বলিউডে ‘কুইন’ এখন একজনই
কে ফর কঙ্গনা৷ কিউ ফর ‘কুইন’! অধুনা বলিউডের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রযোজকের কাছে তিনি লক্ষীমন্ত৷ তিনিই রানী৷ কেউ মাথা ঝুঁকিয়ে মেনে নিচ্ছেন৷ আবার কেউ মানছেনও না৷ অবশ্য কঙ্গনা নিজে তার কেরিয়রকে স্পষ্ট করেই দুটো ভাগে ভাগ করছেন৷ বিফোর ‘কুইন’- বি কিউ৷ আফটার ‘কুইন’- এ কিউ৷ অন্য কেউ তর্ক জুড়তেই পারেন কঙ্গনা রানাউত ঠিক কতটা ভালো অভিনেত্রী তা নিয়ে৷ তবে, স্বয়ং কঙ্গনার নিজের উপলব্ধি যে, ওই একটা ছবিই আদ্যন্ত বদলে দিয়েছে তার কেরিয়রকে৷
স্বভাবতই ‘কুইন’-কে নিয়ে বলিউডের সাড়াজাগানো এই নায়িকার আবেগের শেষ নেই৷ সেই ছবির প্রসঙ্গ উঠলেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীমায় তাই কঙ্গনা বলে দিলেন,‘আমার মুখের সামনে থেকে সমস্ত দরজাই হাট করে খুলে দিয়েছে ওই একটা ছবি৷ আগে যারা আমার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখাত না তারাই কেমন করে যেন রাতারাতি পিছনে পিছনে ঘুরতে শুরু করেছে! এটুকু বলতে তাই কোনো দ্বিধা নেই যে, ‘কুইনের’ আগে আমার কেরিয়রটা যে খাতে বইছিল ছবিটা রিলিজের পর আচমকাই বদলে ফেলেছে তার গতিমুখ!’
বলাই বাহুল্য, ‘কুইন’ রিলিজের পর গোটা বলিউডি মহল্লায় তাকে নিয়ে তুমুল শোরগোলও শুরু হয়েছে৷ এমনকী, সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন কঙ্গনা৷ পর্দায় তার ঝলমলে পারফরমেন্সই শুধু নয়, যেভাবে গোটা ছবিটিকে নিজের কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কঙ্গনা তাতে করে জন্ম নিয়েছিল নতুন আলোচনারও৷ হিন্দি ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রিতে খান ত্রয়ী ছাড়া আর কেই বা এমন করে জোয়াল টানতে পারেন? ‘কুইন’-এর কঙ্গনা সবর্বার্থেই একমেবাদ্বিতীয়ম! যারা বলেছিলেন, এই ছবির সাফল্য একেবারেই ‘ফ্ল্যাশ ইন দ্য প্যান’ এদ্দিনে মোক্ষম জবাব পেয়ে গিয়েছেন তারাও৷
চলতি বছরেই মুক্তি পেয়েছে ‘তনু ওয়েডস মনু ২’৷ এবং এ ছবিও এক্কেবারে যাকে বলে মারকাটারি হিট! বলিউডি ছবির আগের সমস্ত রেকর্ড চূর্ণ করে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকার ব্যবসা করেছে৷ বলা হচ্ছে, নায়িকা প্রধান কোনও হিন্দি ছবি এর আগে কোনওদিন এত বিপুল অর্থ প্রযোজকের ঘরে ফেরত দিতে পারেনি৷ অবধারিতভাবেই কঙ্গনা হলেন আরব সাগরের কোল ঘেঁষা রূপকথা শহরের ‘টোস্ট অব দ্য টাউন’! সংক্ষিপ্ত কেরিয়রে সাফল্য-ব্যর্থতার দুটো পিঠই দেখেছেন৷ আলোর নীচে এসে নিজেকে ধুইয়ে দেওয়ার অনুভূতিটা ঠিক কীরকম তা যেমন জানেন, ঠিক তেমনই কঙ্গনার এটাও ভালো করেই জানা অন্ধকারের নিকষ কালো প্রচ্ছায়া সময়ে সময়ে কী ভীষনই অসহনীয়৷ জীবনের চড়াই-উতরাইকে পাশ কাটিয়ে কঙ্গনা আজকের জায়গায় এসে নিজেকে যেবাবে আবিস্কার করছেন তাতে তিনি তৃপ্ত৷ তবে, এই ‘ফিল গুড’ ফ্যাক্টরটা যেন তাকে ভাসিয়ে নিয়ে না যায়, সে ব্যাপারেও বেশ সচেতন কঙ্গনা৷ হয়ত সেজন্যই জানাতে ভুলছেন না পা মাটিতে দিয়েই রেখেছেন৷
ওর কথায়,‘ আপনি যখন সাফল্যের মুখ দেখলে লোকজনও ঠিক আপনার চারপাশে ভীড় করবে৷ আপনার সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলবে৷ তখন কিন্তু জীবনটাকে অনেক সহজ মনে হতেই পারে৷ তবে, ঠিক এখানেই আপনি অগ্নিপরীক্ষার মুখে৷ যদি এটাকেই জীবনের অনির্বার্য পরিণতি বলে ধরে নেন তাহলেই মুশকিল৷ কেরিয়রে যখন মন্দা চলছিল, দেখেছি কীভাবে সবকিছুই ওলোট-পালোট হয়ে পড়ছিল৷ ঠিক কী যে করব, কোন পথে এগোব কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না৷ জমাট অন্ধকার যেন গ্রাস করছিল ক্রমশ৷ যে স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে পড়েছিলাম, তা যেন আবছা হয়ে যাচ্ছিল চোখের সামনে৷ একটা সময় মাথার ওপর ছাদ বলে কিছু ছিল না৷ জীবনে ঠিক করব, কী করতে যাচ্ছি সেই চাঁদমারিগুলোই যেন হারিয় যেতে বসেছিল!’
বোঝাই যাচ্ছে, কতটা লড়াই করে আজকের জায়গায় এসে পৌঁছেছেন ‘দ্য কুইন’! প্রতিকুলতার নিরন্তর ঘষটানি গায়ে আঁচড় ফেলেছে, দমে যাননি কঙ্গনা৷ লড়াইয়ের কাঁটা বিছনো রাস্তা রক্তাক্ত করে তুলেছে, তবুও থেমে থাকেননি কঙ্গনা৷ আলোর প্রান্তরে আজকের এই দাঁড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে কত যে কৃচ্ছসাধন আর বুকচাপা কান্না! জানতে দেননি কঙ্গনা৷ কিন্তু, আজকের তিনি আর সবকিছু চেপে রাখতে চান না৷ এতদিনকার চোয়ালচাপা লড়াইয়ের আখ্যান যদি বা গোটা দুনিয়ার কাছে রাষ্ট্র হয়েই পড়ে তাতে কার কী এসে গেল ভ্রুক্ষেপ নেই সে ব্যাপারেও৷ ঘটনা এটাই যে, তিনি নিজে অন্তত একটু নির্ভার হলেন!
হারিয়ে যেতে বসা গড়পড়তা অভিনেত্রী থেকে বলিউডের সবচেয়ে মহার্ঘ্য নায়িকা৷ বলা যেতেই পারে একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন কঙ্গনা৷ করিনা, দীপিকা, সোনম কাপুরদের কেউ নন, মুম্বাই নগরীতে তুমুল জল্পনা অধুনা হিন্দি ছবির তাবড় প্রযোজকদের নয়নের মণি তিনিই৷ টাকার থলি হাতে তার বাড়ির সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে৷ শোনা যায়, সবচেয়ে বেশি অঙ্কের চেক ইস্যু হচ্ছে কঙ্গনার নামেই৷ এবং, এ ব্যাপারে ‘হিরোইন নাম্বার ওয়ান’কে প্রশ্ন করে দেখলেই বোঝা যায় মাথায়ই আনতে চান না এমন প্রসঙ্গ৷ সব ব্যাপারেই নিজের মতামত জানাতে অকপট এবং খুল্লামখুল্লা৷ বিতর্ক হবে জানেন, কিন্তু তার নাম কঙ্গনা রানাউত৷ বয়েই গিয়েছে এসব নিয়ে ভাবতে৷ বলেই দিলেন,‘বলিউড ইজ সেক্সিট! কেন বলছি শুনুন, এ তল্লাটে যখন কোনো পুরুষ অভিনেতা বিশাল অঙ্কের অর্থ দাবি করেন কেউ প্রশ্ন তোলেন না তো! দায়িত্ব নিয়ে বলছি, হিন্দি ছবির যেকোনো বড়মাপের নায়কের পারিশ্রমিকের দশ শতাংশ অর্থও পান না নায়িকারা৷ এ ব্যাপারে গলা তোলার সময় হয়েছে! কেনই বা তুলব না?’
পাশাপাশি কঙ্গনা আরও একটা ব্যাপারে বেশ ব্যথিত৷ কেবল অভিনয় ছাড়া বলিউডে ফিল্মের অন্য কাজে নিজেদের জড়াতে তেমন আগ্রহী দেখায় না মেয়েদের৷ বলছেন,‘বেশ অবাক করার মতো৷ আচ্ছা, শুধুই বা কেন অভিনয়ে পারদর্শিতা দেখাতে এত আগ্রহী ইন্ড্রষ্ট্রিতে পা রাখা মেয়েরা? ফিল্মে তো কাজের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত৷ স্ক্রিপ্ট তৈরি, এডিটিং, ফোটোগ্রাফি- এসব ব্যাপারেও তো হাত পাকাতেই পারে মেয়েরা! আমার তো মনে হয়, বলিউডে মেয়েদের আরও সম্মান প্রাপ্য৷’
পরপর কয়েকটা হিট৷ জোড়া জাতীয় পুরস্কার৷ ঢালাও প্রশংসা আর নিয়ত জয়ধ্বনি! গত দেড় বছরে বদলে যাওয়া কঙ্গনা রানাউতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে যে এসবগুলোও৷ জানেন এবং আরও ভালো করে অনুভব করেন লক্ষ্যবিচ্যুত হয়ে পড়া কোনও মতেই চলবে না৷ সামান্য পদস্খলনই ফিরিয়ে আনতে পারে অন্ধকারের মারণ হাতছানি! ঠেকে শিখেছেন যেটা বলিউড বড়ই কঠিন ঠাঁই! টানা খানতিনেক ছবি ব্যর্থতার মুখ দেখলেই আলোর মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে হবে তাকে৷ এসবগুলো অনুভব করেন বলেই হয়ত ইদানীংকালে আমূল বদলে গিয়েছে কঙ্গনার জীবনদর্শন৷ তাই বোধহয় এত সহজে বলতে পারছেন কঠোর পরিশ্রম আর সংকল্পবোধের কথা,‘২৫০ কোটি, ৩০০ কোটি- এসব হিসাব নিকাশ আমার মাথায় ঢোকে না৷ ঢোকাতে চাইও না৷ আমার কাছে সহজ হিসেব, প্রযোজকরা বিপুল অর্থ খরচ করেন ছবি বানাতে৷ আখেরে তার টাকাটা যেন উদ্ধার হয়! আমার ছবির পিছনে যিনি টাকা ঢালছেন আমারও কর্তব্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়ে যাওয়া৷ ছবিটাকে হিটের মুখ দেখানো৷ বলিউডে যখন প্রথম এসেছিলাম কেউ বিশেষ পাত্তাও দিত না৷ এড়িয়ে চলত৷ ভারতবর্ষের ছোট্ট এক শহরের মেয়ে হয়ে ইন্ড্রাস্ট্রিতে পা রাখার হ্যাপা যে ঠিক কীরকম মনে হয় না আমার চাইতে ভালো কেউ জানে বলে! ইংরেজিটা একেবারেই জানতাম না৷ প্রথমদিকে মানিয়ে নেওয়াও খুব সমস্যার ছিল৷ তবুও হাল ছাড়িনি৷ লেগে থাকাটাই হয়তো আখেরে আমাকে আলোয় এনে দিয়েছে৷ কঠিনতম সব হার্ডলগুলোকে পেরিয়ে যাওয়াটা সহজ ছিল না৷ তবে, একটা ব্যাপার জানেন তো এই ধরনের প্রতিবন্ধকতাগুলো সামনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালে মানুষের জেদ আর আত্মপ্রত্যয়টাও দ্বিগুন হয়ে যায়৷ আর তখন সেগুলো পেরিয়ে যেতে চেয়ে নতুন করে সংকল্পবদ্ধ হয়ে পড়তে হয়!’
সাম্প্রতিককালের এত খ্যাতি কঙ্গনাকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করে৷ তবে এটুকুই৷ এর বেশি কিছু ভাবতে রাজিই নন৷ বরং, প্রতিনিয়তই চান এমন শক্তপোক্ত মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে তুঙ্গস্পর্শী উচ্চতায় তুলে নিয়ে যেতে৷ যোগ করলেন,‘বছরে মাত্রই তো ৩৬৫ টা দিন! যা করার এর মধ্যেই করতে হবে৷ আমি খুব বেছে বেছে কাজ করার পক্ষপাতী৷ যা হাতে পেলাম হুটহাট সই করে দিলাম, তা নয়৷ যেমন ভেবেই রেখেছি, ‘তনু ওয়েডস মনু ২’ করার পর আর কোনও ছবিতে ডাবল-রোল করতে চাই না৷ লোকে দ্বৈত চরিত্রে আমাকে দেখতে চাইলে ওই ছবিটাই বারবার দেখুক না!’
কঙ্গনার শিকড় হিমাচল প্রদেশের মান্ডিতে৷ মুম্বাইয়ের একটা কাফেতে ইয়ার-দোস্তদের সঙ্গে ‘বিন্দাস’ মুডে আড্ডা মারছিলেন, হঠাৎ করেই নজরে পড়ে যান অনুরাগ বসুর৷ বাঙালি পরিচালক তখন ‘গ্যাংস্টার’ ছবির জন্য আনকোরা মুখ খুঁজছিলেন৷ এভাবেই নজরে পড়া৷ উঠে আসা বলিউডের উঠোনে৷ একইসঙ্গে সেই শুরু তার পাথর ছড়ানো পথে দীর্ঘ অভিযাত্রার! লম্বা যে যাত্রাপথের শেষে নিজেকে এখন কিন্তু সত্যিই নিজেকে তিনি আবিস্কার করছেন আলোর বৃত্তে! আর এই অবস্হান তাকে করে তুলেছে বড্ড একাকী৷ হাতের নাগালে কাউকে পাচ্ছেন না যে! এজন্যই বোধহয় আরও বেশি করে মা-কে মনে পড়ছে কঙ্গনার৷ তার জীবনে ভালোবাসার মানে মা৷ গূঢ় অর্থে জন্মদাত্রীই হলেন ঝলমলে বলি নায়িকার কাছে সেই মানুষ যিনি তাকে শিখিয়েছেন ভালোবাসা বিলোতে হয়, অকৃপনভাবে! নিজেই তাই বলছেন,‘মা না থাকলে এদ্দিনে ভালোবাসার ওপর সমস্ত ভরসা হারিয়ে ফেলতাম!’ সোচ্চারে জনাচ্ছেন এই মূহুর্তে কারোর সঙ্গে প্রেম-ট্রেম করছেন না৷ শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই সত্যি! কঙ্গনার নিজের ব্যখ্যা, ‘এখনও পর্যন্ত খাঁটি ভালোবাসা কাকে বলে আর কেই বা সেই ভালোবাসারজন হদিশ পাইনি! তাই প্রেমটাও জমেনি!’
কঙ্গনার প্রেম জমল না তো কী, কঙ্গনাকে নিয়ে গোটা বলিউডই যে অধুনা প্রেমময়তায় আকুল জানতে বাকি নেই কারোর!



