রাজনীতিতে শ্রমিক নেতাদের প্রভাব নেই কেন?

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলেরই শ্রমিকদের জন্য সহযোগী সংগঠন রয়েছে, তবে কার্যকর শ্রমিক সংগঠন হিসেবে বাম ঘরানার দলগুলোর সহযোগী শ্রমিক সংগঠনগুলো বরাবরই বাংলাদেশে উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে এসেছে, শুধু শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার্থে নয়, শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল জাতীয় রাজনীতিতেই। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনীতিতে শ্রমিক নেতাদের প্রভাব দেখা গেছে কমই।
“ঢাকা শহরে ডাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত পঞ্চাশ হাজার ছাত্র ছিলনা। তো গণ-অভ্যুত্থানটা কিভাবে হল? আদমজী পাট কলের শ্রমিকরাই মূল শক্তি ছিল তখনকার আন্দোলনে। আদমজীর ছাদু ছিল নিরক্ষর লোক। তার নেতৃত্বে চল্লিশ হাজার লোক আসছিল”।
এমনটাই বলছিলেন শহীদুল্লাহ চৌধুরী। ৫০ বছর ধরে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে জড়িত। ১৯৬৪ সালে ছিলেন বাওয়ানি জুটমিলের সাধারণ শ্রমিক, সেখান থেকে শ্রমিক নেতা, নানা ধাপ পেরিয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগী সংগঠন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি, এমনকি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
তিনি বলছিলেন বাংলাদেশে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত যতবার শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করেছে, তার প্রতিটিই শেষ পর্যন্ত বড় বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, অন্যভাবে বললে, রাজনীতির প্রতিটি বাঁকবদলে ছিল শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
মি. চৌধুরীর বক্তব্যেই স্পষ্ট, এখন আর বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনের স্বর্ণযুগ নেই। অবশ্য এখনও তিনি ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তার ভাষায় এখন শ্রমিক আন্দোলন হয় ঠিকই কিন্তু সেগুলো স্থায়িত্ব পায় না, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উত্তেজিত শ্রমিকেরা হুট করে রাস্তায় নেমে আসে তারা বিক্ষোভ করে, ভাংচুর করে, আবার নেতৃত্বের অভাবে তারা অনেক ক্ষেত্রেই দিন শেষ হবার আগেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
আর নেতা যারা আছেন তারাও আগের মতো শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারছেন না, স্বীকার করলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নাইমুল আহসান জুয়েল।
তিনি বলেন, “এটা হচ্ছে আমাদের ব্যর্থতা। আমরা যারা ট্রেড ইউনিয়ন করি আমরা তারা শ্রমিকদের মাঠে আনতে পারছি না সেভাবে। সেভাবে চেষ্টা করতে পারছি না। শ্রমিকরাও হতাশ, তারা বলে দাবি দাওয়া তো আদায় হয় না মাঠে নেমে কি করবো”।
কিন্তু কেন শ্রমিকরা আগের মত জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারছেন না? কেন তারা নেতৃত্ব-হীনতায় ভুগছেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেছিলেন, “আগে পাবলিক সেক্টরটা বিরাট ছিল। এখন সেটা প্রাইভেট সেক্টর বড় হয়েছে এবং মূলত সেটা গার্মেন্টস সেক্টর। এই খাতে ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনগত সুযোগ থাকলেও, নানা পন্থায় মালিকরা সেটা করতে দিচ্ছে না। শিল্প পুলিশ যেটা তৈরি হেয়ছে সেটা পুরোপুরিভাবে মালিকদের অধীনে চলে গেছে।সেদিক থেকেও নিপীড়নের ভয়টা অনেক প্রবল।এই সেক্টরে ৬৫টি ফেডারেশন কাজ করছে। এতগুলো ফেডারেশনে বিভক্ত থাকলে শ্রমিক শ্রেণী হিসেবে যে আন্দোলন গদে উঠবে সেটা তো হবে না”।
এর সাথে শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলছেন, একসময় সরকারী খাতের বড় বড় কারখানা থেকেই আন্দোলনগুলো গড়ে উঠত, কিন্তু এখন রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কারখানার সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেখান থেকে আন্দোলন খুব একটা গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে সোয়াশো বছরের বেশী সময় আগে যে দিনটিতে হয়েছিল পৃথিবী বিখ্যাত এক শ্রমিক আন্দোলন, সেই দিনটিকে বাংলাদেশে সরকার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো, এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কারখানার মালিক পর্যন্ত সবাইই পালন করছেন নানা আয়োজনে।
দিন উপলক্ষ্যে দেশটিতে পালিত হয়েছে সরকারী ছুটি। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক নেতা বললেন, মে দিবস আজ আর শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য ফুঁসে ওঠার দিন নয়, এটি যেন এখন একটি উৎসবের দিন।