মধুমতির অব্যাহত ভাংগনে পাল্টে যাচ্ছে নড়াইলের মানচিত্র
নড়াইল জেলা প্রতিনিধি: এইহ্যানে আমার ভিটা ছেলো, ঐ যে যেহানে কাঠি ভাসতিছে ওর পাশে ছিলো গোয়াল ঘরডা, আমাগে রান্নাঘর ছিলো ঠিক তার পূবের পাশে, আর আমার ৩ ছাওয়ালের ভিটা ছেলো ওই পানির পাকের ঠিক মাঝখানে’-বলতে বলতে ছেড়া শাঁড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছেন মাঝ বয়সী শাফিয়া বেগম। বয়স ৫৯/৬০ হবে। নদী তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে বয়স বাড়িয়ে বৃদ্ধায় রূপান্তর করেছে। এখন নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে সারাদিন কি যেন খুঁজতে থাকেন, আর বিড় বিড় করেন। স্বামী ইঞ্জিল মোল্যা ক্ষেতমুজুর, পরের জমিতে কামলা দিয়ে দিন চলে তাদের।
জানা যায় বিস্তারিত উজ্জ্বল রায়ের রিপোটে ২ মেয়ের বিয়ে আগেই দিয়েছেন, ছেলেরা মধুমতির অন্য পাড়ে গোপালগঞ্জ আর ফরিদপুরে পাড়ি জমিয়েছে বেঁচে থাকার তাগিদে। টাকার অভাবে নিজের ভাঙ্গা ঘরের চাল আর খুঁটিগুলো নদীপাড়ে পড়ে আছে, তা দিয়ে কোথায় ঘর তুলবেন তা জানেন না শাফিয়া, এর ওর বাড়ি রাত কাটায় আবার কখনো মধ্য রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে মধুমতির পাড়ে এসে খুঁজে বেড়ান নিজের সেই বসত ভিটা আর শোবার ঘর। রাতে তার ঘুম আসে না, গবাদি পশু আর হাস-মুরগী গুলো না দেখতে পেয়ে। এইতো গত ৩ মাস আগেই তার ঘরবাড়ি বসতভিটা সব গিলে খেয়েছে মধুমতি নদী। ২টি হালের গরু আর ১টি দুধেল গাই বিক্রি করে দিয়েছেন পানির দামে, নিজেদের থাকার জায়গা নেই- তো পশু দিয়ে কি হবে। সারাদিনে আজ আর কোন কাজ নেই সংসার হারানো এই নারীর।
অথচ, কতকিছু ছিলো এক সময়। বলতে বলতে হারিয়ে যান তার যৌবনের কালে। অল্প বয়সে বৌ হয়ে আসেন ঘাঘা গ্রামে। শ্বশুরের ৪ ছেলের একসাথে বিশাল বাড়ি ছিলো তাদের। এক সাথে চাষাবাদ আর গোলায় ধান উঠতো, ধানের সময় এলে ৪ বৌ আর পাশের বাড়ির লোকেরা মিলে একসাথে কাজ করতো। বাড়ির কাজ সেরে আধা মাইল দুরে মধুমতি নদীতে পানি আনতে আর গোসল করতে যেতেন সবাই মিলে। দিনের একমাত্র বিশ্রামের জায়গা ছিলো নদীর ঘাট, কত আপন ছিলো তখন এই মধুমতি নদী। এই গাঙই যে আমাগের সব খেয়ে ফেলবে তাকি কেউ জানতো রে বাবা’। আর কোন কথা বের হয় না শাফিয়া বেগমের মুখ থেকে। মধুমতি নদীর পশ্চিম পাড়ের দক্ষিণে ঘাঘা গ্রাম, দশ বছর আগে থেকে এই গ্রামে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এই ক’বছরে মধুমতি নদী কেড়ে নিয়েছে ৩০ বছরের পুরানো ঘাঘা বাজার, বাজারের ২টি বড় চান্দি, ৫টি রাইসমিল আর শ’খানেক দোকান ঘর।
নদীপাড়ের ১২টি গ্রামের এই জমজমাট বাজারে একটি বড় মুদি দোকান ছিলো কামরুল বিশ্বাসের। দিনে আর রাতে মিলে তার দৈনিক আয় ছিলো প্রায় হাজার খানেক টাকা। এই আয় দিয়ে সে ৫ ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখেই সংসার করছিলো। কিন্তু এক বছর আগের ভাঙ্গনে তার সেই দোকানঘর সমেত সব চলে যায় নদী গর্ভে। এক রাতে ভাঙ্গনের আতঙ্কে যখন বাজারের নদীর পাড়ে প্রায় সব খেয়ে ফেলেছে, নদী তখনও তার দোকান থেকে অন্ততঃ ২’শ গজ দূরে। বিপদে পড়লেন কখন কি হবে, কি করে ব্যবসা করে খাবেন। এই ভেবে রাতে তার বাড়িতে ঘুম আসছিলো না, সেই রাতে শুরু হলো তুমুল বর্ষা। সেই বর্ষা রাতেই তার দোকান ভেঙ্গে নিয়ে যায় রক্ষুসী মধুমতি নদী, ভোরে গিয়ে তিনি দেখেন তার সবই শেষ। প্রায় ৩০ বছর আগে গড়ে উঠা ঘাঘা বাজার, বাজারের পাশে স্কুল, একটু দুরে নদী পাড়ে দেড়শ বছরের পুরাতন বটগাছ। হাট বাজার শেষে হাটুরে লোকেরা বসতেন সেই বটের ছাঁয়ায়।
গ্রামে বৈশাখী উৎসব আর শীতকালে এই বটগাছকে কেন্দ্র করে বসতো জারি আর কবি গানের আসর। মাঝে মধ্যে ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল বসতো আর রাতভর চলতো ওয়াজ। ওয়াজকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন মেলা বসতো। সে সবই এখন কেবলই স্মৃতি। মধুমতি নদীর দক্ষিণ পশ্চিম পাড়ের ঘাঘা, যোগিয়া, পাচুড়িয়া, পাংখারচর, লঙকারচর, পাচুড়িয়া, কুমোরডাঙ্গা, তেলকাড়া, ধলইতলা, কোটাকোল, রায়পাড়া, করগাতি, টি করগাতি গ্রামের একই দশা। প্রতিবছরই বর্ষা মওসুমে মধুমতি নদীতীর সংলগ্ন লোহাগড়া উপজেলার শিয়েরবর, মাকড়াইল, মঙ্গলহাটা, মহাজন, শালনগর, ধানাইড়, বকজুড়ি, রামকান্তপুর, আমডাঙ্গা, বারইপাড়া এলাকা ভাঙ্গনের মুখে পড়ে নদীগর্ভে চলে যায় বাড়িঘর, গাছপালা বাজার সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শত শত একর ফসলি জমি। বর্ষা মৌসুমের পরে আরেক দফা ভাঙ্গছে মধঘুমতি নদী। একই ভাবে ৫০ বছর ধরে ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে মধুমতি নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ আমলের শিয়েরবর বাজার। গত বছরের তীব্র ভাঙ্গনে নদী পাড়ের বাজারের ৩টি চান্দি, অন্তত ৩৫ টি দোকান আর শতাধিক বসতবাড়িসহ একটি রেষ্ট হাউস, পাঠাগার আর মসজিদ চলে গেছে মধুমতির পেটে।
এলাকার শিশুদের জন্য একমাত্র সরকারী প্রাইমারী স্কুলটিও মধুমতি নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। মধুমতি নদীর শিয়েরবর অংশে এ বছর তীব্র ভাঙ্গন প্রবল অন্ততঃ ১ কিলোমিটার এলাকার নারায়ন চৌধুরী, কার্তিক চৌধুরী, বাসুদেব চৌধুরী, কুতুব মোল্যা, আতিয়ার শেখ, তারা আলী, আতর আলীসহ অন্ততঃ ১শ’টি পরিবারের বসত ভিটা বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন আতঙ্কে পরিবার গুলোর লোকেরা দিনরাত কাজ করছেন শেষ সম্বল টুকু বাচানোর জন্য । ভাঙ্গনের প্রসঙ্গে কোটাকোল ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান বি এম হেমায়েত হোসেন হিমু বলেন, ‘এবারের ভাঙ্গনের সময় আমাদের এমপিকে ডেকে ছিলাম, তিনি নদী পাড় থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, আমার নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে ১ হাজার জিও ব্যাগ ফেলেছি তার ও কোন টাকা পয়সা দেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড, তাদের কোন খেয়ালই নেই এদিকে’।
নদীপাড়ের বাসিন্দা ব্যবসায়ী লিকু বলেন, ‘এই ভাঙ্গনের ব্যাপারে নদীর পাড় বাঁধার জন্য এমপি, ডিসি, পানিউন্নয়ন বোর্ড সব খানেই দরখাস্ত দিয়েছি, কোথাও থেকে কোন সাড়া পাচ্ছিনা। এলাকার লোকদের অবস্থা তো আপনারা দেখলেন। এদের দেখার জন্য কেউ আসেনি, কেউ সামান্য সাহায্য পর্যন্ত করেনি’।নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হাফিজুর রহমান ভাঙ্গল কবলিত এলাকার মানুষের সাহায্যের ব্যাপারে বলেন, ‘ভাঙ্গল কবলিত এলাকার মানুষের সাহায্যের ব্যাপারে জেলা প্রশাসক বা সরকারী কর্মকর্তারা রিলিফ বা অন্য সাহায্য করতে পারে। এ ব্যাপারে এমপিদের করার কিছুই থাকে না। আমি ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কথা বলেছি, পানি সম্পদ মন্ত্রীর সাথেও কথা বলেছি, তবে তাদের কাছ থেকে ভালো কোন আশ্বাস পাইনি’।
নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোঃ হেলার মাহমুদ শরীফ বলেন, ‘মধুমতি নদীর ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষের সমস্যার ব্যাপারে আমাকে কেউ জানায়নি, এ ব্যাপারে তথ্য নিয়ে নদী ভাঙ্গন কবলিত মানুষের সাহায্যার্থে যা কিছু করনীয় তার সবই করা হবে’।ভাঙ্গন কবলিত মধুমতি পাড়ের ঘাঘা এলাকার ব্যাপারে কোন আশার কথা শোনাতে পারেননি নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম প্রতিবেদক উজ্জ্বল রায়কে জানান বলেন, ‘আপাতত ঘাঘা-মহিষাপাড়া এলাকার মধুমতির ভাঙ্গনের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তেমন কিছুই করনীয় নেই, আমরা মধুমতি নদীর ঐ অংশ বরাবর মাগুরা পর্যন্ত নদীতীর বাধের জন্য প্রকল্প প্রনয়ণ করেছি, তা পাশ হলে আশাকরি আর ভাঙ্গন থাকবে না’। মধুমতি নদীর অব্যহত ভাঙ্গনে স্বাধীনতার পর প্রায় চলিশ বছর ধরে লোহাগড়া উপজেলার প্রায় চলিশটি গ্রাম নদী গর্ভে চলে গেছে। এতে বাড়ছে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।



