরি করা হয় নি যে এলিয়েনেরা আমাদের পৃথিবীকে আক্রমণ করলে আমরা তাদেরকে প্রতিহত করব। বরং তৈরি করা হয়েছে নাগাসাকি ও হিরোশিমার মতো ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য, সিরিয়ার উপর রাসায়নিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য, নারী-শিশু-বৃদ্ধদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করার জন্য। যার কারণে বিশ্বে আজ কোথাও শান্তি নেই। শান্তি চাই! শান্তি চাই! স্লোগানে গলা ভাঙাই সার হয়। আর অন্যদিকে পৃথিবীর মানুষেরাই ডেকে আনছে পৃথিবীর মৃত্যু। করে তুলছে বসবাসের অযোগ্য। ঘনঘন জলবায়ুর পরিবর্তন, বিশ্ব উষ্ণায়ন, ওজোনস্তরের ক্ষয়, মরু প্রবণতা, বন উজাড়করণ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিলুপ্তির মাধ্যমে ইকোসিস্টেমের ধ্বংসকরণ, বায়ু-পানি-মাটি ইত্যাদি দূষণ- এরকম আরো অসংখ্য মহাসমস্যা পৃথিবীকে দিনে দিনে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।
পারমাণবিক-রাসায়নিকসহ অন্যান্য উন্নতপ্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে আজকের পৃথিবী। এগুলো এ কারণে তৈরি করা হয় নি যে, এলিয়েনেরা আমাদের পৃথিবীকে আক্রমণ করলে আমরা তাদেরকে প্রতিহত করব। বরং তৈরি করা হয়েছে নাগাসাকি ও হিরোশিমার মতো ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য, সিরিয়ার উপর রাসায়নিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য, নারী-শিশু-বৃদ্ধদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করার জন্য। যার কারণে বিশ্বে আজ কোথাও শান্তি নেই।
সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক-জাতীয়-স্থানীয়ভাবে অসংখ্য সংস্থা গড়ে তুলা হয়েছে। OPCW (Organisation for the Prohibition of Chemical Weapons পারছে না রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণে প্রবল ভূমিকা রাখতে, UNODC (United Nations Office on Drugs and Crime) পারছে না যথার্থভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ নিরোধ করতে, ILO (International Labour Organization) পারছে না শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী পারছে না দুর্বল রাষ্ট্রের উপর সবল রাষ্ট্রের আক্রমণকে প্রতিহত করতে, পরিবেশবাদী সংস্থা পারছে না বিশ্ব পরিবেশকে রক্ষা করতে, অপরাধ দমন সংস্থা পারছে না বিশ্বব্যাপী অপরাধ দমন করতে, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদকে দমন করতে পারছে না খোদ পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি পারছে না পারমাণবিক অস্ত্রের ঘোড়ার লাগামহীন দৌরাত্মকে দমাতে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো পারছে না বিশ্বমানবতা প্রতিষ্ঠা করতে। এভাবেই চলছে পৃথিবী, নিত্যনতুন অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি নীতির উদ্ভাবনের পরেও উন্নতির ফলাফল শূন্য কিংবা ঋণাত্মক। আংশিক বা ক্ষুদ্র সাফল্য বা প্রযুক্তিগত উন্নতি করেই ভাবছি এই তো উন্নতি! কিন্তু দিনে দিনে পৃথিবীর এনট্রপি বা বিশৃংখলার দিকে লক্ষ্য করলেই চোখমুখ শুকিয়ে যায়। তাই ভাবতেও চাই না। অথচ আমরাই বিশ্বশান্তি দাবি করি। এনট্রপির দিকে লক্ষ্য করলে এটা বোঝা যায়, যে মূল সিস্টেম তারই নিকটস্থ ও আন্তঃসম্পর্কীয় সিস্টেমকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, সে সিস্টেমে ত্রুটি আছে। অর্থাৎ এ পর্যন্ত এসে যা বুঝতে পারলাম মূল সিস্টেম ঠিক থাকলে তাবৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই মূল সিস্টেমটাকে আমরা মানুষ নিজেই মূল সিস্টেমের উপাদান হয়ে কিভাবে পরিবর্তন করব? এ এক কঠিন ব্যাপার, যদি না আমরা নিজেদের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের দিকে লক্ষ্য করি। আশ্চর্য হলেন তো! প্রথম দিকে একটা কথা বলেছিলাম যে, এই মূল সিস্টেমের প্রধাণ নিয়ামক হলো মানুষ নিজেই। প্রশ্ন হতেই পারে কিভাবে? মানুষ যা করছে তা কি পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ছে না? আজকের বিজ্ঞানমহলেই প্রমাণ করেছে ইকোসিস্টেম বিপর্যয়, ওজোনস্তরের ক্ষতি, বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ুর পরিবর্তন, মরুপ্রবণতা ইত্যাদিতে মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। এটা প্রায় সবারই জানা। এর পরের প্রশ্নটি করতে পারেন যে মানুষের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি তথা জীবনব্যবস্থা কিভাবে মূল সিস্টেমে প্রভাব ফেলতে পারে? যে জীবনব্যবস্থা যত সহজ ও নিখুঁত সে জীবন ব্যবস্থা ততটাই সরল ও শান্তিময়। সমাজতন্ত্রে জীবনের যে ব্যয়ভার গণতন্ত্রে জীবনের ব্যয়ভার কিন্তু সে রকম না। জীবনের ব্যয়ভারের উপর নির্ভর করে পরিবেশ ব্যবস্থা। দিনে দিনে মানুষের ব্যয়ভার বেড়েই চলেছে। ধনতান্ত্রিকতার ফলে মানুষের ভোগ বিলাসিতা, চাহিদা বাড়ছেই; কমছে না। অসীম ভোগ বিলাসিতা ও পুঁজিবাদী চাহিদা পূরণে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে কলকারখানা, ফ্যাক্টরী, বিলাসবহুল বাড়িঘর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ইকোসিস্টেমের উপাদানে পড়ছে অতিরিক্ত চাপ, যার কারণে মূল সিস্টেমে দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা। এ পর্যন্ত এসে এতটুকুন বুঝতে পারলাম:- প্রথমত: মানুষ নিজে যে জীবনব্যবস্থা এর মধ্যে থাকবে, তার উপর নির্ভর করবে মূল সিস্টেমের ভালো খারাপ থাকা। যেহেতু মানব জীবন ব্যবস্থা অর্থাৎ সিস্টেম অফ লাইফের গুরুত্ব সামগ্রিক সিস্টেমের মূল সিস্টেমের চেয়েও বেশি, সেহেতু জীবনব্যবস্থাকে নাম দিলাম Super System. দ্বিতীয়ত: বর্তমানে মানুষ যে জীবনব্যবস্থায় (মানবরচিত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদি তন্ত্র) আছে সেটা অবশ্যই ভুলে ভরা। যদি তা না-ই হতো, তাহলে তো আমরা আজকে পৃথিবীর এই ভয়াল রূপ দেখতে পেতাম না! সিদ্ধান্ত পর্ব: যেহেতু সামগ্রিক সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত জীবনব্যবস্থার মতো অসংখ্য সিস্টেম রয়েছে যেগুলো মূলত জীবনব্যবস্থা দ্বারাই আন্তঃসম্পর্কীয় এবং প্রভাবিত। আবার মূল সিস্টেমের একজন মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন সেহেতু জীবনব্যবস্থাকে হতে হবে মহানিয়ন্ত্রক কর্তৃক রচিত; মানবরচিত নয়। মানবরচিত সিস্টেম চরম সূক্ষ্ম নয়, কেননা মানুষ সিস্টেমের একটা উপাদান মাত্র, যদিও সে সমগ্র উপাদানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। সিস্টেমের বাইরে নয় বলেই সে সিস্টেমের কার্যনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত নয়। অপরপক্ষে মূল সিস্টেমের মহানিয়ন্ত্রক সিস্টেমের স্রষ্টা এবং ঐ সিস্টেমের বাইরে বলেই তিনি ঐ সিস্টেমের কার্যনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত। উদাহরণ দিলে বলতে পারি, কম্পিউটার সিস্টেমে সিস্টেম সফটওয়ার ও অ্যাপ্লিকশন সফটওয়ার নামে দু’ ধরণের সফটওয়্যার থাকে। প্রথমটি উচ্চ পর্যায়ের বলে, দ্বিতীয়টির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবার সিস্টেম সফটওয়্যার যেহেতু সফটওয়্যারের অন্তর্গত সেহেতু সে নিজের জন্য প্রোগ্রামারের (ঐ সিস্টেমের স্রষ্টা) তৈরি প্রোগ্রামের চেয়ে উন্নত প্রোগ্রাম লিখতে পারে না। কিন্তু প্রোগ্রামার পারে এ কারণেই যে, সে ঐ কম্পিউটার সিস্টেমের বাইরে এবং তার স্রষ্টা। উদাহরণ পর্ব শেষে, আমি এ পর্যন্ত আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝলাম আমরা মানুষ বিশ্বশান্তির জন্য যতই চেঁচামেচি করি না কেন, যতদিন না আমাদের স্বরচিত Super System জীবনব্যবস্থা ত্যাগ করে মহানিয়ন্ত্রক স্রষ্টার দেওয়া System of Life গ্রহণ করব, ততদিন পর্যন্ত আমরা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবো না। পৃথিবীর মৃত্যু ঠেকাতে পারবো না। এখন আমাদের সামনে দু’টো ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা অথবা ধ্বংস। লেখক: শিক্ষার্থী, বি.এসসি, কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।



