১৯৭১ সালে পাকসেনাদের নির্যাতনের শিকার মাদারীপুরের আয়েশা বেগম
মাদারীপুর প্রতিনিধি ॥
পাকসেনাদের হাতে নির্যাতনের সেই ভয়াবহ চার রাতের কথা মনে পড়লে আজও শরীর কেপে উঠে। ভয় আর লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। তবে শুনছি সরকার আমাদের মতো নির্যাতনের শিকার নারীদের অনেক সম্মান জানিয়েছেন। এটা শুনে আমার খুব ভালো লাগছে। এভাবেই কথাগুলো বললেন ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার মাদারীপুরের আয়েশা বেগম।
মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখীরা রাজারচর গ্রামের মৃত মুলাই সরদারের মেয়ে আয়েশা বেগমের সাথে বরিশালের দিন মজুর আরব আলী সরদারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর সংসারে অভাব থাকায় মুক্তিযুদ্ধের আগে স্বামী ও তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে খুলনার দৌলতপুরে চলে যান আয়েশা বেগম। যেখানে একটি কলোনীতে বাসা ভাড়া করে থাকতেন। স্বামী দিনমজুরের কাজ আর আয়েশা মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচালিকার কাজ করতেন।
আয়েশা বেগমের সাথে কথা হলে, তিনি জানান, হঠাৎ দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। চারদিকে লাশ আর গোলাগুলির শব্দ। তখনও খুলনার দৌলতপুরের নদীর ওপারে কলোনীতে কোন পাকবাহিনী আসেনি। শুধু মানুষের মুখে দেশের যুদ্ধের কথা শুনতাম। একদিন (তারিখ মনে নেই) কলোনীতে পাকবাহিনী ঢুকে পড়ে। আমরা ভয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখি। কিন্তু পাকবাহিনী দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে। এসময় ঐ কলোনীর বহু যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। তখন আমার বয়স প্রায় ২০ বছর। বড় ছেলে বয়স ৩ বছর আর ছোট ছেলে আমার গর্ভে। ৬/৭ মাসের গর্ভবতি। তবুও ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ওদের একটি ক্যাম্পের রুমে আমিসহ আরো ৫/৬ জনকে একসাথে আটকে রাখে। চারদিন-রাত আমার উপর চলে নির্মম অত্যাচার। সেই অত্যাচারের কথা মনে পড়লে আজও আমি শিউরে উঠি। ভয়ে কেপে উঠে শরীর। ঐ চারদিনের কথা আমি কোন দিন ভুলেনি। কখনও হয়তো ভুলতেও পারবোনা। কথাগুলো বলেই কাদতে শুরু করেন আয়েশা বেগম। কিছুক্ষণ পরে আবার বলতে শুরু করেন সেই ১৯৭১ এর ভয়াবহ দিনগুলোর কথা।
এসময় তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানীদের নির্মম নির্যাতনের চারদিন পর খুবই অসুস্থ্য হয়ে পড়লাম। বার বার জ্ঞান হারিয়েছি। সর্বশেষ কতক্ষণ পর জ্ঞান এসেছিলো আমার জানা নেই। এক পর্যায় আর্মির কমান্ডারের হাতে-পায়ে ধরে পেটে সন্তান আছে জানালাম। সে প্রথমে আমার কথা বিশ্বাস করেনি। পরে আমার শারীরিক অবস্থা দেখে আমাকে ছেড়ে দিলো। একজন পাকসেনা আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দিলো। আমি ভয়ে ভয়ে কোনভাবে ক্যাম্প থেকে বেড়িয়ে আসলাম। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগলাম। সেই সময় কেবলই মনে হচ্ছিল এই বুঝি গুলি করে আমাকে হত্যা করে। আমি আর পেছনদিকে না তাকিয়ে সোজা পথ ধরে হাটতে থাকি। কিছুদুর যাবার পর জঙ্গল আর ক্ষেত ধরে হাটতে থাকি। এভাবে কতক্ষণ হেটেছি আমার মনে নেই। অনেক পথ হাটার পর একটি বাড়িতে ঢুকলাম। তারা আমাকে তাড়িয়ে দিলো। বললো আমাকে থাকতে দিলে পাকবাহিনীরা তাদের মেরে ফেলবে। আবার হাটা শুরু করলাম। একটি বাড়িতে গিয়ে খাবার চাইলাম। তারা আমার শারীরিক অবস্থা দেখে খেতে দিলো। কিন্তু পাকসেনাদের ভয়ে থাকতে দিলেনা। রাতে চুপ করে একটি বাড়ির রান্না ঘরে ঘুমিয়ে থাকি। ভোর হতেই আবার হাটা শুরু করি। বিভিন্ন মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে করে দৌলতপুরের কলোনীর বাড়িতে ফিরে আসি।
এসে শুনি আমার স্বামীসহ কলোনীর বহু মানুষকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে গেছে। ছেলের খোজ করি। কলোনীর পাশের ঘরে বনু বিবি নামের এক বাঙ্গালীর আশ্রয়ে আছে আমার ছেলে সাহেদুল।
শত দুঃখের মাঝেও ছেলেকে পেয়ে খুশী হলাম। আর স্বামী আরব আলীর কোন সন্ধান পাইনি। পাকবাহিনীরা তাকে মেরে ফেলে লাশ কোথায় ফেলে দিয়েছে তার হদিসও পায়নি। তবে নিজের চোখে কলোনীর ভিতর, নদীর পাড়ে যেখানে লাশ দেখেছি সেখানেই আমার স্বামীকে খুজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। শুধু লাশের উপর লাশ আর রক্তে দেখেছি। এতো রক্ত যেন একটি নদী ভরে যেতো। এরকিছু দিন পর দেশ স্বাধীন হলো।
আমি ছেলেকে নিয়ে কলোনীতেই থেকে গেলাম। এর কয়েকদিন পর কলোনীর পাট গোডাউনে প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নেয়। সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের জয় বাংলা শ্লোগান আজও আমার কানে ভাসে।
ঐ সময় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কলোনীতে এক বস্তা আটা দিয়ে তাদের জন্য রুটি বানাতে বলে। এসময় ঐ কলোনীর বিহারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার জন্য আটার মধ্যে বিষ ঢেলে রুটি বানায়।
এসময় প্রতিবেশি বনু বিবি আমাকে বলেন আমার বিহারীদের সাথে বিয়ে হলেও আমি বাঙ্গালী। তাই এই কাজটি আমি করতে পারিনা। বিহারীরা আটার মধ্যে বিষ দিয়ে রুটি বানাচ্ছে। এটা খেলে মুক্তিযোদ্ধারা মারা যাবে। এই খবরটি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পৌছাতে হবে। কলোনী থেকে বের হবার জন্য ভরা কলসের পানি ফেলে দিয়ে নদীতে গিয়ে পানি ভরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পুরো ব্যাপারটি মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই।
এরপর মুক্তিযোদ্ধারা একটি রুটি কুকুরকে খাওয়ালে ঐ কুকুর মারা যায়। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুব্ধ হয়ে বিহারী কলোনীতে আক্রমণ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তখন আমি আমার ছেলেসহ অনেকেই কলোনী থেকে বের হয়ে আসি। এরপর পৈত্রিকবাড়ি মাদারীপুরে আসার জন্য পায়ে হেটে রওনা হই। বড়দিয়া স্কুলসহ কয়েকটি স্থানে অবস্থানরত ২/৩ শত পুরুষ-মহিলা পায়ে হেঁটে যার যার গ্রামের বাড়ী ফিরে যাই। খুলনা থেকে গোপালগঞ্জ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের টিন ঘেরা বাড়ির পাশ দিয়ে হেটে গ্রামের বাড়ীতে আসতে ৫/৬ দিন সময় লেগে যায়।
আয়েশা বেগম আরো বলেন, বড় ছেলে সাহেদুল রিক্সা চালায় আর ছোট ছেলে আলমগীর জেলে। ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে নদীর পাড়ে একটি টিন আর পাটখড়ির বেড়ায় তৈরি ঘরে কোন রকমভাবে বেচে আছি। নিজের ইজ্জত হারালেও লজ্জা ও ভয়ে নির্যাতনের ঘটনা কাউকে বলেনি। তবুও অনেকেই জানে। তবে এখন সরকার আমাদের অনেক সম্মান দিয়েছেন। আমাদের বীরাঙ্গণা উপাধী দিয়েছে। তাই মৃত্যু আগে আমার জীবনের এই ঘটনাগুলো বলে যেতে চাই। যাতে করে আমাদের কথা আমাদের ত্যাগের কথা দেশবাসী জানে। দেশবাসী যেন আমাদের একটু সম্মান করে। শুধু এই টুকুই চাওয়া।
পক্ষীরা রাজারচর গ্রামের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মকবুল বেপারী বলেন, আমি শুনেছি আয়েশা বেগম বীরঙ্গণা। সে খুলনায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাই মাদারীপুরের অনেকেই এই ঘটনা জানেনা।
মাদারীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাজাহান হাওলাদার বলেন, যেহেতু আয়েশা বেগম খুলনায় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো। তাই আমাদের জানা নেই। তাছাড়া আয়েশা বেগম কখনও আমাদের কাছে আসেনি। তার নির্যাতনের কথাও আমাদের কখনও বলেনি।



